শিল্পী রফিকুন নবী প্রসঙ্গ
মামুনুর রশীদ নাট্যব্যক্তিত্ব
আমরা যাঁরা ষাটের দশকের ছাত্র, তাঁরা কারণে-অকারণে অনেক সময়ই ঈর্ষার কারণ হয়ে পড়ি। অনেক তরুণ কখনো উত্তেজিত হয়েই বলে ফেলে, কী এমন করেছেন যে ষাটের দশক একটা ব্যাপার বটে! পঞ্চাশের দশকেরই একটা ধারাবাহিকতা ষাটের দশক। পাকিস্তান যখন ভাষার ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোতে পারল না, রাজনীতিতেও কোনো মীমাংসা করতে না পেরে মার্শাল ল দিয়ে দিল। তাতেও বিদ্রোহ থামছে না, আন্দোলন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি এগিয়ে চলেছে। একদিকে লড়াই-সংগ্রাম, অন্যদিকে আশা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিরাশাকে ডিঙিয়ে মহৎ আশা নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে আমাদের সাহসটা বেড়েছে। যার জন্য একটা মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পার করে দিয়ে দেশটা স্বাধীন করে ফেললাম।
জাতির সব অধিবাসীই ভাই-ভাই। একটা ছোট্ট ধর্মভিত্তিক বিরোধিতা ও জিন্নাহর কিছু অবশিষ্টাংশের সঙ্গে ছোটখাটো লড়াই হয়েছে বটে, তবে একাত্তর সালে তারা হঠাৎ দেশপ্রেমিক হয়ে উঠল। বলে উঠল পাকিস্তান সেনাবাহিনী, তারাই শুধু দেশপ্রেমিক। যা-ই হোক, একসঙ্গেই সেই দেশপ্রেমিকেরা আত্মসমর্পণ করেছিল।
ষাটের দশকে একটা জিনিস আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের শক্তিটা কোথায়। শক্তি পরীক্ষাটি হয়েছিল বায়ান্ন সালেই, ভাষা আন্দোলনের সময়। তারপর ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলনেও আমরা শক্তি পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছিলাম। সংশয় ছিল না মোটেও যে আমাদের মূল শক্তিটার কেন্দ্র হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের কাব্য, চিত্রকলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক সব সময়ই খুবই সমৃদ্ধ। বায়ান্নর পর যুক্ত হলো ভাস্কর্য এবং চলচ্চিত্র। ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার পর চিত্রকলার একটা দিগন্তই খুলে গেল, যেখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ অনেক মেধাবী শিল্পী এসে যোগ দিলেন। ভাষা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে সর্বত্র শহীদ মিনার গড়ে উঠতে লাগল।
পূর্ব বাংলায় তখন প্রচণ্ড দারিদ্র্য। মানুষ খেতে পায় না। কিন্তু শহীদ মিনার গড়া, গান গাইতে গাইতে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে এসে ফুল দিতে কী অফুরন্ত প্রেরণা জাতির! নতুন গান, নতুন কবিতা, নতুন ছবি, নতুন নাটক করার প্রচেষ্টা সর্বত্র। এ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণও শুরু হয়েছে। সেই লেটার প্রেসে কাঠের ব্লকে প্রচ্ছদ এঁকে লিটল ম্যাগাজিন বের করে চার আনা, আট আনা বিক্রি করে কিসব মহৎ লেখা তখন তৈরি হচ্ছে! নতুন কবিতার সঙ্গে নতুন কবিও আসছে। দোর্দণ্ড প্রতাপের সামরিক শাসনের সময় কী নিষ্ঠুর অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন দিয়ে পুলিশের নিম্নপদস্থ কর্মচারীর কাছে অপদস্থ হয়েও নাটক হচ্ছে! স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও নাটক অভিনীত হচ্ছে কালাকানুনের তোয়াক্কা না করে। সেই সময়ের প্রস্তুতিটাই মুখ্য। কালে কালে সেইসব শিল্পী আরও বড় হয়েছেন চিন্তায়, মননে। একসময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সব শিল্পের কর্মীরা এগিয়ে গেছেন। চিত্রকলা, নাটক, সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক চেহারাটাও পেয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে এই ষাটের দশক, পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের দ্বারা।
এর মধ্যে যে বিভাজন আসেনি, তা নয়। কিন্তু সেসব বিভাজন কখনো আদর্শগত, কখনো চিন্তার বিভিন্নতা নিয়ে। কিন্তু কখনোই তা অবমাননাকর একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বিষয়গুলো এমন একটা এলাকা লঙ্ঘন করছে যে তা একটা ভীতির আকার ধারণ করেছে। ৬০ বছর চিত্রকলার বিভিন্ন শাখায় কাজ করে আন্তর্জাতিক মানের একজন শিল্পী এবং শিক্ষক এক অবমাননাকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন সম্প্রতি। তিনি চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে শিল্পাচার্যের সন্তান যিনি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তিনিও চলে এসেছেন। শিল্পী শিক্ষক রফিকুন নবী কার্টুন এঁকে একসময় সাড়া জাগিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, কার্টুন সব সময়ই রাজনৈতিক এবং ব্যঙ্গাত্মক। মানুষকে সচেতন করা এবং শাসকগোষ্ঠীকে সমালোচনা করার এ এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পাকিস্তান আমলে এক অবাঙালি আর্টিস্ট ছিলেন, যাঁর নাম আজিজ। আজিজ কার্টুন এঁকে এত জনপ্রিয় ছিলেন যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভয়ে তিনি ঢাকায়ই থাকতেন। আমরা তাঁর ভক্ত ছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিছুদিন তিনি এ দেশেই ছিলেন।
এ কথাও ঠিক, গত সরকারের সময় একজন কার্টুনিস্টের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠী যথার্থ আচরণ করেনি। তাঁকে যথেষ্টই নিপীড়ন করা হয়েছিল। আমরা তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্পী রফিকুন নবীর প্রতি এই আচরণে কার লাভ হলো? শোনা যায়, যিনি এই ঘটনার নায়ক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর। ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরদের নিয়োগ দিয়ে গেছে আগের সরকার। সেখানেও একটা নির্বাচন হতো। বর্তমান সরকার নির্বাচনের সময় পায়নি। সবই সরকারি মনোনয়ন।
এ বিষয়টি ফেসবুক, অনলাইনে সংবাদ ও প্রতিবাদে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। আজকের দিনে পত্রপত্রিকার চেয়ে ফেসবুক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। তা ছাড়া, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের জানার কথা, ইমেরিটাস অধ্যাপকের (রফিকুন নবী) গুরুত্ব কত। এই পদটি যে সরকারই দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে তাঁর মর্যাদাই-বা কী? বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি জেনেই থাকে যে, তিনি গ্রহণযোগ্য কেউ নন, তাহলে তাঁকে অতিথি হিসেবে ডাকা হলো কেন?
একটি ঘটনা এখানে না বললেই নয়। ড. আহমদ শরীফকে একবার বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, সম্ভবত এরশাদের শাসনামলে। অনুষ্ঠানের দিন সকালবেলা একাডেমির মহাপরিচালক জানিয়ে দেন যে তাঁকে আসতে হবে না। ড. আহমদ শরীফ সংগত কারণেই খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পরিবার এবং স্বজনদের জানিয়ে গিয়েছিলেন মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ যেন বাংলা একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া না হয়। এই বাংলা একাডেমিতে তাঁর অবদান কম ছিল না।
যে স্থানে শিল্পী রফিকুন নবীর সঙ্গে বিব্রতকর ঘটনাটি ঘটল, তা তাঁর ছাত্রজীবন, শিক্ষককাল এবং সৃজনের নানা ঘটনাবহুল। যদি তিনিও বলে ওঠেন, ওইখানে আমি আর যাব না। কার ক্ষতি হবে? অনেক নতুন শিক্ষার্থী, অনাগতকালে অনেক নতুন গবেষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অন্য শিক্ষকেরাও ভাববেন, সম্মান রক্ষার জন্য ওখানে কি যাওয়া উচিত হবে!
শুধু চিত্রকলায় নয়, শিল্পের অন্য শাখাতেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটছে। সেসব কেউ কেউ অবহেলা করে উড়িয়ে দিতেও পারেন, হয়তো দিচ্ছেনও। বেতার, টেলিভিশনে অনেক শিল্পী দিনের পর দিন অতীতে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তাঁদের সৃজনকর্ম থেকে দর্শক এবং জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। শিল্পীরা কি দর্শকদের রাজনীতিসচেতন করার কাজে নেমে পড়েন? নেমে পড়লেই-বা কী? কে তাঁদের কথা শুনবে? আর যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা নিজেদের এত দুর্বল ভাবেন কেন? একজন শিল্পী রফিকুন নবী মঞ্চে উঠলেই কী হতো? এখন যেসব লেখালেখি হচ্ছে, তার চেয়ে কি বেশি ক্ষতি হতো?
যদিও এই ঘটনাটি এর আগেও লিখেছি, আজও লিখছি। আলজেরিয়ার স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল দ্য গল। বিভিন্ন ফ্রন্টে ফরাসি সৈনিকেরা পরাজয় বরণ করছে, দ্য গলের মাথা গরম! এই সময় সংবাদ এল, নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানকারী চিন্তাবিদ জাঁ পল সার্ত্রে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলজেরিয়ার পক্ষে ফরাসি স্বৈরাচারের বিপক্ষে লিফলেট বিলি করছেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সাহস পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পুলিশপ্রধান দ্য গলের কাছে এলেন। উত্তেজিত দ্য গল বললেন, ‘গ্রেপ্তার কর’। পুলিশপ্রধান দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। এ সময় দ্য গল চিৎকার করে বললেন, ‘না, না। তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। কারণ সে-ও ফ্রান্স।’ ‘সে-ও ফ্রান্স’ কথাটা তাঁর বলতে হলো এ জন্য যে, যুদ্ধের সময় দ্য গল বলতেন, ‘দ্য গলই ফ্রান্স।’ যেকোনো সরকারই নিজেকে দেশ ভাবে কিন্তু দেশ অনেকেরই। একজন সাধারণ নাগরিকও বাংলাদেশ আর রফিকুন নবী তো বটেই।
আমরা যাঁরা ষাটের দশকের ছাত্র, তাঁরা কারণে-অকারণে অনেক সময়ই ঈর্ষার কারণ হয়ে পড়ি। অনেক তরুণ কখনো উত্তেজিত হয়েই বলে ফেলে, কী এমন করেছেন যে ষাটের দশক একটা ব্যাপার বটে! পঞ্চাশের দশকেরই একটা ধারাবাহিকতা ষাটের দশক। পাকিস্তান যখন ভাষার ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোতে পারল না, রাজনীতিতেও কোনো মীমাংসা করতে না পেরে মার্শাল ল দিয়ে দিল। তাতেও বিদ্রোহ থামছে না, আন্দোলন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি এগিয়ে চলেছে। একদিকে লড়াই-সংগ্রাম, অন্যদিকে আশা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিরাশাকে ডিঙিয়ে মহৎ আশা নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে আমাদের সাহসটা বেড়েছে। যার জন্য একটা মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পার করে দিয়ে দেশটা স্বাধীন করে ফেললাম।
জাতির সব অধিবাসীই ভাই-ভাই। একটা ছোট্ট ধর্মভিত্তিক বিরোধিতা ও জিন্নাহর কিছু অবশিষ্টাংশের সঙ্গে ছোটখাটো লড়াই হয়েছে বটে, তবে একাত্তর সালে তারা হঠাৎ দেশপ্রেমিক হয়ে উঠল। বলে উঠল পাকিস্তান সেনাবাহিনী, তারাই শুধু দেশপ্রেমিক। যা-ই হোক, একসঙ্গেই সেই দেশপ্রেমিকেরা আত্মসমর্পণ করেছিল।
ষাটের দশকে একটা জিনিস আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের শক্তিটা কোথায়। শক্তি পরীক্ষাটি হয়েছিল বায়ান্ন সালেই, ভাষা আন্দোলনের সময়। তারপর ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলনেও আমরা শক্তি পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছিলাম। সংশয় ছিল না মোটেও যে আমাদের মূল শক্তিটার কেন্দ্র হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের কাব্য, চিত্রকলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক সব সময়ই খুবই সমৃদ্ধ। বায়ান্নর পর যুক্ত হলো ভাস্কর্য এবং চলচ্চিত্র। ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার পর চিত্রকলার একটা দিগন্তই খুলে গেল, যেখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ অনেক মেধাবী শিল্পী এসে যোগ দিলেন। ভাষা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে সর্বত্র শহীদ মিনার গড়ে উঠতে লাগল।
পূর্ব বাংলায় তখন প্রচণ্ড দারিদ্র্য। মানুষ খেতে পায় না। কিন্তু শহীদ মিনার গড়া, গান গাইতে গাইতে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে এসে ফুল দিতে কী অফুরন্ত প্রেরণা জাতির! নতুন গান, নতুন কবিতা, নতুন ছবি, নতুন নাটক করার প্রচেষ্টা সর্বত্র। এ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণও শুরু হয়েছে। সেই লেটার প্রেসে কাঠের ব্লকে প্রচ্ছদ এঁকে লিটল ম্যাগাজিন বের করে চার আনা, আট আনা বিক্রি করে কিসব মহৎ লেখা তখন তৈরি হচ্ছে! নতুন কবিতার সঙ্গে নতুন কবিও আসছে। দোর্দণ্ড প্রতাপের সামরিক শাসনের সময় কী নিষ্ঠুর অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন দিয়ে পুলিশের নিম্নপদস্থ কর্মচারীর কাছে অপদস্থ হয়েও নাটক হচ্ছে! স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও নাটক অভিনীত হচ্ছে কালাকানুনের তোয়াক্কা না করে। সেই সময়ের প্রস্তুতিটাই মুখ্য। কালে কালে সেইসব শিল্পী আরও বড় হয়েছেন চিন্তায়, মননে। একসময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সব শিল্পের কর্মীরা এগিয়ে গেছেন। চিত্রকলা, নাটক, সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক চেহারাটাও পেয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে এই ষাটের দশক, পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের দ্বারা।
এর মধ্যে যে বিভাজন আসেনি, তা নয়। কিন্তু সেসব বিভাজন কখনো আদর্শগত, কখনো চিন্তার বিভিন্নতা নিয়ে। কিন্তু কখনোই তা অবমাননাকর একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বিষয়গুলো এমন একটা এলাকা লঙ্ঘন করছে যে তা একটা ভীতির আকার ধারণ করেছে। ৬০ বছর চিত্রকলার বিভিন্ন শাখায় কাজ করে আন্তর্জাতিক মানের একজন শিল্পী এবং শিক্ষক এক অবমাননাকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন সম্প্রতি। তিনি চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে শিল্পাচার্যের সন্তান যিনি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তিনিও চলে এসেছেন। শিল্পী শিক্ষক রফিকুন নবী কার্টুন এঁকে একসময় সাড়া জাগিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, কার্টুন সব সময়ই রাজনৈতিক এবং ব্যঙ্গাত্মক। মানুষকে সচেতন করা এবং শাসকগোষ্ঠীকে সমালোচনা করার এ এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পাকিস্তান আমলে এক অবাঙালি আর্টিস্ট ছিলেন, যাঁর নাম আজিজ। আজিজ কার্টুন এঁকে এত জনপ্রিয় ছিলেন যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভয়ে তিনি ঢাকায়ই থাকতেন। আমরা তাঁর ভক্ত ছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিছুদিন তিনি এ দেশেই ছিলেন।
এ কথাও ঠিক, গত সরকারের সময় একজন কার্টুনিস্টের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠী যথার্থ আচরণ করেনি। তাঁকে যথেষ্টই নিপীড়ন করা হয়েছিল। আমরা তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্পী রফিকুন নবীর প্রতি এই আচরণে কার লাভ হলো? শোনা যায়, যিনি এই ঘটনার নায়ক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর। ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরদের নিয়োগ দিয়ে গেছে আগের সরকার। সেখানেও একটা নির্বাচন হতো। বর্তমান সরকার নির্বাচনের সময় পায়নি। সবই সরকারি মনোনয়ন।
এ বিষয়টি ফেসবুক, অনলাইনে সংবাদ ও প্রতিবাদে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। আজকের দিনে পত্রপত্রিকার চেয়ে ফেসবুক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। তা ছাড়া, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের জানার কথা, ইমেরিটাস অধ্যাপকের (রফিকুন নবী) গুরুত্ব কত। এই পদটি যে সরকারই দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে তাঁর মর্যাদাই-বা কী? বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি জেনেই থাকে যে, তিনি গ্রহণযোগ্য কেউ নন, তাহলে তাঁকে অতিথি হিসেবে ডাকা হলো কেন?
একটি ঘটনা এখানে না বললেই নয়। ড. আহমদ শরীফকে একবার বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, সম্ভবত এরশাদের শাসনামলে। অনুষ্ঠানের দিন সকালবেলা একাডেমির মহাপরিচালক জানিয়ে দেন যে তাঁকে আসতে হবে না। ড. আহমদ শরীফ সংগত কারণেই খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পরিবার এবং স্বজনদের জানিয়ে গিয়েছিলেন মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ যেন বাংলা একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া না হয়। এই বাংলা একাডেমিতে তাঁর অবদান কম ছিল না।
যে স্থানে শিল্পী রফিকুন নবীর সঙ্গে বিব্রতকর ঘটনাটি ঘটল, তা তাঁর ছাত্রজীবন, শিক্ষককাল এবং সৃজনের নানা ঘটনাবহুল। যদি তিনিও বলে ওঠেন, ওইখানে আমি আর যাব না। কার ক্ষতি হবে? অনেক নতুন শিক্ষার্থী, অনাগতকালে অনেক নতুন গবেষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অন্য শিক্ষকেরাও ভাববেন, সম্মান রক্ষার জন্য ওখানে কি যাওয়া উচিত হবে!
শুধু চিত্রকলায় নয়, শিল্পের অন্য শাখাতেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটছে। সেসব কেউ কেউ অবহেলা করে উড়িয়ে দিতেও পারেন, হয়তো দিচ্ছেনও। বেতার, টেলিভিশনে অনেক শিল্পী দিনের পর দিন অতীতে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তাঁদের সৃজনকর্ম থেকে দর্শক এবং জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। শিল্পীরা কি দর্শকদের রাজনীতিসচেতন করার কাজে নেমে পড়েন? নেমে পড়লেই-বা কী? কে তাঁদের কথা শুনবে? আর যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা নিজেদের এত দুর্বল ভাবেন কেন? একজন শিল্পী রফিকুন নবী মঞ্চে উঠলেই কী হতো? এখন যেসব লেখালেখি হচ্ছে, তার চেয়ে কি বেশি ক্ষতি হতো?
যদিও এই ঘটনাটি এর আগেও লিখেছি, আজও লিখছি। আলজেরিয়ার স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল দ্য গল। বিভিন্ন ফ্রন্টে ফরাসি সৈনিকেরা পরাজয় বরণ করছে, দ্য গলের মাথা গরম! এই সময় সংবাদ এল, নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানকারী চিন্তাবিদ জাঁ পল সার্ত্রে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলজেরিয়ার পক্ষে ফরাসি স্বৈরাচারের বিপক্ষে লিফলেট বিলি করছেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সাহস পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পুলিশপ্রধান দ্য গলের কাছে এলেন। উত্তেজিত দ্য গল বললেন, ‘গ্রেপ্তার কর’। পুলিশপ্রধান দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। এ সময় দ্য গল চিৎকার করে বললেন, ‘না, না। তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। কারণ সে-ও ফ্রান্স।’ ‘সে-ও ফ্রান্স’ কথাটা তাঁর বলতে হলো এ জন্য যে, যুদ্ধের সময় দ্য গল বলতেন, ‘দ্য গলই ফ্রান্স।’ যেকোনো সরকারই নিজেকে দেশ ভাবে কিন্তু দেশ অনেকেরই। একজন সাধারণ নাগরিকও বাংলাদেশ আর রফিকুন নবী তো বটেই।
একুশ মানে মাথা নত না করা—শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের বলা এই বাক্যটি এতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে আর কবে দেখা দিয়েছে? নানা লোকের নানা মতবাদে দেশের ভাবনার ভারসাম্য যখন বিপদের সম্মুখীন, তখন একুশ আমাদের কোন অনুপ্রেরণা দেয়, সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্বও এ সময়কার মানুষদের ওপর বর্তায়।
১৬ ঘণ্টা আগেবাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির ট্র্যাজিক ঘটনায় শহীদ হয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহসহ অনেকে। ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও মিলিটারির নির্মম গুলিবর্ষণ ও ট্রাকের চাপায় তাঁরা শহীদ হন। আহত হয়েছিলেন অগণিত নর-নারী। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত
১৬ ঘণ্টা আগেএ কথা আজ আমরা ভুলতে বসেছি যে আমাদের একটি মর্যাদাসম্পন্ন দিবসের নাম ‘মহান শহীদ দিবস’; যার জন্ম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। কেন, কীভাবে এ দিবসটির জন্ম, তা অনেকেরই জানা। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অবশ্য অতটা জ্ঞাত নয়। ফেব্রুয়ারি মাসটিকে তারা ধরে নিয়েছে বইমেলার উৎসবের মাস হিসেবে।
১৭ ঘণ্টা আগেবাংলা ভাষার ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি এক অবিস্মরণীয় দিন, যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের ভাষাসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ।
১৭ ঘণ্টা আগে