Ajker Patrika

১৪৪ ধারার সামনে দেশ

জাহীদ রেজা নূর, ঢাকা 
১৪৪ ধারার সামনে দেশ

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বোঝানো হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন স্থানীয় বাঙালির আন্দোলন নয়। এই আন্দোলনে ভারতের ইন্ধন আছে। আছে কমিউনিস্টদের হাত। ফলে লাল জুজুর ভয় দেখিয়ে জিন্নাহকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করার পরামর্শই দিয়েছিল প্রাদেশিক মুসলিম লীগ।

জিন্নাহ তখন পর্যন্ত বাঙালিদের চোখে ছিলেন পাকিস্তানের সমার্থক শব্দ। কিন্তু ঢাকায় দুটি ভাষণ বাঙালি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিন্নাহর সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি করল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাঙালি ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে তিনি তাঁর পূর্ব মর্যাদা হারালেন অকারণে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করার জন্য।

এরপর ভাষা আন্দোলন এ সময় থেকে স্তিমিত হয়ে যেতে শুরু করে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন খাজা নাজিমুদ্দিন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় আসেন এবং ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে বলেন, ‘পূর্ব বাংলার ভাষা কী হবে, সেটা পূর্ব বাংলার জনগণই নির্ধারণ করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।’

২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রতিবাদ হয়।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ প্রতীকী ধর্মঘট ও সভা আহ্বান করে। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন যোগদান করে। এই সভায় খাজা নাজিমুদ্দিনের পল্টন ময়দানে বক্তৃতার রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ করা হয়।

৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ধর্মঘটের পর ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সমবেত হয় এবং সেখানে গাজীউল হকের সভাপতিত্বে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়।

২০ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলা পরিষদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। দিনটি লক্ষ্য করে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা পূর্ব বাংলায় এক সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারা জারি করে। আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে খেলাফাতে রব্বানী পার্টির আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে বিকেল ৫টায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়।

দেখা গেল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে ভোট পড়েছে ১১ জনের, ভঙ্গ করার পক্ষে ভোট পড়েছে ৪ জনের। যুক্তিতর্কের পর ঠিক হলো, ১৪৪ ধারা ভাঙা এবং না ভাঙার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হবে পরদিনের ছাত্রসভায়। ছাত্ররাই সিদ্ধান্ত নেবে।

এরপর এল ২১ ফেব্রুয়ারি। কেমন ছিল একুশের সকালটা? সে কথাই বলব এবার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত