Ajker Patrika

২০ বছর পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি ট্যাংক, আরেক গাজার আশঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘ দুই দশক পর পশ্চিম তীরে ট্যাংক প্রবেশ করিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: এএফপি
দীর্ঘ দুই দশক পর পশ্চিম তীরে ট্যাংক প্রবেশ করিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: এএফপি

দীর্ঘ ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীরে ট্যাংক প্রবেশ করিয়েছে ইসরায়েল। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের শরণার্থীশিবিরগুলোতে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে সেনাবাহিনীকে ‘দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান’ গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটি। এই অবস্থায় ইসরায়েল পশ্চিম তীরকে গাজার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে পরিণত করতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের পর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, পশ্চিম তীরকে হয়তো আরেকটি গাজায় পরিণত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের তরফ থেকে এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এল, যখন গাজায় চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হামাস চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত ৬ জিম্মিকে মুক্তি দিলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ৬ শতাধিক ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন।

গত এক মাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে এরই মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জেনিন ও তুলকারেমের মতো শহরগুলোর শরণার্থীশিবিরগুলোতে অভিযান চালিয়ে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর, বিশেষ করে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করেছে।

এই শরণার্থীশিবিরগুলোতে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় যে ফিলিস্তিনিরা তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন বা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাদের বংশধরেরা বসবাস করছেন। ইসরায়েলের দাবি, গত কয়েক দশক ধরে এসব শিবিরই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্ত ঘাঁটি।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনিকে এসব শিবির থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং শিবিরগুলো এখন খালি রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

এদিকে, নেতানিয়াহু সেনাবাহিনীকে অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, গত বৃহস্পতিবার তেল আবিবের কাছে পরিবহন ডিপোগুলোতে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব বিস্ফোরণে কেউ হতাহত না হলেও, দুই দশক আগের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনিদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় শত শত ইসরায়েলির মৃত্যুর স্মৃতি স্মরণ করছে ইসরায়েলি নীতি নির্ধারকেরা।

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদাইনা পশ্চিম তীরে ট্যাংক মোতায়েনের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি একটি বিপজ্জনক ইসরায়েলি উসকানি, যা স্থিতিশীলতা বা শান্তি বয়ে আনবে না।’

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা জেনিন, তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থীশিবিরে অভিযান চালিয়ে ২৬ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনটি বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্র জব্দ করেছে। তারা অভিযানের পরিধি বাড়িয়ে নাবলুস, কাবাতিয়া ও দক্ষিণের দেইর কাদ্দিস পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।

ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে, এমনকি রাস্তা খুঁড়ে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। রোববার ইসরায়েলি যুদ্ধট্যাংকগুলোকে পশ্চিম তীরের জেনিনের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেছে।

গাজায় ৪২ দিনব্যাপী যুদ্ধবিরতি চলাকালে এবং লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত থাকায়, ইসরায়েলি নজর এখন ক্রমশ পশ্চিম তীরে সরে এসেছে। ইসরায়েলি সেনারা সবসময়ই পশ্চিম তীরে সক্রিয় থাকলেও এবার সাঁজোয়া যানসহ ভারী ট্যাংক মোতায়েন করা হয়েছে। এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, তারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ করছে। এই গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরান থেকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা পেয়ে আসছে বলেও দাবি করে আসছে ইসরায়েল।

রোববার প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ বলেন, ‘দশকের পর দশক পর পশ্চিম তীরে—যেটিকে আমরা জুডিয়া ও সামারিয়া বলি—আমরা সেখানে ট্যাংক পাঠিয়েছি। এর অর্থ একটাই, আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সব উপায়ে, সব জায়গায় লড়াই করছি।’

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভিযানে পশ্চিম তীরে শত শত ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের পশ্চিম তীরে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি মূল্যায়ন করতে গিয়ে লেবেক রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির গোয়েন্দা প্রধান মাইকেল হোরোভিটজ বলেন, পশ্চিম তীরে ট্যাংক মোতায়েন ‘যুদ্ধবিরতির জন্য খুবই স্পর্শকাতর সময়ে’ ঘটছে। তিনি উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু দেশীয় চাপে রয়েছেন। তাঁর যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে এবং তিনি হয় যুদ্ধ পুনরায় শুরু করবেন বা তার কট্টর-ডানপন্থী জোট সরকারের পতনের ঝুঁকি নেবেন।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় পশ্চিম তীর দখল করে ইসরায়েল। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এই অঞ্চলটিকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখে এবং এই রাষ্ট্রে গাজাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের মধ্যে এখন প্রকাশ্যেই পশ্চিম তীরকে যুক্ত করে নেওয়ার আহ্বান বাড়ছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তখন তিনি পুরো পশ্চিম তীর দখলের বিষয়ে সমর্থন দেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে তাঁর এই বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বিতীয় ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে নিজেদের ভূমি হারানোর ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ হিসেবে উল্লেখ করে।

এরই মধ্যে ইসরায়েল পশ্চিম তীরের শরণার্থীশিবিরগুলোকে দুর্বল করতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘ পরিচালিত সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ—এর সদর দপ্তর বন্ধ করতে বাধ্য করেছে।

রোববার কাৎজ জানান, এই সংস্থাকে শরণার্থীশিবিরগুলোতে কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত