Ajker Patrika

সিসার ভয়াবহতা

সম্পাদকীয়
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৭: ৫৩
সিসার ভয়াবহতা

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্রমবর্ধমান চাহিদা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে, যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে সিসার বিষাক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নীরবে গ্রাস করছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। এ নিয়ে আজকের পত্রিকার অনলাইনে ১ এপ্রিল একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রায় সাড়ে ৩ কোটি দক্ষিণ এশীয় শিশু আজ বিপজ্জনকভাবে উচ্চমাত্রার সিসাদূষণের শিকার, যার মধ্যে ৬০ শতাংশই বাংলাদেশের। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পুরোনো গাড়ির ব্যাটারি যত্রতত্র ভাঙা এবং পুনর্ব্যবহার করার অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া এর জন্য দায়ী। শুধু অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানাগুলোই নয়, সিসাদূষণের আরও ক্ষেত্র দেশে আছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রঙে এবং এমনকি হলুদের গুঁড়ায় রং ও গুণগত মান বাড়ানোর নামে এই ভারী ধাতু ব্যবহার করা হয়। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপক প্রসারের কারণে দেশজুড়ে গজিয়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কারখানাগুলো থেকে ভয়াবহ মাত্রার সিসাদূষণ ঘটে থাকে।

ঢাকার কাছেই ফুলবাড়িয়ার চিত্র আরও ভয়াবহ। চীনা মালিকানাধীন একটি ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার দূষণে সবুজ ধানখেত এবং স্বচ্ছ জলাশয় আজ মৃতপ্রায়।

সিসার বিষক্রিয়া শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। বুদ্ধি ও মনোযোগের ঘাটতি, রক্তাল্পতা, শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং স্নায়বিক রোগ আজীবন তাদের সঙ্গী হতে পারে।

পরিবেশবাদী সংস্থা পিউর আর্থের মতে, দেশে ২৬৫টির বেশি অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা রয়েছে, এগুলো খোলা আকাশের নিচে পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে সিসা নিষ্কাশন করে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী? সরকারকে অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার কঠোর বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এরপর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ সব প্রকার যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারির মান নিয়ন্ত্রণ এবং এর নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর মনিটরিং সেল তৈরি করতে হবে। পুরোনো ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলা বা ভাঙা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এর বিকল্প হিসেবে সংগ্রহ ও রিসাইক্লিংয়ের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি উদ্যোগে সিসাদূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাও জরুরি। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের সিসার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানাতে হবে এবং নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বাঁচাতে হলে সিসাদূষণ রোধ করতেই হবে। এখনই যদি সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সিসাদূষণ রোধ করা সম্ভব হবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত