আজকের পত্রিকা ডেস্ক

এক দশকেরও বেশি আগে, যখন মুখতার আলম কিষানগঞ্জের সরকারি স্কুলে পড়তেন, তখন তাঁর বন্ধুদের বেশির ভাগই ছিল হিন্দু। কিষানগঞ্জ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যের একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা। মুখতারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিল এক হিন্দু বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে পড়াশোনা করতেন, স্কুলের প্রজেক্ট করতেন। মুখতার তাঁর বন্ধুর খেয়াল রাখতেন। একসঙ্গে খাওয়ার সময় তিনি মাংস খেতেন না, কারণ তাঁর বন্ধু ছিলেন নিরামিষাশী।
কিন্তু দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার পর সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। এখনো সেই সম্পর্ক জোড়া লাগেনি। ঘটনাটা ঘটে জিতনরাম মাঞ্জির এক বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জোটসঙ্গী। কিষানগঞ্জ এক সমাবেশে মাঞ্জি মুসলিম শেরশাহবাদি সম্প্রদায়কে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেন। বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী, যেখানে ৯১ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম এবং প্রধান ভাষা বাংলা।

শেরশাহবাদি নামটি এসেছে ঐতিহাসিক শেরশাহবাদ অঞ্চল থেকে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত। আর ‘শেরশাহবাদ’ শব্দটির উৎপত্তি বলা হয় আফগান শাসক শেরশাহ সূরির নাম থেকে। তিনি শক্তিশালী মুঘলদের পরাজিত করে ষোড়শ শতকে অল্প সময়ের জন্য বিহার ও বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশসহ) শাসন করেছিলেন।
বিহারে হিন্দি ও উর্দু বেশ প্রচলিত। কিন্তু শেরশাহবাদি মুসলিমরা কথা বলেন বাংলার এক বিশেষ উপভাষায়, যেখানে উর্দু ও হিন্দির অনেক শব্দ মিশে আছে। তাঁদের অনেকে ‘বাদিয়া’ বা ‘ভাটিয়া’ নামেও পরিচিত। ভাটিয়া শব্দটি এসেছে স্থানীয় উপভাষার ‘ভাটো’ থেকে—যার অর্থ, নদীর স্রোতের বিপরীতে যাওয়া। ইতিহাস বলে, শেরশাহবাদিরা পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে গঙ্গার উজান বেয়ে এসে শেষ পর্যন্ত বিহারের সীমাঞ্চলে বসতি গড়েন। সীমাঞ্চলকে বলা হয় ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা।
মুখতার আলম বলেন, মাঞ্জির বক্তব্যের পর ‘আমরা হুমকির মুখে পড়েছি।’ মুখতার শেরশাহবাদি মুসলিম এবং ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক। চুপ না থেকে তিনি ফেসবুকে প্রতিবাদ করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর পোস্টের নিচে হিন্দিতে এক মন্তব্য ভেসে ওঠে—‘তোরা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।’ আর সেই মন্তব্যটি করেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তিনি বলেন, ‘ওই মন্তব্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর কেঁপে ওঠে।’
মুখতার সীমাঞ্চল এলাকায় একটি প্রাথমিক স্কুল চালান। সেই স্কুলের খড়ের ছাউনির তলায় বসে আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সেই মন্তব্য আমাদের সম্পর্ক ভেঙে দেয়। আমাদের মধ্যকার বিশ্বাস–আস্থা হারিয়ে যায়। ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব—সব শেষ হয়ে যায়।’
বিহার রাজ্য সরকারের প্রকাশিত ২০২৩ সালের জাতিভিত্তিক শুমারির তথ্য বলছে, বিহারে শেরশাহবাদি মুসলিমের সংখ্যা ১৩ লাখ। এঁদের বেশির ভাগ থাকেন—কিষানগঞ্জ ও কাটিহার জেলায়।

ভারতের তৃতীয় জনবহুল রাজ্য বিহার এখন গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আর এই প্রেক্ষাপটেই কিষানগঞ্জ ও কাটিহারকে কেন্দ্র করে বিজেপি জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটির অভিযোগ, এখানে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা’ বসবাস করছে।
শেরশাহাবাদি মুসলিমরাই টার্গেট কেন
গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না। বিশ্বের কোনো দেশ তা করে না—তাহলে ভারত কীভাবে তা মেনে নেবে?’
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা কারা। তাঁর দাবি, এই মিশনের মাধ্যমে দেশকে ঘিরে থাকা ‘গুরুতর সংকট’ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধান করা হবে। এখনো সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করে। এদের প্রধানত বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে টার্গেট করা হয়। আসামে বিজেপি ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায়। সেখানকার সরকার বহুদিন ধরে বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা নাকি রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য পাল্টে দিতে চাইছে।
আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে মুসলিমের হার এত বেশি নয়। শুধু কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীর ও আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপে এর চেয়ে বেশি মুসলিম বাস করেন। বিহারের মুসলিম জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ (২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী)। এই মুসলিমদের প্রায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ বসবাস করেন সীমাঞ্চল এলাকায়। এখানে কিষানগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পূর্ণিয়া জেলা রয়েছে। কিষানগঞ্জ, কাটিহার ও পূর্ণিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। আর সীমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত কয়েক কিলোমিটার দূরে।
আগামী ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই দফায় বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হবে। ফল ঘোষণা করা হবে ১৪ নভেম্বর। বিজেপি কখনোই বিহারে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। গত ২০ বছরের বেশির ভাগ সময়ই আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, এবার বিজেপি ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু সামনে এনে সীমাঞ্চলের ভোটারদের ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।
গত দুই বছরে স্থানীয় মুসলিমদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। কারণ, এখন স্বয়ং মোদি এই প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছর ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে মোদি বলেছিলেন, ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা লোকেরা পূর্ণিয়া ও সীমাঞ্চলকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। এতে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।’
এ বছর বিহারের বিভিন্ন জেলার নির্বাচনী জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক এক সমাবেশে মোদি বলেন, ‘আজ সীমাঞ্চলসহ পূর্ব ভারতের বহু জায়গায় অনুপ্রবেশকারীদের কারণে ভয়াবহ জনসংখ্যাগত সংকট তৈরি হয়েছে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে দেশ থেকে তাড়ানো হবে।’ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এ অভিযান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
‘দানব/অসুর এসেছে বাংলাদেশ থেকে’
ভারতের বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে সম্প্রতি কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও রাজধানী দিল্লি থেকে শত শত বাংলাভাষী মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছে। অথচ তাঁদের অনেকের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র ছিল। সমালোচকেরা বলছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য মুসলিমদের টার্গেট করা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে বিজেপির আসাম শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করে। ‘আসাম উইদআউট বিজেপি’—শিরোনামের ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত ৯০ শতাংশে পৌঁছে যাবে এবং তারা চা বাগান, বিমানবন্দর, স্টেডিয়ামের মতো সব জনসমাগমস্থল দখল করে নেবে। ভিডিওতে দেখানো হয়, মুসলিমরা কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে অবৈধভাবে প্রবেশ করবে এবং গরুর মাংস খাওয়া বৈধ করবে। উল্লেখ্য, ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি বা খাওয়া নিষিদ্ধ, আর উচ্চবর্ণের অনেক হিন্দুই নিরামিষাশী।
তবে সীমাঞ্চলের মুসলিমদের কাছে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীর’ এই বুলি নতুন নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা অনেক বেশি এবং ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ কাছেই হওয়ায় এই অভিযোগকে ঘিরে রাজনীতি হয়। সীমাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিজেপি বহু বছর ধরে এ অঞ্চলকে ‘হিন্দুত্ববাদের ল্যাবরেটরি’ বানানোর চেষ্টা করছে। এই শব্দটি বেশি ব্যবহার হয় গুজরাটকে বোঝাতে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি ২০০১ সালের ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মাত্র দুই মাসের মাথায় ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মুসলিম নিহত হয়েছিলেন।
সীমাঞ্চলের এক বাসিন্দা মুখতার আলম বলেন, ‘যখনই কোনো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকে এখানে দেখি, আমরা আতঙ্কে থাকি তিনি আমাদের নিয়ে কী মন্তব্য করবেন এবং তার প্রভাব কী হবে।’ গত মাসে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী ও বিহারের বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক দানব এসেছে, আমাদের সেই দানবদের মারতে হবে।’
এর আগেও গত বছরের অক্টোবরে গিরিরাজ সিং সীমাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী ভাগলপুর জেলায় একটি ‘হিন্দু প্রাইড মার্চ’ আয়োজন করেছিলেন। ওই এলাকায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম বাস করেন। সমাবেশে তিনি বারবার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কথা বলেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ‘লাভ জিহাদ’–এর মতো ইস্যু তোলেন। ‘লাভ জিহাদ’—হলো হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীর প্রচারিত একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যেখানে বলা হয়—মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের প্রেম বা বিয়েতে প্রলুব্ধ করে ধর্মান্তরিত করছে।
গত বছরের কিষানগঞ্জের সমাবেশে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই বাদিয়া (শেরশাহবাদি), অনুপ্রবেশকারী আর মুসলিমরা যদি আমাদের একবার থাপ্পড় মারে, আমরা একসঙ্গে হয়ে তাদের হাজারবার থাপ্পড় মারব।’ তাঁর এই মন্তব্যে ভিড় উল্লাসে ফেটে পড়ে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিজেপির বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর বলেন, তাঁর দলের সীমাঞ্চলের শেরশাহবাদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। তিনি দাবি করেন, ‘এটা কোনো ভোট বা মেরুকরণের বিষয় নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে অনুপ্রবেশের কারণে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ না হয়, ২০–২৫ বছরের মধ্যে সীমাঞ্চল বাংলাদেশে পরিণত হবে।’
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সাবেক অধ্যাপক পুষ্পেন্দ্র মনে করেন, বিজেপির এই মেরুকরণের কৌশল সীমাঞ্চলে তেমন কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, ‘বিজেপি ঝাড়খণ্ডের ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর ইস্যু তুলেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি, কারণ অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না। একই ঘটনা বিহারেও ঘটবে। কারণ সীমাঞ্চলে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ আদৌ নেই। আর কীভাবে হবে? সীমাঞ্চলের সঙ্গে তো বাংলাদেশের সীমান্তই নেই।’
দশক পুরোনো প্রচারণা
ভারতের বিহারের সীমাঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করার প্রচার নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক আগে আসাম থেকে শুরু হয়েছিল এ প্রচার। সত্তরের দশকের শেষ দিকে আসামের এক ছাত্র সংগঠন রাস্তায় নেমে বাংলাভাষী মুসলমানদের বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এর ফলেই হাজারো মুসলমান হয় দেশ থেকে বিতাড়িত, নয়তো ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ ঘোষিত হয়। এতে তাঁদের আইনি অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়ে যান তাঁরা।
আসাম থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন দ্রুত বিহারেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিষয়টি প্রথম সামনে আনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। এটি চরম ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্র সংগঠন। ১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া আরএসএস শুরুর দিকে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট দলগুলো থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছিল। বিজেপির আদর্শিক পথপ্রদর্শক সংগঠনটি ভারতের সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে বদলে জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। সারা ভারতে তাদের হাজারো শাখা আছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির শীর্ষ নেতারাও এই সংগঠনের আজীবন সদস্য।
আশির দশকের শুরুতে এবিভিপি দাবি করে, সীমাঞ্চলে ২০ হাজার বাংলাদেশি আছে, যারা স্থানীয় ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে। এরপর আসামের মতো ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দাবি তোলে তারা। ১৯৮৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবিভিপির দাবি মেনে নেয়। প্রায় ৬ হাজার মুসলমানকে নাগরিকত্ব প্রমাণের নোটিশ পাঠায় কমিশন। তাঁদের সবাই শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের সদস্য।
সেই সময় তরুণ মুসলিম অধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এবিভিপির এ প্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম সংগঠক। এখন তিনি সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ। তিনি বলেন, ‘তাদের জমির কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল। আমরা ক্যাম্প বসিয়ে কাগজ সংগ্রহ করি। পরে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজ্যের রাজধানী পাটনায় যাই।’ তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত কাউকেই নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘পুরো ঘটনাই এবিভিপির সাজানো নাটক ছিল।’
কিন্তু সেই পুরোনো প্রচারণা ফের জোরদার হয়েছে সীমাঞ্চলে। একাধিক বিজেপি নেতা আসাম মডেলের মতো সীমাঞ্চলেও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) চালুর দাবি তুলছেন। এনআরসি হলো—ভারতের সব নাগরিকের একটি তালিকা, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করা।
সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিক তালিকার বাইরে রেখে দেওয়া হয়। তাঁদের ‘অন্য দেশের নাগরিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়। মোদি সরকার বারবার জানিয়েছে, সারা দেশেই এনআরসি চালু করা হবে।
২০২৩ সালে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে বলেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর কারণে কাটিহার, কিষানগঞ্জ, আরারিয়া, পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের জনসংখ্যার চিত্রই বদলে গেছে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, এনআরসি কার্যকর করে সব বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে দিতে হবে।’
কাটিহারের শেরশাহবাদি অধ্যুষিত জাংলা তাল গ্রামের বাসিন্দা আকবর ইমাম বলেন, তাঁদের গ্রামে হিন্দুদের মধ্যে আগেই আলোচনা চলছে, মুসলমানদের যদি বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে তাড়ানো হয়, তাহলে কারা কোন মুসলমানের বাড়িঘর দখল করবে। ৪৬ বছরের এ কৃষক বলেন, ‘আসামে যখন এনআরসি চালু হলো, তখন থেকেই হিন্দুদের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল—কোন মুসলমানের বাড়ি কে নেবে। আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে নাগরিকত্ব প্রমাণে পুরোনো জমির কাগজ জোগাড় করা কঠিন হবে।’
স্বাভাবিক করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন
ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগ বিজেপিকে নতুন করে সীমাঞ্চলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়েছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নামের এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮ কোটি ভোটারের তালিকা সংশোধন করা হয়।
নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে খুব কম সময়ের মধ্যে একগাদা কাগজপত্র দিতে বলা হয়। সমালোচকেরা বলছেন, এটি ছিল সরকার সমর্থিত এক কৌশল, যাতে মুসলমান ও অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়। বিজেপি মরিয়া হয়ে এই রাজ্য জিততে চায়।
এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেবল প্রথম সাত দিনে কিষানগঞ্জ আবাসিক সনদের আবেদন বেড়ে গেছে ১০ গুণ। এর মানে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।’

গত ৩০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। এতে প্রায় ৮ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত কিষানগঞ্জ—যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মুসলিম—দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ নাম কাটা গেছে। পুরো সীমাঞ্চল অঞ্চলে বাদ পড়েছে গড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিষ্ঠাতা লালু প্রসাদ যাদবের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে।
রোববার ও সোমবার টানা দুদিনের সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়—এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কতজন ‘বিদেশি ভোটার’ শনাক্ত হয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন? তিনি বলেন, ‘নাম বাদ দেওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—অনেকেই মারা গেছেন, কেউ ভারতের নাগরিক নন, কারও নাম একাধিকবার উঠেছে, আবার অনেকে বিহার ছেড়ে চলে গেছেন।’ পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি মনে করেন কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেছে, তাহলে অভিযোগ বা দাবি দাখিল করা যাবে।
কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আকবরের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। তিনি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি ভয় পাননি। কারণ, তাঁর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আছে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমাদের সব প্রমাণপত্র আছে। যাদের টার্গেট করা হয়, তারাই বরং সব সময় শক্ত প্রমাণপত্র গুছিয়ে রাখে।’
স্থানীয় শিক্ষাবিদ পুষ্পেন্দ্রর মতে, বিজেপি শেরশাহবাদি মুসলমানদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যা দিয়ে শুধু সীমাঞ্চল নয়, সারা বিহারে নির্বাচনী সুবিধা নিতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলে মুসলমান বেশি থাকায় সেখানে বিজেপির তেমন লাভ হবে না। তারা জানে, শেরশাহবাদি মুসলিমদের দোষারোপ করে আসলে সীমাঞ্চলের বাইরের হিন্দু ভোটারদের প্রভাবিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় বেশি আসন জিততে চাইছে বিজেপি।’
উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার রাজ্য বিহার
শেরশাহবাদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারণার সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে। কিষানগঞ্জ মুসলমানদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কিষানগঞ্জ এক দশক ধরে বেসরকারি স্কুল চালাচ্ছেন তাফহিম রহমান। তিনি বলেন, ‘আজকাল প্রায় কোনো হিন্দু পরিবার তাদের সন্তানকে মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে পাঠায় না।’
তাফহিম রহমান জানান, স্কুলটি যখন তিনি শুরু করেছিলেন, শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল হিন্দু। এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ শতাংশে। তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি অনেক সচ্ছল মুসলিম পরিবারও তাদের সন্তানকে এসব স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই নীরব বিচ্ছিন্নতা আসলে ভয়ংকর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এটা দেখাচ্ছে, নির্বাচনী রাজনীতি কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে স্বাভাবিক করে তুলছে।’
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতেও। কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আজাদ আলম একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক। তিনি বলেন, ‘হিন্দু রোগীরা মুসলিম-পরিচালিত হাসপাতাল, বিশেষ করে শেরশাহবাদিদের হাসপাতাল যেতে সংকোচ বোধ করেন। এমনকি চিকিৎসকদের সহায়তার দরকার হলে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনগুলোও মুসলিম চিকিৎসকদের পাশে খুব কমই দাঁড়ায়।’
তবে সীমাঞ্চল অঞ্চলে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অনেক হিন্দুই বলেছেন, তারা ধর্মভিত্তিক বিভাজনে বিশ্বাস করেন না। ৪৯ বছরের ধোপা অজয় কুমার চৌধুরী বলেন, ‘কিষানগঞ্জ যদি কোনো হিন্দু মনে করে যে মুসলিম ডাক্তার বা মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে যাওয়া উচিত নয়, সেটা ভুল।’
তাঁর ভাষায়, ‘কিষানগঞ্জ মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা; মুসলমান ছাড়া হিন্দু ব্যবসা টিকতে পারবে না। আমার ৯০ শতাংশ ক্রেতাই মুসলমান। আর আমি যদি চিকিৎসকের কাছে যাই, আগে দেখি তিনি ভালো ডাক্তার কিনা, তার ধর্ম নয়।’
কিন্তু কাটিহারের ৬২ বছর বয়সী আইনজীবী অমরিন্দর বাঘি—যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত—ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘অবৈধ মুসলিমরা দেশে ঢুকেছে, সরকারকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বাঘি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি অবৈধভাবে কোনো দেশে প্রবেশ করে, সেটা সরকারের পূর্ণ দায়িত্ব। যেমন কেউ যদি আমার ঘরে ঢোকে, এর মানে হয় আমি দুর্বল এবং পরাস্ত, নয়তো আমি শক্তিশালী কিন্তু ঘুমিয়ে আছি।’
এমন মেরুকৃত পরিবেশ মুসলিম সম্প্রদায়কে হতাশ করছে বলে মনে করেন বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আদিল হোসেন। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলের মূল সমস্যা উন্নয়ন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এটাকে নিরাপত্তা ইস্যু বানানো হচ্ছে, অবৈধ অনুপ্রবেশের ভূত দেখিয়ে। এতে মানুষ উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। নাগরিক হিসেবে নিজেদের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে এটা সবচেয়ে বড় অন্তরায়।’
আজাদ আলম চিন্তিত বিজেপির মুসলিমবিরোধী প্রচারণা নিয়ে। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার রাজনীতিকেরা শেরশাহবাদি মুসলমানদের নিয়ে মন্তব্য করলে আমাদের ব্যাখ্যা দিতে হয় যে, আমরা অনুপ্রবেশকারী নই। আমাদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শেরশাহবাদি মুসলমান হিসেবে ওই সব মন্তব্য মাথায় ঘুরপাক খায়। যেন কোনো অসুখ... যেন এক অদৃশ্য ভূত।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

এক দশকেরও বেশি আগে, যখন মুখতার আলম কিষানগঞ্জের সরকারি স্কুলে পড়তেন, তখন তাঁর বন্ধুদের বেশির ভাগই ছিল হিন্দু। কিষানগঞ্জ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যের একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা। মুখতারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিল এক হিন্দু বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে পড়াশোনা করতেন, স্কুলের প্রজেক্ট করতেন। মুখতার তাঁর বন্ধুর খেয়াল রাখতেন। একসঙ্গে খাওয়ার সময় তিনি মাংস খেতেন না, কারণ তাঁর বন্ধু ছিলেন নিরামিষাশী।
কিন্তু দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার পর সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। এখনো সেই সম্পর্ক জোড়া লাগেনি। ঘটনাটা ঘটে জিতনরাম মাঞ্জির এক বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জোটসঙ্গী। কিষানগঞ্জ এক সমাবেশে মাঞ্জি মুসলিম শেরশাহবাদি সম্প্রদায়কে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেন। বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী, যেখানে ৯১ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম এবং প্রধান ভাষা বাংলা।

শেরশাহবাদি নামটি এসেছে ঐতিহাসিক শেরশাহবাদ অঞ্চল থেকে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত। আর ‘শেরশাহবাদ’ শব্দটির উৎপত্তি বলা হয় আফগান শাসক শেরশাহ সূরির নাম থেকে। তিনি শক্তিশালী মুঘলদের পরাজিত করে ষোড়শ শতকে অল্প সময়ের জন্য বিহার ও বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশসহ) শাসন করেছিলেন।
বিহারে হিন্দি ও উর্দু বেশ প্রচলিত। কিন্তু শেরশাহবাদি মুসলিমরা কথা বলেন বাংলার এক বিশেষ উপভাষায়, যেখানে উর্দু ও হিন্দির অনেক শব্দ মিশে আছে। তাঁদের অনেকে ‘বাদিয়া’ বা ‘ভাটিয়া’ নামেও পরিচিত। ভাটিয়া শব্দটি এসেছে স্থানীয় উপভাষার ‘ভাটো’ থেকে—যার অর্থ, নদীর স্রোতের বিপরীতে যাওয়া। ইতিহাস বলে, শেরশাহবাদিরা পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে গঙ্গার উজান বেয়ে এসে শেষ পর্যন্ত বিহারের সীমাঞ্চলে বসতি গড়েন। সীমাঞ্চলকে বলা হয় ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা।
মুখতার আলম বলেন, মাঞ্জির বক্তব্যের পর ‘আমরা হুমকির মুখে পড়েছি।’ মুখতার শেরশাহবাদি মুসলিম এবং ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক। চুপ না থেকে তিনি ফেসবুকে প্রতিবাদ করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর পোস্টের নিচে হিন্দিতে এক মন্তব্য ভেসে ওঠে—‘তোরা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।’ আর সেই মন্তব্যটি করেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তিনি বলেন, ‘ওই মন্তব্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর কেঁপে ওঠে।’
মুখতার সীমাঞ্চল এলাকায় একটি প্রাথমিক স্কুল চালান। সেই স্কুলের খড়ের ছাউনির তলায় বসে আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সেই মন্তব্য আমাদের সম্পর্ক ভেঙে দেয়। আমাদের মধ্যকার বিশ্বাস–আস্থা হারিয়ে যায়। ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব—সব শেষ হয়ে যায়।’
বিহার রাজ্য সরকারের প্রকাশিত ২০২৩ সালের জাতিভিত্তিক শুমারির তথ্য বলছে, বিহারে শেরশাহবাদি মুসলিমের সংখ্যা ১৩ লাখ। এঁদের বেশির ভাগ থাকেন—কিষানগঞ্জ ও কাটিহার জেলায়।

ভারতের তৃতীয় জনবহুল রাজ্য বিহার এখন গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আর এই প্রেক্ষাপটেই কিষানগঞ্জ ও কাটিহারকে কেন্দ্র করে বিজেপি জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটির অভিযোগ, এখানে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা’ বসবাস করছে।
শেরশাহাবাদি মুসলিমরাই টার্গেট কেন
গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না। বিশ্বের কোনো দেশ তা করে না—তাহলে ভারত কীভাবে তা মেনে নেবে?’
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা কারা। তাঁর দাবি, এই মিশনের মাধ্যমে দেশকে ঘিরে থাকা ‘গুরুতর সংকট’ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধান করা হবে। এখনো সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করে। এদের প্রধানত বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে টার্গেট করা হয়। আসামে বিজেপি ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায়। সেখানকার সরকার বহুদিন ধরে বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা নাকি রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য পাল্টে দিতে চাইছে।
আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে মুসলিমের হার এত বেশি নয়। শুধু কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীর ও আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপে এর চেয়ে বেশি মুসলিম বাস করেন। বিহারের মুসলিম জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ (২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী)। এই মুসলিমদের প্রায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ বসবাস করেন সীমাঞ্চল এলাকায়। এখানে কিষানগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পূর্ণিয়া জেলা রয়েছে। কিষানগঞ্জ, কাটিহার ও পূর্ণিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। আর সীমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত কয়েক কিলোমিটার দূরে।
আগামী ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই দফায় বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হবে। ফল ঘোষণা করা হবে ১৪ নভেম্বর। বিজেপি কখনোই বিহারে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। গত ২০ বছরের বেশির ভাগ সময়ই আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, এবার বিজেপি ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু সামনে এনে সীমাঞ্চলের ভোটারদের ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।
গত দুই বছরে স্থানীয় মুসলিমদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। কারণ, এখন স্বয়ং মোদি এই প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছর ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে মোদি বলেছিলেন, ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা লোকেরা পূর্ণিয়া ও সীমাঞ্চলকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। এতে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।’
এ বছর বিহারের বিভিন্ন জেলার নির্বাচনী জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক এক সমাবেশে মোদি বলেন, ‘আজ সীমাঞ্চলসহ পূর্ব ভারতের বহু জায়গায় অনুপ্রবেশকারীদের কারণে ভয়াবহ জনসংখ্যাগত সংকট তৈরি হয়েছে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে দেশ থেকে তাড়ানো হবে।’ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এ অভিযান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
‘দানব/অসুর এসেছে বাংলাদেশ থেকে’
ভারতের বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে সম্প্রতি কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও রাজধানী দিল্লি থেকে শত শত বাংলাভাষী মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছে। অথচ তাঁদের অনেকের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র ছিল। সমালোচকেরা বলছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য মুসলিমদের টার্গেট করা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে বিজেপির আসাম শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করে। ‘আসাম উইদআউট বিজেপি’—শিরোনামের ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত ৯০ শতাংশে পৌঁছে যাবে এবং তারা চা বাগান, বিমানবন্দর, স্টেডিয়ামের মতো সব জনসমাগমস্থল দখল করে নেবে। ভিডিওতে দেখানো হয়, মুসলিমরা কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে অবৈধভাবে প্রবেশ করবে এবং গরুর মাংস খাওয়া বৈধ করবে। উল্লেখ্য, ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি বা খাওয়া নিষিদ্ধ, আর উচ্চবর্ণের অনেক হিন্দুই নিরামিষাশী।
তবে সীমাঞ্চলের মুসলিমদের কাছে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীর’ এই বুলি নতুন নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা অনেক বেশি এবং ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ কাছেই হওয়ায় এই অভিযোগকে ঘিরে রাজনীতি হয়। সীমাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিজেপি বহু বছর ধরে এ অঞ্চলকে ‘হিন্দুত্ববাদের ল্যাবরেটরি’ বানানোর চেষ্টা করছে। এই শব্দটি বেশি ব্যবহার হয় গুজরাটকে বোঝাতে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি ২০০১ সালের ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মাত্র দুই মাসের মাথায় ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মুসলিম নিহত হয়েছিলেন।
সীমাঞ্চলের এক বাসিন্দা মুখতার আলম বলেন, ‘যখনই কোনো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকে এখানে দেখি, আমরা আতঙ্কে থাকি তিনি আমাদের নিয়ে কী মন্তব্য করবেন এবং তার প্রভাব কী হবে।’ গত মাসে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী ও বিহারের বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক দানব এসেছে, আমাদের সেই দানবদের মারতে হবে।’
এর আগেও গত বছরের অক্টোবরে গিরিরাজ সিং সীমাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী ভাগলপুর জেলায় একটি ‘হিন্দু প্রাইড মার্চ’ আয়োজন করেছিলেন। ওই এলাকায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম বাস করেন। সমাবেশে তিনি বারবার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কথা বলেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ‘লাভ জিহাদ’–এর মতো ইস্যু তোলেন। ‘লাভ জিহাদ’—হলো হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীর প্রচারিত একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যেখানে বলা হয়—মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের প্রেম বা বিয়েতে প্রলুব্ধ করে ধর্মান্তরিত করছে।
গত বছরের কিষানগঞ্জের সমাবেশে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই বাদিয়া (শেরশাহবাদি), অনুপ্রবেশকারী আর মুসলিমরা যদি আমাদের একবার থাপ্পড় মারে, আমরা একসঙ্গে হয়ে তাদের হাজারবার থাপ্পড় মারব।’ তাঁর এই মন্তব্যে ভিড় উল্লাসে ফেটে পড়ে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিজেপির বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর বলেন, তাঁর দলের সীমাঞ্চলের শেরশাহবাদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। তিনি দাবি করেন, ‘এটা কোনো ভোট বা মেরুকরণের বিষয় নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে অনুপ্রবেশের কারণে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ না হয়, ২০–২৫ বছরের মধ্যে সীমাঞ্চল বাংলাদেশে পরিণত হবে।’
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সাবেক অধ্যাপক পুষ্পেন্দ্র মনে করেন, বিজেপির এই মেরুকরণের কৌশল সীমাঞ্চলে তেমন কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, ‘বিজেপি ঝাড়খণ্ডের ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর ইস্যু তুলেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি, কারণ অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না। একই ঘটনা বিহারেও ঘটবে। কারণ সীমাঞ্চলে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ আদৌ নেই। আর কীভাবে হবে? সীমাঞ্চলের সঙ্গে তো বাংলাদেশের সীমান্তই নেই।’
দশক পুরোনো প্রচারণা
ভারতের বিহারের সীমাঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করার প্রচার নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক আগে আসাম থেকে শুরু হয়েছিল এ প্রচার। সত্তরের দশকের শেষ দিকে আসামের এক ছাত্র সংগঠন রাস্তায় নেমে বাংলাভাষী মুসলমানদের বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এর ফলেই হাজারো মুসলমান হয় দেশ থেকে বিতাড়িত, নয়তো ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ ঘোষিত হয়। এতে তাঁদের আইনি অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়ে যান তাঁরা।
আসাম থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন দ্রুত বিহারেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিষয়টি প্রথম সামনে আনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। এটি চরম ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্র সংগঠন। ১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া আরএসএস শুরুর দিকে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট দলগুলো থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছিল। বিজেপির আদর্শিক পথপ্রদর্শক সংগঠনটি ভারতের সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে বদলে জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। সারা ভারতে তাদের হাজারো শাখা আছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির শীর্ষ নেতারাও এই সংগঠনের আজীবন সদস্য।
আশির দশকের শুরুতে এবিভিপি দাবি করে, সীমাঞ্চলে ২০ হাজার বাংলাদেশি আছে, যারা স্থানীয় ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে। এরপর আসামের মতো ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দাবি তোলে তারা। ১৯৮৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবিভিপির দাবি মেনে নেয়। প্রায় ৬ হাজার মুসলমানকে নাগরিকত্ব প্রমাণের নোটিশ পাঠায় কমিশন। তাঁদের সবাই শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের সদস্য।
সেই সময় তরুণ মুসলিম অধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এবিভিপির এ প্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম সংগঠক। এখন তিনি সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ। তিনি বলেন, ‘তাদের জমির কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল। আমরা ক্যাম্প বসিয়ে কাগজ সংগ্রহ করি। পরে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজ্যের রাজধানী পাটনায় যাই।’ তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত কাউকেই নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘পুরো ঘটনাই এবিভিপির সাজানো নাটক ছিল।’
কিন্তু সেই পুরোনো প্রচারণা ফের জোরদার হয়েছে সীমাঞ্চলে। একাধিক বিজেপি নেতা আসাম মডেলের মতো সীমাঞ্চলেও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) চালুর দাবি তুলছেন। এনআরসি হলো—ভারতের সব নাগরিকের একটি তালিকা, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করা।
সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিক তালিকার বাইরে রেখে দেওয়া হয়। তাঁদের ‘অন্য দেশের নাগরিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়। মোদি সরকার বারবার জানিয়েছে, সারা দেশেই এনআরসি চালু করা হবে।
২০২৩ সালে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে বলেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর কারণে কাটিহার, কিষানগঞ্জ, আরারিয়া, পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের জনসংখ্যার চিত্রই বদলে গেছে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, এনআরসি কার্যকর করে সব বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে দিতে হবে।’
কাটিহারের শেরশাহবাদি অধ্যুষিত জাংলা তাল গ্রামের বাসিন্দা আকবর ইমাম বলেন, তাঁদের গ্রামে হিন্দুদের মধ্যে আগেই আলোচনা চলছে, মুসলমানদের যদি বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে তাড়ানো হয়, তাহলে কারা কোন মুসলমানের বাড়িঘর দখল করবে। ৪৬ বছরের এ কৃষক বলেন, ‘আসামে যখন এনআরসি চালু হলো, তখন থেকেই হিন্দুদের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল—কোন মুসলমানের বাড়ি কে নেবে। আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে নাগরিকত্ব প্রমাণে পুরোনো জমির কাগজ জোগাড় করা কঠিন হবে।’
স্বাভাবিক করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন
ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগ বিজেপিকে নতুন করে সীমাঞ্চলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়েছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নামের এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮ কোটি ভোটারের তালিকা সংশোধন করা হয়।
নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে খুব কম সময়ের মধ্যে একগাদা কাগজপত্র দিতে বলা হয়। সমালোচকেরা বলছেন, এটি ছিল সরকার সমর্থিত এক কৌশল, যাতে মুসলমান ও অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়। বিজেপি মরিয়া হয়ে এই রাজ্য জিততে চায়।
এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেবল প্রথম সাত দিনে কিষানগঞ্জ আবাসিক সনদের আবেদন বেড়ে গেছে ১০ গুণ। এর মানে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।’

গত ৩০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। এতে প্রায় ৮ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত কিষানগঞ্জ—যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মুসলিম—দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ নাম কাটা গেছে। পুরো সীমাঞ্চল অঞ্চলে বাদ পড়েছে গড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিষ্ঠাতা লালু প্রসাদ যাদবের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে।
রোববার ও সোমবার টানা দুদিনের সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়—এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কতজন ‘বিদেশি ভোটার’ শনাক্ত হয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন? তিনি বলেন, ‘নাম বাদ দেওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—অনেকেই মারা গেছেন, কেউ ভারতের নাগরিক নন, কারও নাম একাধিকবার উঠেছে, আবার অনেকে বিহার ছেড়ে চলে গেছেন।’ পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি মনে করেন কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেছে, তাহলে অভিযোগ বা দাবি দাখিল করা যাবে।
কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আকবরের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। তিনি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি ভয় পাননি। কারণ, তাঁর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আছে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমাদের সব প্রমাণপত্র আছে। যাদের টার্গেট করা হয়, তারাই বরং সব সময় শক্ত প্রমাণপত্র গুছিয়ে রাখে।’
স্থানীয় শিক্ষাবিদ পুষ্পেন্দ্রর মতে, বিজেপি শেরশাহবাদি মুসলমানদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যা দিয়ে শুধু সীমাঞ্চল নয়, সারা বিহারে নির্বাচনী সুবিধা নিতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলে মুসলমান বেশি থাকায় সেখানে বিজেপির তেমন লাভ হবে না। তারা জানে, শেরশাহবাদি মুসলিমদের দোষারোপ করে আসলে সীমাঞ্চলের বাইরের হিন্দু ভোটারদের প্রভাবিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় বেশি আসন জিততে চাইছে বিজেপি।’
উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার রাজ্য বিহার
শেরশাহবাদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারণার সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে। কিষানগঞ্জ মুসলমানদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কিষানগঞ্জ এক দশক ধরে বেসরকারি স্কুল চালাচ্ছেন তাফহিম রহমান। তিনি বলেন, ‘আজকাল প্রায় কোনো হিন্দু পরিবার তাদের সন্তানকে মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে পাঠায় না।’
তাফহিম রহমান জানান, স্কুলটি যখন তিনি শুরু করেছিলেন, শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল হিন্দু। এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ শতাংশে। তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি অনেক সচ্ছল মুসলিম পরিবারও তাদের সন্তানকে এসব স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই নীরব বিচ্ছিন্নতা আসলে ভয়ংকর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এটা দেখাচ্ছে, নির্বাচনী রাজনীতি কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে স্বাভাবিক করে তুলছে।’
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতেও। কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আজাদ আলম একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক। তিনি বলেন, ‘হিন্দু রোগীরা মুসলিম-পরিচালিত হাসপাতাল, বিশেষ করে শেরশাহবাদিদের হাসপাতাল যেতে সংকোচ বোধ করেন। এমনকি চিকিৎসকদের সহায়তার দরকার হলে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনগুলোও মুসলিম চিকিৎসকদের পাশে খুব কমই দাঁড়ায়।’
তবে সীমাঞ্চল অঞ্চলে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অনেক হিন্দুই বলেছেন, তারা ধর্মভিত্তিক বিভাজনে বিশ্বাস করেন না। ৪৯ বছরের ধোপা অজয় কুমার চৌধুরী বলেন, ‘কিষানগঞ্জ যদি কোনো হিন্দু মনে করে যে মুসলিম ডাক্তার বা মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে যাওয়া উচিত নয়, সেটা ভুল।’
তাঁর ভাষায়, ‘কিষানগঞ্জ মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা; মুসলমান ছাড়া হিন্দু ব্যবসা টিকতে পারবে না। আমার ৯০ শতাংশ ক্রেতাই মুসলমান। আর আমি যদি চিকিৎসকের কাছে যাই, আগে দেখি তিনি ভালো ডাক্তার কিনা, তার ধর্ম নয়।’
কিন্তু কাটিহারের ৬২ বছর বয়সী আইনজীবী অমরিন্দর বাঘি—যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত—ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘অবৈধ মুসলিমরা দেশে ঢুকেছে, সরকারকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বাঘি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি অবৈধভাবে কোনো দেশে প্রবেশ করে, সেটা সরকারের পূর্ণ দায়িত্ব। যেমন কেউ যদি আমার ঘরে ঢোকে, এর মানে হয় আমি দুর্বল এবং পরাস্ত, নয়তো আমি শক্তিশালী কিন্তু ঘুমিয়ে আছি।’
এমন মেরুকৃত পরিবেশ মুসলিম সম্প্রদায়কে হতাশ করছে বলে মনে করেন বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আদিল হোসেন। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলের মূল সমস্যা উন্নয়ন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এটাকে নিরাপত্তা ইস্যু বানানো হচ্ছে, অবৈধ অনুপ্রবেশের ভূত দেখিয়ে। এতে মানুষ উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। নাগরিক হিসেবে নিজেদের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে এটা সবচেয়ে বড় অন্তরায়।’
আজাদ আলম চিন্তিত বিজেপির মুসলিমবিরোধী প্রচারণা নিয়ে। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার রাজনীতিকেরা শেরশাহবাদি মুসলমানদের নিয়ে মন্তব্য করলে আমাদের ব্যাখ্যা দিতে হয় যে, আমরা অনুপ্রবেশকারী নই। আমাদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শেরশাহবাদি মুসলমান হিসেবে ওই সব মন্তব্য মাথায় ঘুরপাক খায়। যেন কোনো অসুখ... যেন এক অদৃশ্য ভূত।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান
আজকের পত্রিকা ডেস্ক

এক দশকেরও বেশি আগে, যখন মুখতার আলম কিষানগঞ্জের সরকারি স্কুলে পড়তেন, তখন তাঁর বন্ধুদের বেশির ভাগই ছিল হিন্দু। কিষানগঞ্জ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যের একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা। মুখতারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিল এক হিন্দু বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে পড়াশোনা করতেন, স্কুলের প্রজেক্ট করতেন। মুখতার তাঁর বন্ধুর খেয়াল রাখতেন। একসঙ্গে খাওয়ার সময় তিনি মাংস খেতেন না, কারণ তাঁর বন্ধু ছিলেন নিরামিষাশী।
কিন্তু দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার পর সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। এখনো সেই সম্পর্ক জোড়া লাগেনি। ঘটনাটা ঘটে জিতনরাম মাঞ্জির এক বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জোটসঙ্গী। কিষানগঞ্জ এক সমাবেশে মাঞ্জি মুসলিম শেরশাহবাদি সম্প্রদায়কে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেন। বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী, যেখানে ৯১ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম এবং প্রধান ভাষা বাংলা।

শেরশাহবাদি নামটি এসেছে ঐতিহাসিক শেরশাহবাদ অঞ্চল থেকে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত। আর ‘শেরশাহবাদ’ শব্দটির উৎপত্তি বলা হয় আফগান শাসক শেরশাহ সূরির নাম থেকে। তিনি শক্তিশালী মুঘলদের পরাজিত করে ষোড়শ শতকে অল্প সময়ের জন্য বিহার ও বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশসহ) শাসন করেছিলেন।
বিহারে হিন্দি ও উর্দু বেশ প্রচলিত। কিন্তু শেরশাহবাদি মুসলিমরা কথা বলেন বাংলার এক বিশেষ উপভাষায়, যেখানে উর্দু ও হিন্দির অনেক শব্দ মিশে আছে। তাঁদের অনেকে ‘বাদিয়া’ বা ‘ভাটিয়া’ নামেও পরিচিত। ভাটিয়া শব্দটি এসেছে স্থানীয় উপভাষার ‘ভাটো’ থেকে—যার অর্থ, নদীর স্রোতের বিপরীতে যাওয়া। ইতিহাস বলে, শেরশাহবাদিরা পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে গঙ্গার উজান বেয়ে এসে শেষ পর্যন্ত বিহারের সীমাঞ্চলে বসতি গড়েন। সীমাঞ্চলকে বলা হয় ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা।
মুখতার আলম বলেন, মাঞ্জির বক্তব্যের পর ‘আমরা হুমকির মুখে পড়েছি।’ মুখতার শেরশাহবাদি মুসলিম এবং ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক। চুপ না থেকে তিনি ফেসবুকে প্রতিবাদ করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর পোস্টের নিচে হিন্দিতে এক মন্তব্য ভেসে ওঠে—‘তোরা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।’ আর সেই মন্তব্যটি করেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তিনি বলেন, ‘ওই মন্তব্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর কেঁপে ওঠে।’
মুখতার সীমাঞ্চল এলাকায় একটি প্রাথমিক স্কুল চালান। সেই স্কুলের খড়ের ছাউনির তলায় বসে আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সেই মন্তব্য আমাদের সম্পর্ক ভেঙে দেয়। আমাদের মধ্যকার বিশ্বাস–আস্থা হারিয়ে যায়। ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব—সব শেষ হয়ে যায়।’
বিহার রাজ্য সরকারের প্রকাশিত ২০২৩ সালের জাতিভিত্তিক শুমারির তথ্য বলছে, বিহারে শেরশাহবাদি মুসলিমের সংখ্যা ১৩ লাখ। এঁদের বেশির ভাগ থাকেন—কিষানগঞ্জ ও কাটিহার জেলায়।

ভারতের তৃতীয় জনবহুল রাজ্য বিহার এখন গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আর এই প্রেক্ষাপটেই কিষানগঞ্জ ও কাটিহারকে কেন্দ্র করে বিজেপি জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটির অভিযোগ, এখানে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা’ বসবাস করছে।
শেরশাহাবাদি মুসলিমরাই টার্গেট কেন
গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না। বিশ্বের কোনো দেশ তা করে না—তাহলে ভারত কীভাবে তা মেনে নেবে?’
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা কারা। তাঁর দাবি, এই মিশনের মাধ্যমে দেশকে ঘিরে থাকা ‘গুরুতর সংকট’ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধান করা হবে। এখনো সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করে। এদের প্রধানত বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে টার্গেট করা হয়। আসামে বিজেপি ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায়। সেখানকার সরকার বহুদিন ধরে বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা নাকি রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য পাল্টে দিতে চাইছে।
আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে মুসলিমের হার এত বেশি নয়। শুধু কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীর ও আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপে এর চেয়ে বেশি মুসলিম বাস করেন। বিহারের মুসলিম জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ (২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী)। এই মুসলিমদের প্রায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ বসবাস করেন সীমাঞ্চল এলাকায়। এখানে কিষানগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পূর্ণিয়া জেলা রয়েছে। কিষানগঞ্জ, কাটিহার ও পূর্ণিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। আর সীমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত কয়েক কিলোমিটার দূরে।
আগামী ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই দফায় বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হবে। ফল ঘোষণা করা হবে ১৪ নভেম্বর। বিজেপি কখনোই বিহারে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। গত ২০ বছরের বেশির ভাগ সময়ই আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, এবার বিজেপি ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু সামনে এনে সীমাঞ্চলের ভোটারদের ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।
গত দুই বছরে স্থানীয় মুসলিমদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। কারণ, এখন স্বয়ং মোদি এই প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছর ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে মোদি বলেছিলেন, ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা লোকেরা পূর্ণিয়া ও সীমাঞ্চলকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। এতে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।’
এ বছর বিহারের বিভিন্ন জেলার নির্বাচনী জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক এক সমাবেশে মোদি বলেন, ‘আজ সীমাঞ্চলসহ পূর্ব ভারতের বহু জায়গায় অনুপ্রবেশকারীদের কারণে ভয়াবহ জনসংখ্যাগত সংকট তৈরি হয়েছে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে দেশ থেকে তাড়ানো হবে।’ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এ অভিযান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
‘দানব/অসুর এসেছে বাংলাদেশ থেকে’
ভারতের বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে সম্প্রতি কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও রাজধানী দিল্লি থেকে শত শত বাংলাভাষী মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছে। অথচ তাঁদের অনেকের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র ছিল। সমালোচকেরা বলছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য মুসলিমদের টার্গেট করা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে বিজেপির আসাম শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করে। ‘আসাম উইদআউট বিজেপি’—শিরোনামের ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত ৯০ শতাংশে পৌঁছে যাবে এবং তারা চা বাগান, বিমানবন্দর, স্টেডিয়ামের মতো সব জনসমাগমস্থল দখল করে নেবে। ভিডিওতে দেখানো হয়, মুসলিমরা কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে অবৈধভাবে প্রবেশ করবে এবং গরুর মাংস খাওয়া বৈধ করবে। উল্লেখ্য, ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি বা খাওয়া নিষিদ্ধ, আর উচ্চবর্ণের অনেক হিন্দুই নিরামিষাশী।
তবে সীমাঞ্চলের মুসলিমদের কাছে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীর’ এই বুলি নতুন নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা অনেক বেশি এবং ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ কাছেই হওয়ায় এই অভিযোগকে ঘিরে রাজনীতি হয়। সীমাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিজেপি বহু বছর ধরে এ অঞ্চলকে ‘হিন্দুত্ববাদের ল্যাবরেটরি’ বানানোর চেষ্টা করছে। এই শব্দটি বেশি ব্যবহার হয় গুজরাটকে বোঝাতে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি ২০০১ সালের ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মাত্র দুই মাসের মাথায় ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মুসলিম নিহত হয়েছিলেন।
সীমাঞ্চলের এক বাসিন্দা মুখতার আলম বলেন, ‘যখনই কোনো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকে এখানে দেখি, আমরা আতঙ্কে থাকি তিনি আমাদের নিয়ে কী মন্তব্য করবেন এবং তার প্রভাব কী হবে।’ গত মাসে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী ও বিহারের বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক দানব এসেছে, আমাদের সেই দানবদের মারতে হবে।’
এর আগেও গত বছরের অক্টোবরে গিরিরাজ সিং সীমাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী ভাগলপুর জেলায় একটি ‘হিন্দু প্রাইড মার্চ’ আয়োজন করেছিলেন। ওই এলাকায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম বাস করেন। সমাবেশে তিনি বারবার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কথা বলেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ‘লাভ জিহাদ’–এর মতো ইস্যু তোলেন। ‘লাভ জিহাদ’—হলো হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীর প্রচারিত একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যেখানে বলা হয়—মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের প্রেম বা বিয়েতে প্রলুব্ধ করে ধর্মান্তরিত করছে।
গত বছরের কিষানগঞ্জের সমাবেশে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই বাদিয়া (শেরশাহবাদি), অনুপ্রবেশকারী আর মুসলিমরা যদি আমাদের একবার থাপ্পড় মারে, আমরা একসঙ্গে হয়ে তাদের হাজারবার থাপ্পড় মারব।’ তাঁর এই মন্তব্যে ভিড় উল্লাসে ফেটে পড়ে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিজেপির বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর বলেন, তাঁর দলের সীমাঞ্চলের শেরশাহবাদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। তিনি দাবি করেন, ‘এটা কোনো ভোট বা মেরুকরণের বিষয় নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে অনুপ্রবেশের কারণে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ না হয়, ২০–২৫ বছরের মধ্যে সীমাঞ্চল বাংলাদেশে পরিণত হবে।’
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সাবেক অধ্যাপক পুষ্পেন্দ্র মনে করেন, বিজেপির এই মেরুকরণের কৌশল সীমাঞ্চলে তেমন কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, ‘বিজেপি ঝাড়খণ্ডের ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর ইস্যু তুলেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি, কারণ অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না। একই ঘটনা বিহারেও ঘটবে। কারণ সীমাঞ্চলে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ আদৌ নেই। আর কীভাবে হবে? সীমাঞ্চলের সঙ্গে তো বাংলাদেশের সীমান্তই নেই।’
দশক পুরোনো প্রচারণা
ভারতের বিহারের সীমাঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করার প্রচার নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক আগে আসাম থেকে শুরু হয়েছিল এ প্রচার। সত্তরের দশকের শেষ দিকে আসামের এক ছাত্র সংগঠন রাস্তায় নেমে বাংলাভাষী মুসলমানদের বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এর ফলেই হাজারো মুসলমান হয় দেশ থেকে বিতাড়িত, নয়তো ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ ঘোষিত হয়। এতে তাঁদের আইনি অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়ে যান তাঁরা।
আসাম থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন দ্রুত বিহারেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিষয়টি প্রথম সামনে আনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। এটি চরম ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্র সংগঠন। ১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া আরএসএস শুরুর দিকে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট দলগুলো থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছিল। বিজেপির আদর্শিক পথপ্রদর্শক সংগঠনটি ভারতের সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে বদলে জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। সারা ভারতে তাদের হাজারো শাখা আছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির শীর্ষ নেতারাও এই সংগঠনের আজীবন সদস্য।
আশির দশকের শুরুতে এবিভিপি দাবি করে, সীমাঞ্চলে ২০ হাজার বাংলাদেশি আছে, যারা স্থানীয় ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে। এরপর আসামের মতো ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দাবি তোলে তারা। ১৯৮৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবিভিপির দাবি মেনে নেয়। প্রায় ৬ হাজার মুসলমানকে নাগরিকত্ব প্রমাণের নোটিশ পাঠায় কমিশন। তাঁদের সবাই শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের সদস্য।
সেই সময় তরুণ মুসলিম অধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এবিভিপির এ প্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম সংগঠক। এখন তিনি সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ। তিনি বলেন, ‘তাদের জমির কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল। আমরা ক্যাম্প বসিয়ে কাগজ সংগ্রহ করি। পরে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজ্যের রাজধানী পাটনায় যাই।’ তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত কাউকেই নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘পুরো ঘটনাই এবিভিপির সাজানো নাটক ছিল।’
কিন্তু সেই পুরোনো প্রচারণা ফের জোরদার হয়েছে সীমাঞ্চলে। একাধিক বিজেপি নেতা আসাম মডেলের মতো সীমাঞ্চলেও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) চালুর দাবি তুলছেন। এনআরসি হলো—ভারতের সব নাগরিকের একটি তালিকা, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করা।
সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিক তালিকার বাইরে রেখে দেওয়া হয়। তাঁদের ‘অন্য দেশের নাগরিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়। মোদি সরকার বারবার জানিয়েছে, সারা দেশেই এনআরসি চালু করা হবে।
২০২৩ সালে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে বলেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর কারণে কাটিহার, কিষানগঞ্জ, আরারিয়া, পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের জনসংখ্যার চিত্রই বদলে গেছে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, এনআরসি কার্যকর করে সব বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে দিতে হবে।’
কাটিহারের শেরশাহবাদি অধ্যুষিত জাংলা তাল গ্রামের বাসিন্দা আকবর ইমাম বলেন, তাঁদের গ্রামে হিন্দুদের মধ্যে আগেই আলোচনা চলছে, মুসলমানদের যদি বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে তাড়ানো হয়, তাহলে কারা কোন মুসলমানের বাড়িঘর দখল করবে। ৪৬ বছরের এ কৃষক বলেন, ‘আসামে যখন এনআরসি চালু হলো, তখন থেকেই হিন্দুদের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল—কোন মুসলমানের বাড়ি কে নেবে। আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে নাগরিকত্ব প্রমাণে পুরোনো জমির কাগজ জোগাড় করা কঠিন হবে।’
স্বাভাবিক করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন
ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগ বিজেপিকে নতুন করে সীমাঞ্চলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়েছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নামের এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮ কোটি ভোটারের তালিকা সংশোধন করা হয়।
নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে খুব কম সময়ের মধ্যে একগাদা কাগজপত্র দিতে বলা হয়। সমালোচকেরা বলছেন, এটি ছিল সরকার সমর্থিত এক কৌশল, যাতে মুসলমান ও অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়। বিজেপি মরিয়া হয়ে এই রাজ্য জিততে চায়।
এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেবল প্রথম সাত দিনে কিষানগঞ্জ আবাসিক সনদের আবেদন বেড়ে গেছে ১০ গুণ। এর মানে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।’

গত ৩০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। এতে প্রায় ৮ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত কিষানগঞ্জ—যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মুসলিম—দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ নাম কাটা গেছে। পুরো সীমাঞ্চল অঞ্চলে বাদ পড়েছে গড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিষ্ঠাতা লালু প্রসাদ যাদবের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে।
রোববার ও সোমবার টানা দুদিনের সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়—এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কতজন ‘বিদেশি ভোটার’ শনাক্ত হয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন? তিনি বলেন, ‘নাম বাদ দেওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—অনেকেই মারা গেছেন, কেউ ভারতের নাগরিক নন, কারও নাম একাধিকবার উঠেছে, আবার অনেকে বিহার ছেড়ে চলে গেছেন।’ পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি মনে করেন কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেছে, তাহলে অভিযোগ বা দাবি দাখিল করা যাবে।
কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আকবরের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। তিনি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি ভয় পাননি। কারণ, তাঁর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আছে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমাদের সব প্রমাণপত্র আছে। যাদের টার্গেট করা হয়, তারাই বরং সব সময় শক্ত প্রমাণপত্র গুছিয়ে রাখে।’
স্থানীয় শিক্ষাবিদ পুষ্পেন্দ্রর মতে, বিজেপি শেরশাহবাদি মুসলমানদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যা দিয়ে শুধু সীমাঞ্চল নয়, সারা বিহারে নির্বাচনী সুবিধা নিতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলে মুসলমান বেশি থাকায় সেখানে বিজেপির তেমন লাভ হবে না। তারা জানে, শেরশাহবাদি মুসলিমদের দোষারোপ করে আসলে সীমাঞ্চলের বাইরের হিন্দু ভোটারদের প্রভাবিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় বেশি আসন জিততে চাইছে বিজেপি।’
উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার রাজ্য বিহার
শেরশাহবাদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারণার সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে। কিষানগঞ্জ মুসলমানদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কিষানগঞ্জ এক দশক ধরে বেসরকারি স্কুল চালাচ্ছেন তাফহিম রহমান। তিনি বলেন, ‘আজকাল প্রায় কোনো হিন্দু পরিবার তাদের সন্তানকে মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে পাঠায় না।’
তাফহিম রহমান জানান, স্কুলটি যখন তিনি শুরু করেছিলেন, শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল হিন্দু। এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ শতাংশে। তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি অনেক সচ্ছল মুসলিম পরিবারও তাদের সন্তানকে এসব স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই নীরব বিচ্ছিন্নতা আসলে ভয়ংকর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এটা দেখাচ্ছে, নির্বাচনী রাজনীতি কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে স্বাভাবিক করে তুলছে।’
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতেও। কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আজাদ আলম একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক। তিনি বলেন, ‘হিন্দু রোগীরা মুসলিম-পরিচালিত হাসপাতাল, বিশেষ করে শেরশাহবাদিদের হাসপাতাল যেতে সংকোচ বোধ করেন। এমনকি চিকিৎসকদের সহায়তার দরকার হলে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনগুলোও মুসলিম চিকিৎসকদের পাশে খুব কমই দাঁড়ায়।’
তবে সীমাঞ্চল অঞ্চলে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অনেক হিন্দুই বলেছেন, তারা ধর্মভিত্তিক বিভাজনে বিশ্বাস করেন না। ৪৯ বছরের ধোপা অজয় কুমার চৌধুরী বলেন, ‘কিষানগঞ্জ যদি কোনো হিন্দু মনে করে যে মুসলিম ডাক্তার বা মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে যাওয়া উচিত নয়, সেটা ভুল।’
তাঁর ভাষায়, ‘কিষানগঞ্জ মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা; মুসলমান ছাড়া হিন্দু ব্যবসা টিকতে পারবে না। আমার ৯০ শতাংশ ক্রেতাই মুসলমান। আর আমি যদি চিকিৎসকের কাছে যাই, আগে দেখি তিনি ভালো ডাক্তার কিনা, তার ধর্ম নয়।’
কিন্তু কাটিহারের ৬২ বছর বয়সী আইনজীবী অমরিন্দর বাঘি—যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত—ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘অবৈধ মুসলিমরা দেশে ঢুকেছে, সরকারকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বাঘি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি অবৈধভাবে কোনো দেশে প্রবেশ করে, সেটা সরকারের পূর্ণ দায়িত্ব। যেমন কেউ যদি আমার ঘরে ঢোকে, এর মানে হয় আমি দুর্বল এবং পরাস্ত, নয়তো আমি শক্তিশালী কিন্তু ঘুমিয়ে আছি।’
এমন মেরুকৃত পরিবেশ মুসলিম সম্প্রদায়কে হতাশ করছে বলে মনে করেন বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আদিল হোসেন। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলের মূল সমস্যা উন্নয়ন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এটাকে নিরাপত্তা ইস্যু বানানো হচ্ছে, অবৈধ অনুপ্রবেশের ভূত দেখিয়ে। এতে মানুষ উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। নাগরিক হিসেবে নিজেদের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে এটা সবচেয়ে বড় অন্তরায়।’
আজাদ আলম চিন্তিত বিজেপির মুসলিমবিরোধী প্রচারণা নিয়ে। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার রাজনীতিকেরা শেরশাহবাদি মুসলমানদের নিয়ে মন্তব্য করলে আমাদের ব্যাখ্যা দিতে হয় যে, আমরা অনুপ্রবেশকারী নই। আমাদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শেরশাহবাদি মুসলমান হিসেবে ওই সব মন্তব্য মাথায় ঘুরপাক খায়। যেন কোনো অসুখ... যেন এক অদৃশ্য ভূত।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

এক দশকেরও বেশি আগে, যখন মুখতার আলম কিষানগঞ্জের সরকারি স্কুলে পড়তেন, তখন তাঁর বন্ধুদের বেশির ভাগই ছিল হিন্দু। কিষানগঞ্জ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যের একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা। মুখতারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিল এক হিন্দু বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে পড়াশোনা করতেন, স্কুলের প্রজেক্ট করতেন। মুখতার তাঁর বন্ধুর খেয়াল রাখতেন। একসঙ্গে খাওয়ার সময় তিনি মাংস খেতেন না, কারণ তাঁর বন্ধু ছিলেন নিরামিষাশী।
কিন্তু দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার পর সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। এখনো সেই সম্পর্ক জোড়া লাগেনি। ঘটনাটা ঘটে জিতনরাম মাঞ্জির এক বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জোটসঙ্গী। কিষানগঞ্জ এক সমাবেশে মাঞ্জি মুসলিম শেরশাহবাদি সম্প্রদায়কে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেন। বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী, যেখানে ৯১ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম এবং প্রধান ভাষা বাংলা।

শেরশাহবাদি নামটি এসেছে ঐতিহাসিক শেরশাহবাদ অঞ্চল থেকে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত। আর ‘শেরশাহবাদ’ শব্দটির উৎপত্তি বলা হয় আফগান শাসক শেরশাহ সূরির নাম থেকে। তিনি শক্তিশালী মুঘলদের পরাজিত করে ষোড়শ শতকে অল্প সময়ের জন্য বিহার ও বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশসহ) শাসন করেছিলেন।
বিহারে হিন্দি ও উর্দু বেশ প্রচলিত। কিন্তু শেরশাহবাদি মুসলিমরা কথা বলেন বাংলার এক বিশেষ উপভাষায়, যেখানে উর্দু ও হিন্দির অনেক শব্দ মিশে আছে। তাঁদের অনেকে ‘বাদিয়া’ বা ‘ভাটিয়া’ নামেও পরিচিত। ভাটিয়া শব্দটি এসেছে স্থানীয় উপভাষার ‘ভাটো’ থেকে—যার অর্থ, নদীর স্রোতের বিপরীতে যাওয়া। ইতিহাস বলে, শেরশাহবাদিরা পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে গঙ্গার উজান বেয়ে এসে শেষ পর্যন্ত বিহারের সীমাঞ্চলে বসতি গড়েন। সীমাঞ্চলকে বলা হয় ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা।
মুখতার আলম বলেন, মাঞ্জির বক্তব্যের পর ‘আমরা হুমকির মুখে পড়েছি।’ মুখতার শেরশাহবাদি মুসলিম এবং ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক। চুপ না থেকে তিনি ফেসবুকে প্রতিবাদ করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর পোস্টের নিচে হিন্দিতে এক মন্তব্য ভেসে ওঠে—‘তোরা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।’ আর সেই মন্তব্যটি করেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তিনি বলেন, ‘ওই মন্তব্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর কেঁপে ওঠে।’
মুখতার সীমাঞ্চল এলাকায় একটি প্রাথমিক স্কুল চালান। সেই স্কুলের খড়ের ছাউনির তলায় বসে আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সেই মন্তব্য আমাদের সম্পর্ক ভেঙে দেয়। আমাদের মধ্যকার বিশ্বাস–আস্থা হারিয়ে যায়। ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব—সব শেষ হয়ে যায়।’
বিহার রাজ্য সরকারের প্রকাশিত ২০২৩ সালের জাতিভিত্তিক শুমারির তথ্য বলছে, বিহারে শেরশাহবাদি মুসলিমের সংখ্যা ১৩ লাখ। এঁদের বেশির ভাগ থাকেন—কিষানগঞ্জ ও কাটিহার জেলায়।

ভারতের তৃতীয় জনবহুল রাজ্য বিহার এখন গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আর এই প্রেক্ষাপটেই কিষানগঞ্জ ও কাটিহারকে কেন্দ্র করে বিজেপি জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটির অভিযোগ, এখানে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা’ বসবাস করছে।
শেরশাহাবাদি মুসলিমরাই টার্গেট কেন
গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না। বিশ্বের কোনো দেশ তা করে না—তাহলে ভারত কীভাবে তা মেনে নেবে?’
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা কারা। তাঁর দাবি, এই মিশনের মাধ্যমে দেশকে ঘিরে থাকা ‘গুরুতর সংকট’ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধান করা হবে। এখনো সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করে। এদের প্রধানত বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে টার্গেট করা হয়। আসামে বিজেপি ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায়। সেখানকার সরকার বহুদিন ধরে বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা নাকি রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য পাল্টে দিতে চাইছে।
আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে মুসলিমের হার এত বেশি নয়। শুধু কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীর ও আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপে এর চেয়ে বেশি মুসলিম বাস করেন। বিহারের মুসলিম জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ (২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী)। এই মুসলিমদের প্রায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ বসবাস করেন সীমাঞ্চল এলাকায়। এখানে কিষানগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পূর্ণিয়া জেলা রয়েছে। কিষানগঞ্জ, কাটিহার ও পূর্ণিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। আর সীমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত কয়েক কিলোমিটার দূরে।
আগামী ৬ ও ১১ নভেম্বর দুই দফায় বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হবে। ফল ঘোষণা করা হবে ১৪ নভেম্বর। বিজেপি কখনোই বিহারে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। গত ২০ বছরের বেশির ভাগ সময়ই আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, এবার বিজেপি ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু সামনে এনে সীমাঞ্চলের ভোটারদের ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।
গত দুই বছরে স্থানীয় মুসলিমদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। কারণ, এখন স্বয়ং মোদি এই প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছর ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে মোদি বলেছিলেন, ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা লোকেরা পূর্ণিয়া ও সীমাঞ্চলকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। এতে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।’
এ বছর বিহারের বিভিন্ন জেলার নির্বাচনী জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক এক সমাবেশে মোদি বলেন, ‘আজ সীমাঞ্চলসহ পূর্ব ভারতের বহু জায়গায় অনুপ্রবেশকারীদের কারণে ভয়াবহ জনসংখ্যাগত সংকট তৈরি হয়েছে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে দেশ থেকে তাড়ানো হবে।’ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এ অভিযান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
‘দানব/অসুর এসেছে বাংলাদেশ থেকে’
ভারতের বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে সম্প্রতি কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও রাজধানী দিল্লি থেকে শত শত বাংলাভাষী মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছে। অথচ তাঁদের অনেকের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র ছিল। সমালোচকেরা বলছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য মুসলিমদের টার্গেট করা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে বিজেপির আসাম শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করে। ‘আসাম উইদআউট বিজেপি’—শিরোনামের ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত ৯০ শতাংশে পৌঁছে যাবে এবং তারা চা বাগান, বিমানবন্দর, স্টেডিয়ামের মতো সব জনসমাগমস্থল দখল করে নেবে। ভিডিওতে দেখানো হয়, মুসলিমরা কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে অবৈধভাবে প্রবেশ করবে এবং গরুর মাংস খাওয়া বৈধ করবে। উল্লেখ্য, ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি বা খাওয়া নিষিদ্ধ, আর উচ্চবর্ণের অনেক হিন্দুই নিরামিষাশী।
তবে সীমাঞ্চলের মুসলিমদের কাছে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীর’ এই বুলি নতুন নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা অনেক বেশি এবং ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ কাছেই হওয়ায় এই অভিযোগকে ঘিরে রাজনীতি হয়। সীমাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিজেপি বহু বছর ধরে এ অঞ্চলকে ‘হিন্দুত্ববাদের ল্যাবরেটরি’ বানানোর চেষ্টা করছে। এই শব্দটি বেশি ব্যবহার হয় গুজরাটকে বোঝাতে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি ২০০১ সালের ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মাত্র দুই মাসের মাথায় ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মুসলিম নিহত হয়েছিলেন।
সীমাঞ্চলের এক বাসিন্দা মুখতার আলম বলেন, ‘যখনই কোনো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকে এখানে দেখি, আমরা আতঙ্কে থাকি তিনি আমাদের নিয়ে কী মন্তব্য করবেন এবং তার প্রভাব কী হবে।’ গত মাসে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী ও বিহারের বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক দানব এসেছে, আমাদের সেই দানবদের মারতে হবে।’
এর আগেও গত বছরের অক্টোবরে গিরিরাজ সিং সীমাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী ভাগলপুর জেলায় একটি ‘হিন্দু প্রাইড মার্চ’ আয়োজন করেছিলেন। ওই এলাকায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম বাস করেন। সমাবেশে তিনি বারবার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কথা বলেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ‘লাভ জিহাদ’–এর মতো ইস্যু তোলেন। ‘লাভ জিহাদ’—হলো হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীর প্রচারিত একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যেখানে বলা হয়—মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের প্রেম বা বিয়েতে প্রলুব্ধ করে ধর্মান্তরিত করছে।
গত বছরের কিষানগঞ্জের সমাবেশে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই বাদিয়া (শেরশাহবাদি), অনুপ্রবেশকারী আর মুসলিমরা যদি আমাদের একবার থাপ্পড় মারে, আমরা একসঙ্গে হয়ে তাদের হাজারবার থাপ্পড় মারব।’ তাঁর এই মন্তব্যে ভিড় উল্লাসে ফেটে পড়ে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিজেপির বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর বলেন, তাঁর দলের সীমাঞ্চলের শেরশাহবাদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। তিনি দাবি করেন, ‘এটা কোনো ভোট বা মেরুকরণের বিষয় নয়। সীমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে অনুপ্রবেশের কারণে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ না হয়, ২০–২৫ বছরের মধ্যে সীমাঞ্চল বাংলাদেশে পরিণত হবে।’
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সাবেক অধ্যাপক পুষ্পেন্দ্র মনে করেন, বিজেপির এই মেরুকরণের কৌশল সীমাঞ্চলে তেমন কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, ‘বিজেপি ঝাড়খণ্ডের ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর ইস্যু তুলেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি, কারণ অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না। একই ঘটনা বিহারেও ঘটবে। কারণ সীমাঞ্চলে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ আদৌ নেই। আর কীভাবে হবে? সীমাঞ্চলের সঙ্গে তো বাংলাদেশের সীমান্তই নেই।’
দশক পুরোনো প্রচারণা
ভারতের বিহারের সীমাঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করার প্রচার নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক আগে আসাম থেকে শুরু হয়েছিল এ প্রচার। সত্তরের দশকের শেষ দিকে আসামের এক ছাত্র সংগঠন রাস্তায় নেমে বাংলাভাষী মুসলমানদের বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এর ফলেই হাজারো মুসলমান হয় দেশ থেকে বিতাড়িত, নয়তো ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ ঘোষিত হয়। এতে তাঁদের আইনি অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়ে যান তাঁরা।
আসাম থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন দ্রুত বিহারেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিষয়টি প্রথম সামনে আনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। এটি চরম ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্র সংগঠন। ১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া আরএসএস শুরুর দিকে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট দলগুলো থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছিল। বিজেপির আদর্শিক পথপ্রদর্শক সংগঠনটি ভারতের সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে বদলে জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। সারা ভারতে তাদের হাজারো শাখা আছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির শীর্ষ নেতারাও এই সংগঠনের আজীবন সদস্য।
আশির দশকের শুরুতে এবিভিপি দাবি করে, সীমাঞ্চলে ২০ হাজার বাংলাদেশি আছে, যারা স্থানীয় ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে। এরপর আসামের মতো ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দাবি তোলে তারা। ১৯৮৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবিভিপির দাবি মেনে নেয়। প্রায় ৬ হাজার মুসলমানকে নাগরিকত্ব প্রমাণের নোটিশ পাঠায় কমিশন। তাঁদের সবাই শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের সদস্য।
সেই সময় তরুণ মুসলিম অধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এবিভিপির এ প্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম সংগঠক। এখন তিনি সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ। তিনি বলেন, ‘তাদের জমির কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল। আমরা ক্যাম্প বসিয়ে কাগজ সংগ্রহ করি। পরে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজ্যের রাজধানী পাটনায় যাই।’ তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত কাউকেই নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘পুরো ঘটনাই এবিভিপির সাজানো নাটক ছিল।’
কিন্তু সেই পুরোনো প্রচারণা ফের জোরদার হয়েছে সীমাঞ্চলে। একাধিক বিজেপি নেতা আসাম মডেলের মতো সীমাঞ্চলেও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) চালুর দাবি তুলছেন। এনআরসি হলো—ভারতের সব নাগরিকের একটি তালিকা, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করা।
সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিক তালিকার বাইরে রেখে দেওয়া হয়। তাঁদের ‘অন্য দেশের নাগরিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়। মোদি সরকার বারবার জানিয়েছে, সারা দেশেই এনআরসি চালু করা হবে।
২০২৩ সালে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে বলেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর কারণে কাটিহার, কিষানগঞ্জ, আরারিয়া, পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের জনসংখ্যার চিত্রই বদলে গেছে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, এনআরসি কার্যকর করে সব বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে দিতে হবে।’
কাটিহারের শেরশাহবাদি অধ্যুষিত জাংলা তাল গ্রামের বাসিন্দা আকবর ইমাম বলেন, তাঁদের গ্রামে হিন্দুদের মধ্যে আগেই আলোচনা চলছে, মুসলমানদের যদি বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে তাড়ানো হয়, তাহলে কারা কোন মুসলমানের বাড়িঘর দখল করবে। ৪৬ বছরের এ কৃষক বলেন, ‘আসামে যখন এনআরসি চালু হলো, তখন থেকেই হিন্দুদের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল—কোন মুসলমানের বাড়ি কে নেবে। আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে নাগরিকত্ব প্রমাণে পুরোনো জমির কাগজ জোগাড় করা কঠিন হবে।’
স্বাভাবিক করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন
ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগ বিজেপিকে নতুন করে সীমাঞ্চলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়েছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নামের এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮ কোটি ভোটারের তালিকা সংশোধন করা হয়।
নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে খুব কম সময়ের মধ্যে একগাদা কাগজপত্র দিতে বলা হয়। সমালোচকেরা বলছেন, এটি ছিল সরকার সমর্থিত এক কৌশল, যাতে মুসলমান ও অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়। বিজেপি মরিয়া হয়ে এই রাজ্য জিততে চায়।
এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেবল প্রথম সাত দিনে কিষানগঞ্জ আবাসিক সনদের আবেদন বেড়ে গেছে ১০ গুণ। এর মানে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।’

গত ৩০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। এতে প্রায় ৮ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত কিষানগঞ্জ—যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মুসলিম—দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭ শতাংশ নাম কাটা গেছে। পুরো সীমাঞ্চল অঞ্চলে বাদ পড়েছে গড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিষ্ঠাতা লালু প্রসাদ যাদবের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে।
রোববার ও সোমবার টানা দুদিনের সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়—এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কতজন ‘বিদেশি ভোটার’ শনাক্ত হয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন? তিনি বলেন, ‘নাম বাদ দেওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—অনেকেই মারা গেছেন, কেউ ভারতের নাগরিক নন, কারও নাম একাধিকবার উঠেছে, আবার অনেকে বিহার ছেড়ে চলে গেছেন।’ পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি মনে করেন কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেছে, তাহলে অভিযোগ বা দাবি দাখিল করা যাবে।
কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আকবরের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। তিনি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি ভয় পাননি। কারণ, তাঁর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আছে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমাদের সব প্রমাণপত্র আছে। যাদের টার্গেট করা হয়, তারাই বরং সব সময় শক্ত প্রমাণপত্র গুছিয়ে রাখে।’
স্থানীয় শিক্ষাবিদ পুষ্পেন্দ্রর মতে, বিজেপি শেরশাহবাদি মুসলমানদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যা দিয়ে শুধু সীমাঞ্চল নয়, সারা বিহারে নির্বাচনী সুবিধা নিতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলে মুসলমান বেশি থাকায় সেখানে বিজেপির তেমন লাভ হবে না। তারা জানে, শেরশাহবাদি মুসলিমদের দোষারোপ করে আসলে সীমাঞ্চলের বাইরের হিন্দু ভোটারদের প্রভাবিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় বেশি আসন জিততে চাইছে বিজেপি।’
উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার রাজ্য বিহার
শেরশাহবাদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারণার সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে। কিষানগঞ্জ মুসলমানদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কিষানগঞ্জ এক দশক ধরে বেসরকারি স্কুল চালাচ্ছেন তাফহিম রহমান। তিনি বলেন, ‘আজকাল প্রায় কোনো হিন্দু পরিবার তাদের সন্তানকে মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে পাঠায় না।’
তাফহিম রহমান জানান, স্কুলটি যখন তিনি শুরু করেছিলেন, শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল হিন্দু। এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ শতাংশে। তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি অনেক সচ্ছল মুসলিম পরিবারও তাদের সন্তানকে এসব স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই নীরব বিচ্ছিন্নতা আসলে ভয়ংকর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এটা দেখাচ্ছে, নির্বাচনী রাজনীতি কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে স্বাভাবিক করে তুলছে।’
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতেও। কিষানগঞ্জের শেরশাহবাদি মুসলিম আজাদ আলম একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক। তিনি বলেন, ‘হিন্দু রোগীরা মুসলিম-পরিচালিত হাসপাতাল, বিশেষ করে শেরশাহবাদিদের হাসপাতাল যেতে সংকোচ বোধ করেন। এমনকি চিকিৎসকদের সহায়তার দরকার হলে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনগুলোও মুসলিম চিকিৎসকদের পাশে খুব কমই দাঁড়ায়।’
তবে সীমাঞ্চল অঞ্চলে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অনেক হিন্দুই বলেছেন, তারা ধর্মভিত্তিক বিভাজনে বিশ্বাস করেন না। ৪৯ বছরের ধোপা অজয় কুমার চৌধুরী বলেন, ‘কিষানগঞ্জ যদি কোনো হিন্দু মনে করে যে মুসলিম ডাক্তার বা মুসলিম-পরিচালিত স্কুলে যাওয়া উচিত নয়, সেটা ভুল।’
তাঁর ভাষায়, ‘কিষানগঞ্জ মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা; মুসলমান ছাড়া হিন্দু ব্যবসা টিকতে পারবে না। আমার ৯০ শতাংশ ক্রেতাই মুসলমান। আর আমি যদি চিকিৎসকের কাছে যাই, আগে দেখি তিনি ভালো ডাক্তার কিনা, তার ধর্ম নয়।’
কিন্তু কাটিহারের ৬২ বছর বয়সী আইনজীবী অমরিন্দর বাঘি—যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত—ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘অবৈধ মুসলিমরা দেশে ঢুকেছে, সরকারকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বাঘি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি অবৈধভাবে কোনো দেশে প্রবেশ করে, সেটা সরকারের পূর্ণ দায়িত্ব। যেমন কেউ যদি আমার ঘরে ঢোকে, এর মানে হয় আমি দুর্বল এবং পরাস্ত, নয়তো আমি শক্তিশালী কিন্তু ঘুমিয়ে আছি।’
এমন মেরুকৃত পরিবেশ মুসলিম সম্প্রদায়কে হতাশ করছে বলে মনে করেন বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আদিল হোসেন। তিনি বলেন, ‘সীমাঞ্চলের মূল সমস্যা উন্নয়ন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এটাকে নিরাপত্তা ইস্যু বানানো হচ্ছে, অবৈধ অনুপ্রবেশের ভূত দেখিয়ে। এতে মানুষ উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। নাগরিক হিসেবে নিজেদের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে এটা সবচেয়ে বড় অন্তরায়।’
আজাদ আলম চিন্তিত বিজেপির মুসলিমবিরোধী প্রচারণা নিয়ে। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার রাজনীতিকেরা শেরশাহবাদি মুসলমানদের নিয়ে মন্তব্য করলে আমাদের ব্যাখ্যা দিতে হয় যে, আমরা অনুপ্রবেশকারী নই। আমাদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শেরশাহবাদি মুসলমান হিসেবে ওই সব মন্তব্য মাথায় ঘুরপাক খায়। যেন কোনো অসুখ... যেন এক অদৃশ্য ভূত।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

২১ নভেম্বর দুবাই এয়ার শোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান (এলসিএ) তেজস এমকে-১-এর দুর্ঘটনার পর থেকেই এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড...
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর ভারত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
তাঁদের নামোল্লেখ ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সংক্রান্ত বোঝাপড়ার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। দুজনের নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে সমান গুরুত্ব দে
১ দিন আগে
কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা।
২ দিন আগেআজকের পত্রিকা ডেস্ক

২১ নভেম্বর দুবাই এয়ার শোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান (এলসিএ) তেজস এমকে-১-এর দুর্ঘটনার পর থেকেই এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (এইচএএল) নির্মিত এই যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নিয়ে দেশীয় সরকারি নিরীক্ষা সংস্থাগুলোর তোলা প্রশ্নগুলো নতুন করে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।
দুবাইয়ে বিমান দুর্ঘটনায় পাইলট উইং কমান্ডার নামাংশ শিয়াল-এর মৃত্যু হয়। দুবাই, প্যারিস এবং ফার্নবরোর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এয়ার শোতে এই দুর্ঘটনা তেজসের সুনাম এবং রপ্তানির সম্ভাবনাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ তেজস কেনার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল বলে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা নীরব হয়ে গেছে। তারা বিকল্প খুঁজছে বলেও খবর এসেছে। এমনিতেই এইচএএল রপ্তানি আকর্ষণ করতে হিমশিম খাচ্ছিল; তার মধ্যে এই দুর্ঘটনায় সব সম্ভাবনা ফিকে হয়ে গেল।
তেজস কর্মসূচি, ১৯৮১ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) পুরোনো সোভিয়েত যুগের মিগ-২১ বিমান প্রতিস্থাপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হয়েছিল। তবে দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে যায়। বিমানটি তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর ধারাবাহিক উৎপাদন ও গুণমান নিয়ে প্রশ্ন ছিল পুরোনো। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্ঘটনার পর এখন এই দীর্ঘদিনের ত্রুটিগুলো আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে।
তদন্তে সামনে এসেছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো দশকের পর দশক ধরে তেজস কর্মসূচির একাধিক ত্রুটি নিয়ে যে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল, এই দুর্ঘটনা সেসব উদ্বেগকে নাটকীয়ভাবে জনসমক্ষে এনেছে। এইচএএল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই ত্রুটিগুলোকে এত দিন অভ্যন্তরীণ, সামাল দেওয়ার মতো সমস্যা হিসেবে গণ্য করলেও এখন সেগুলো আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। একজন সাবেক এইচএএল কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, প্রথম প্রজন্মের, যুদ্ধে পরীক্ষিত নয়—এমন একটি বিমানের এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা, সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দুর্বলতা সব মিলিয়ে যে ভাবমূর্তি তৈরি হলো, তা ‘গুরুতর এবং সম্ভবত পুনরুদ্ধার করা কঠিন’।
সংসদীয় প্রতিরক্ষা কমিটি, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসি) এবং কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) মতো সংস্থাগুলো এলসিএর নকশা, উন্নয়ন থেকে শুরু করে ধারাবাহিক উৎপাদন পর্যন্ত এর সমস্যাসংকুল পথ নিয়ে নিয়মিতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের সিএজি নিরীক্ষায় তেজসের ‘নকশায় গুরুতর ত্রুটি’ এবং ‘প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট (ধাক্কা) সম্পর্কে ভুল মূল্যায়ন’ তুলে ধরা হয়। ২০২১ সালের পিএসি কমিটি সামগ্রিকভাবে এলসিএ কর্মসূচির ‘ব্যাখ্যাহীন বিলম্ব’-এর জন্য তীব্র সমালোচনা করে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই প্রকল্পের তদারকি সংস্থাগুলোর ‘বিশৃঙ্খল মনোভাব’ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের সমালোচনাও করা হয়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এইচএএল, ভারতীয় বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে একটি ডেডিকেটেড এলসিএ লিয়াজোঁ গ্রুপের অনুপস্থিতির কারণে এমকে-১-এর সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়নি। লিয়াজোঁ গ্রুপ বা পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠনের জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।
এইচএএলের এই দুর্বলতার প্রমাণ মেলে এলসিএর অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্সেও। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বিমানবাহিনীর প্রথম তেজস এমকে-১ স্কোয়াড্রন—নম্বর ৪৫ ফ্লাইং ড্যাগার্স—গঠন করা হয়েছিল পাঁচ বছর দেরিতে। এই ১৮টি বিমান ‘প্রাথমিক অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স-২’ (আইওসি-২ )সহ কমিশন করা হয়েছিল। বোঝা যায়, এই প্রকল্পের উন্নয়ন ও সার্টিফিকেশনের বেশ চাপ ছিল। স্থানীয়ভাবে এটিকে ৫৩টি সনদে ‘ওয়েভার’ বা ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এর মধ্যে আবার ২০টি ছাড়পত্র স্থায়ী।
যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে আইওসি মানে বিমানটি উড্ডয়নের জন্য নিরাপদ হলেও তার যুদ্ধ সক্ষমতা সীমিত। অন্যদিকে ফাইনাল অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স (এফওসি) দিয়ে বোঝানো হয় বিমানটির সম্পূর্ণ মিশন প্রস্তুতি, পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সংযোজন এবং কার্যকারিতার মান নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু দ্বিতীয় এমকে-১ স্কোয়াড্রন (নম্বর ১৮ ফ্লাইং বুলেটস) এফওসি মানসম্পন্ন বিমান পেয়েছিল।
দুবাই দুর্ঘটনার আগে ২০২৪ সালের মার্চে জয়সালমিরে যে তেজস বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে ‘তেল ব্যবস্থার ত্রুটি, যার ফলে ইঞ্জিন বিকল’—অর্থাৎ একটি উৎপাদনজনিত ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল। এই ধরনের দুর্ঘটনা উৎপাদন মান এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণে এইচএএলের দুর্বলতাকে বারবার সামনে এনেছে।
দীর্ঘদিন ধরে এইচএএলের উৎপাদন গতি নিয়ে বিমানবাহিনী অসন্তুষ্ট। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং প্রকাশ্যে এইচএএলের ধীরগতির সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তিনি এইচএএলের ওপর ‘আস্থাশীল নন’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি মূলত দুটি সংস্থার ‘ভিন্ন ভাষায় কথা বলার’ মধ্যেই নিহিত: বিমানবাহিনী কাজ করে অপারেশনাল মোডে—যা মিশন প্রস্তুতি, সময়সীমা এবং ফ্লাইট নিরাপত্তার মতো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর এইচএএল চলে ‘ফাইল মোডে’, অর্থাৎ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কাগজপত্রের টেবিল পরিবর্তনে সময়ক্ষেপণ হয়। এই সাংস্কৃতিক অমিল বারবার সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটিয়েছে এবং জরুরি অপারেশনাল উদ্বেগগুলোকে দ্রুত মোকাবিলা করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়াও এইচএএলের বৃহত্তম গ্রাহক হওয়া সত্ত্বেও তাদের বোর্ডে বিমানবাহিনীর স্থায়ী কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে সংস্থাটির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি অপারেশনাল মতামত দেওয়ার মতো কোনো প্রতিনিধি এইচএএল পায়নি।
দুবাইয়ের দুর্ঘটনা এইচএএলের ২০০৮-০৯ সালের প্রথম রপ্তানি উদ্যোগের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় ইকুয়েডরের বিমানবাহিনীর কাছে বিক্রি করা সাতটি ধ্রুব অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টারের মধ্যে চারটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, যার ফলে ২০১৫ সালে চুক্তি বাতিল হয়। ইকুয়েডর অভিযোগ করেছিল, বিক্রয়-পরবর্তী সহায়তার অভাব এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি ছিল দুর্ঘটনার কারণ। এই ঘটনা বিশ্ব সামরিক বিমান শিল্প মহলে এইচএএলের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং গ্রাহক প্রতিক্রিয়ায় ঘাটতিই তুলে ধরে।
দুবাইয়ের এই দুর্ঘটনা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার প্রতিবেদনগুলো এইচএএলের বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে ফেলেছে। ভারতের প্রথম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তেজসের বিষয়ে সম্ভাব্য ক্রেতারা এখন কেবল মুখের কথায় ভরসা রাখতে পারবে না। ভারতকে তার সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে।

২১ নভেম্বর দুবাই এয়ার শোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান (এলসিএ) তেজস এমকে-১-এর দুর্ঘটনার পর থেকেই এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (এইচএএল) নির্মিত এই যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নিয়ে দেশীয় সরকারি নিরীক্ষা সংস্থাগুলোর তোলা প্রশ্নগুলো নতুন করে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।
দুবাইয়ে বিমান দুর্ঘটনায় পাইলট উইং কমান্ডার নামাংশ শিয়াল-এর মৃত্যু হয়। দুবাই, প্যারিস এবং ফার্নবরোর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এয়ার শোতে এই দুর্ঘটনা তেজসের সুনাম এবং রপ্তানির সম্ভাবনাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ তেজস কেনার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল বলে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা নীরব হয়ে গেছে। তারা বিকল্প খুঁজছে বলেও খবর এসেছে। এমনিতেই এইচএএল রপ্তানি আকর্ষণ করতে হিমশিম খাচ্ছিল; তার মধ্যে এই দুর্ঘটনায় সব সম্ভাবনা ফিকে হয়ে গেল।
তেজস কর্মসূচি, ১৯৮১ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) পুরোনো সোভিয়েত যুগের মিগ-২১ বিমান প্রতিস্থাপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হয়েছিল। তবে দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে যায়। বিমানটি তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর ধারাবাহিক উৎপাদন ও গুণমান নিয়ে প্রশ্ন ছিল পুরোনো। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্ঘটনার পর এখন এই দীর্ঘদিনের ত্রুটিগুলো আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে।
তদন্তে সামনে এসেছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো দশকের পর দশক ধরে তেজস কর্মসূচির একাধিক ত্রুটি নিয়ে যে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল, এই দুর্ঘটনা সেসব উদ্বেগকে নাটকীয়ভাবে জনসমক্ষে এনেছে। এইচএএল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই ত্রুটিগুলোকে এত দিন অভ্যন্তরীণ, সামাল দেওয়ার মতো সমস্যা হিসেবে গণ্য করলেও এখন সেগুলো আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। একজন সাবেক এইচএএল কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, প্রথম প্রজন্মের, যুদ্ধে পরীক্ষিত নয়—এমন একটি বিমানের এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা, সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দুর্বলতা সব মিলিয়ে যে ভাবমূর্তি তৈরি হলো, তা ‘গুরুতর এবং সম্ভবত পুনরুদ্ধার করা কঠিন’।
সংসদীয় প্রতিরক্ষা কমিটি, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসি) এবং কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) মতো সংস্থাগুলো এলসিএর নকশা, উন্নয়ন থেকে শুরু করে ধারাবাহিক উৎপাদন পর্যন্ত এর সমস্যাসংকুল পথ নিয়ে নিয়মিতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের সিএজি নিরীক্ষায় তেজসের ‘নকশায় গুরুতর ত্রুটি’ এবং ‘প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট (ধাক্কা) সম্পর্কে ভুল মূল্যায়ন’ তুলে ধরা হয়। ২০২১ সালের পিএসি কমিটি সামগ্রিকভাবে এলসিএ কর্মসূচির ‘ব্যাখ্যাহীন বিলম্ব’-এর জন্য তীব্র সমালোচনা করে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই প্রকল্পের তদারকি সংস্থাগুলোর ‘বিশৃঙ্খল মনোভাব’ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের সমালোচনাও করা হয়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এইচএএল, ভারতীয় বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে একটি ডেডিকেটেড এলসিএ লিয়াজোঁ গ্রুপের অনুপস্থিতির কারণে এমকে-১-এর সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়নি। লিয়াজোঁ গ্রুপ বা পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠনের জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।
এইচএএলের এই দুর্বলতার প্রমাণ মেলে এলসিএর অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্সেও। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বিমানবাহিনীর প্রথম তেজস এমকে-১ স্কোয়াড্রন—নম্বর ৪৫ ফ্লাইং ড্যাগার্স—গঠন করা হয়েছিল পাঁচ বছর দেরিতে। এই ১৮টি বিমান ‘প্রাথমিক অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স-২’ (আইওসি-২ )সহ কমিশন করা হয়েছিল। বোঝা যায়, এই প্রকল্পের উন্নয়ন ও সার্টিফিকেশনের বেশ চাপ ছিল। স্থানীয়ভাবে এটিকে ৫৩টি সনদে ‘ওয়েভার’ বা ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এর মধ্যে আবার ২০টি ছাড়পত্র স্থায়ী।
যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে আইওসি মানে বিমানটি উড্ডয়নের জন্য নিরাপদ হলেও তার যুদ্ধ সক্ষমতা সীমিত। অন্যদিকে ফাইনাল অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স (এফওসি) দিয়ে বোঝানো হয় বিমানটির সম্পূর্ণ মিশন প্রস্তুতি, পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সংযোজন এবং কার্যকারিতার মান নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু দ্বিতীয় এমকে-১ স্কোয়াড্রন (নম্বর ১৮ ফ্লাইং বুলেটস) এফওসি মানসম্পন্ন বিমান পেয়েছিল।
দুবাই দুর্ঘটনার আগে ২০২৪ সালের মার্চে জয়সালমিরে যে তেজস বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে ‘তেল ব্যবস্থার ত্রুটি, যার ফলে ইঞ্জিন বিকল’—অর্থাৎ একটি উৎপাদনজনিত ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল। এই ধরনের দুর্ঘটনা উৎপাদন মান এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণে এইচএএলের দুর্বলতাকে বারবার সামনে এনেছে।
দীর্ঘদিন ধরে এইচএএলের উৎপাদন গতি নিয়ে বিমানবাহিনী অসন্তুষ্ট। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং প্রকাশ্যে এইচএএলের ধীরগতির সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তিনি এইচএএলের ওপর ‘আস্থাশীল নন’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি মূলত দুটি সংস্থার ‘ভিন্ন ভাষায় কথা বলার’ মধ্যেই নিহিত: বিমানবাহিনী কাজ করে অপারেশনাল মোডে—যা মিশন প্রস্তুতি, সময়সীমা এবং ফ্লাইট নিরাপত্তার মতো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর এইচএএল চলে ‘ফাইল মোডে’, অর্থাৎ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কাগজপত্রের টেবিল পরিবর্তনে সময়ক্ষেপণ হয়। এই সাংস্কৃতিক অমিল বারবার সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটিয়েছে এবং জরুরি অপারেশনাল উদ্বেগগুলোকে দ্রুত মোকাবিলা করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়াও এইচএএলের বৃহত্তম গ্রাহক হওয়া সত্ত্বেও তাদের বোর্ডে বিমানবাহিনীর স্থায়ী কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে সংস্থাটির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি অপারেশনাল মতামত দেওয়ার মতো কোনো প্রতিনিধি এইচএএল পায়নি।
দুবাইয়ের দুর্ঘটনা এইচএএলের ২০০৮-০৯ সালের প্রথম রপ্তানি উদ্যোগের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় ইকুয়েডরের বিমানবাহিনীর কাছে বিক্রি করা সাতটি ধ্রুব অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টারের মধ্যে চারটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, যার ফলে ২০১৫ সালে চুক্তি বাতিল হয়। ইকুয়েডর অভিযোগ করেছিল, বিক্রয়-পরবর্তী সহায়তার অভাব এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি ছিল দুর্ঘটনার কারণ। এই ঘটনা বিশ্ব সামরিক বিমান শিল্প মহলে এইচএএলের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং গ্রাহক প্রতিক্রিয়ায় ঘাটতিই তুলে ধরে।
দুবাইয়ের এই দুর্ঘটনা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার প্রতিবেদনগুলো এইচএএলের বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে ফেলেছে। ভারতের প্রথম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তেজসের বিষয়ে সম্ভাব্য ক্রেতারা এখন কেবল মুখের কথায় ভরসা রাখতে পারবে না। ভারতকে তার সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে।

গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না।
০৮ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর ভারত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
তাঁদের নামোল্লেখ ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সংক্রান্ত বোঝাপড়ার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। দুজনের নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে সমান গুরুত্ব দে
১ দিন আগে
কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা।
২ দিন আগেআজকের পত্রিকা ডেস্ক

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর ভারত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। এ নিয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছে ঢাকা। তবে দিল্লি এখনো কোনো পরিষ্কার অবস্থান জানায়নি।
সর্বশেষ গত বুধবার দিল্লি জানিয়েছে, তারা হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ‘পরীক্ষা’ করছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার ‘হিস্ট্রি ইলাস্ট্রেটেড’ নামে একটি ফটো স্টোরিতে শেখ হাসিনার বিগত ১৭ বছরের শাসনামলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করা শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থা এক কথায় জটিল। একসময় তিনি ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী নেতা, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। পরবর্তী সময় তিনি রূপ নেন একজন কর্তৃত্ববাদী নেতায়, যাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। সম্প্রতি তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য হাসিনাকে এ শাস্তি দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের অনেকেই মনে করেন, এই অপরাধে হাসিনার ফাঁসি হওয়া উচিত।










বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর ভারত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। এ নিয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছে ঢাকা। তবে দিল্লি এখনো কোনো পরিষ্কার অবস্থান জানায়নি।
সর্বশেষ গত বুধবার দিল্লি জানিয়েছে, তারা হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ‘পরীক্ষা’ করছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার ‘হিস্ট্রি ইলাস্ট্রেটেড’ নামে একটি ফটো স্টোরিতে শেখ হাসিনার বিগত ১৭ বছরের শাসনামলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করা শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থা এক কথায় জটিল। একসময় তিনি ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী নেতা, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। পরবর্তী সময় তিনি রূপ নেন একজন কর্তৃত্ববাদী নেতায়, যাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। সম্প্রতি তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য হাসিনাকে এ শাস্তি দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের অনেকেই মনে করেন, এই অপরাধে হাসিনার ফাঁসি হওয়া উচিত।










গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না।
০৮ অক্টোবর ২০২৫
২১ নভেম্বর দুবাই এয়ার শোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান (এলসিএ) তেজস এমকে-১-এর দুর্ঘটনার পর থেকেই এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড...
৪ ঘণ্টা আগে
তাঁদের নামোল্লেখ ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সংক্রান্ত বোঝাপড়ার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। দুজনের নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে সমান গুরুত্ব দে
১ দিন আগে
কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা।
২ দিন আগেআজকের পত্রিকা ডেস্ক

চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাজা যুদ্ধ বন্ধে ২০ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। প্রস্তাব উত্থাপনের মাঝে ট্রাম্প দুজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন, যারা এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। তাঁরা হলেন—পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
ওই অনুষ্ঠানে স্বল্প সময়ের জন্য নাম দুটি উচ্চারিত হয়েছিল, কিন্তু সেটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের নামোল্লেখ ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সংক্রান্ত বোঝাপড়ার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। দুজনের নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে সমান গুরুত্ব দেন। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শাহবাজ শরিফ সরকারপ্রধান হলেও প্রকৃত ক্ষমতা মুনিরের হাতেই বাঁধা।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান বারবার বেসামরিক ও সামরিক শাসনের দোলাচলে দুলেছে। দেশটিতে সর্বশেষ অভ্যুত্থান হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে (শাহবাজের বড় ভাই) ক্ষমতাচ্যুত করে তখতে আসীন হন। ২০০৮ সালে পাকিস্তান আবার বেসামরিক শাসনে ফেরে। এরপর কয়েক দফা বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে, সামরিক চাপের ভেতরেও তারা কিছু নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা পেয়েছিল, দেশীয় এজেন্ডার একটা অংশ ঠিক করতে পেরেছিল, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিল। সেই দিনগুলো এখন অতীত। চোখে পড়ার মতো কোনো অভ্যুত্থান ছাড়াই এখন দেশ চালাচ্ছে জেনারেলরা, আর বেসামরিক নেতৃত্ব শুধু বাহারি পোস্টার।
একে বলা যায় ‘মুনির মডেল’ নামে। গণতন্ত্রের আবরণে সামরিক নিয়ন্ত্রণ। ২০০৮ সালে সরাসরি সামরিক শাসন শেষ হওয়ার পর থেকে এটাই পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর সবচেয়ে তীক্ষ্ণ পুনর্গঠন। এই ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী আর আড়ালে থেকে সুতো টানে না, বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটিয়ে বা কখনো সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে শাসন করে। নীতি প্রণয়ন থেকে কূটনীতি, অর্থনীতির দিকনির্দেশনা—সবকিছুতেই তাদের হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট। নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা বিষয় তো তাদের ঐতিহ্যগত কর্তৃত্বের ক্ষেত্র হিসেবে আছেই।
ক্ষমতার এই সংহতি এখন শুধু অলিখিত প্রথায় সীমাবদ্ধ নেই, আইনেও গাঁথা হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেই পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধন করে মুনিরকে দেশের সব বাহিনীর শীর্ষে বসিয়েছে। তাঁকে দেওয়া হয়েছে আজীবন আইনি দায়মুক্তি আর নবায়নযোগ্য ৫ বছরের মেয়াদ। অর্থাৎ, সেনাপ্রধানের চারপাশে বিস্তৃত এক নতুন কমান্ড কাঠামো আইনগত রূপ পেয়েছ, আর তিনি চাইলে মোট ১০ বছর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকতে পারবেন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এ বছরের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন হাইব্রিড। সামরিক ও বেসামরিক সরকার ‘ক্ষমতার কাঠামোর যৌথ মালিক।’ কোনো লজ্জা ছাড়াই তিনি যোগ করেন, ‘এই হাইব্রিড ব্যবস্থাটা দারুণ কাজ করছে।’
সেনাপ্রধানের সমর্থকেরা অবশ্য বিগত এক বছরের ‘দারুণ কাজের’ ফিরিস্তি তুলে ধরবেন। মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান নতুন আইএমএফ ঋণ পেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ চালু হয়েছে, যেখান থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে। সামরিক নেতৃত্বে গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিল এখন বিদেশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার মূল রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্ম—বিশেষ করে জ্বালানি, কৃষি ও খনিজ খাতে।
সমর্থকদের মতে, এমন কেন্দ্রীভূত ও সামরিক-নির্ভর শাসন পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর এক ধরনের সামঞ্জস্য ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু, এখন যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কার্যত সেনাবাহিনীর হাতে, তখন সেনা কর্মকর্তাদেরও আর আড়ালে থাকার জায়গা নেই। দেশের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দায়ও এখন তাঁদের কাঁধেই পড়বে।
রাষ্ট্র গলঃধকরণ
২০২২ সালের এপ্রিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তখন প্রায় সবারই ধারণা ছিল, তাঁর পতনের নেপথ্যে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা আছে। এরপর শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা পুরোপুরি সামরিক সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বেসামরিক সরকারের পার্লামেন্টারি আবরণ ছিল, কিন্তু দেশের কঠিনতম কাজগুলো সামলাচ্ছিল সেনাবাহিনীই। ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, রাজনৈতিক অস্থিরতা দমন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নজরদারি, বিদেশনীতি পরিচালনা—সবই ছিল জেনারেলদের হাতে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই বাস্তবতাকেই আবারও পুনর্নিশ্চিত করে। নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞায় ইমরান খানের দল দলীয়ভাবে ভোটে দাঁড়াতে পারেনি; নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবেই অংশ নিতে হয়। তবু তারা সর্বাধিক আসন পায়, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়তে পারেনি। শাহবাজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ আবারও দুর্বল জোট সরকারের নেতৃত্বে ফিরে আসে। তারা পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করে। জাতীয় পরিষদের এই অঙ্ক তাদের বৈধতা দিতে পারে বটে, কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি ছিল সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, আদালত ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব, এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা—সবকিছু মিলিয়ে রাজনৈতিক মাঠ কারা সাজাবে, কোন জোট সরকারে আসবে এবং কত দূর শাসন করতে পারবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই ছিল।
এই পথ বেছে নিতে বেসামরিক রাজনীতিবিদদের খুব একটা দ্বিধা ছিল না। শাহবাজের মন্ত্রিসভার এক সদস্য ২০২৩ সালে বলেছিলেন, ‘ইমরান খানকে সেনাবাহিনী ছাড়া আমরা সরাতে পারব না।’ ২০২৩-এর আগস্টে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পাওয়া কিছু রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি থেকে অর্জিত আয়ের তথ্য তিনি গোপন করেছিলেন, যা পাকিস্তানি আইনে দণ্ডনীয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে। তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক। তাঁর মোকাবিলা বেসামরিক রাজনীতির সামর্থ্যের বাইরে বলে অনেকেই মনে করেন। নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তাদের সুযোগ করে দেয় ইমরানের রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, তাঁর দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা দুর্বল করা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনকে নিজেদের মতো রূপ দিতে। ইমরানবিরোধীদের সঙ্গে জেনারেলদের শুরুতে কৌশলগত যে জোট হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাঠামোগত ক্ষমতা হস্তান্তরে রূপ নেয়।
দুই বছর কেটে গেছে। ইমরান খান এখনো কারাগারে, জনসমক্ষে কার্যত অদৃশ্য। এমন সব মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে যেগুলোকে অধিকাংশ পাকিস্তানি ন্যায্য মনে করেন না। ২০২২ সালে তাঁকে সরিয়ে রাজনৈতিক সংকট থামানোর যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, সেটি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু সেই দুর্বল মুহূর্তে বেসামরিক রাজনীতিবিদেরা যে ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তা আর ফেরত পাওয়া যায়নি। বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুরু হয়েছিল একজন মানুষকে কেন্দ্র করে, শেষে এসে রাষ্ট্রটাই গিলে ফেলা হলো।
ফিল্ড মার্শালের সুখের সময়
ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের মে মাসে, ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক যুদ্ধে। সেই যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ ছিল ভারতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরে একটি হামলা। এই হামলার পর নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের ওপর দায় চাপায়। শুরু হয় যুদ্ধ। কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর দুই পক্ষই সরে আসে, যুদ্ধ থেমে যায়। পাকিস্তান বিজয় দাবি করে এবং দেশটির সাধারণ মানুষও তা বিশ্বাস করে। ভারত ও তার জনগণও তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিজয় মনে করে। তবে মাঠের কাহিনির চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যুদ্ধবিরতি কৌশল। প্রকাশ্যে আসে যে, শাহবাজ শরিফ ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ থামানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মুনিরের সঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি ও বিদেশিদের কাছে একটি পুরোনো একটি সত্য আবারও প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধ ও শান্তির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে।
পরবর্তী মাসগুলোতে এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া পাকিস্তানের ক্ষমতা ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। জুনে ট্রাম্প মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় কোনো বেসামরিক নেতা তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন না। ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের কোনো বেসামরিক নেতাকে আতিথেয়তা না দিয়ে একা কেবল সেনাপ্রধানকে গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী—বৈঠকের বিষয়বস্তু কেবল নিরাপত্তা নয়, সেখানে ছিল বাণিজ্য, শক্তি, প্রযুক্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিরল খনিজসম্পদের আলোচনা। এসব বিষয় একসময় বেসামরিক সরকারের দায়িত্ব থাকলেও, তা এখন সরাসরি জেনারেলের ডেস্কে চলে আসে।
চলতি বছরের গ্রীষ্ম শেষের দিকে, মুনিরের নেতৃত্বে নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতি শুরু হয়। জুলাইয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক কাঠামো ঘোষণা করেন, যেখানে পাকিস্তান এই অঞ্চলে সবচেয়ে কম, মাত্র ১৯ শতাংশ শুল্কে সুবিধা পায়। এ ছাড়া, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি, খনি ও জ্বালানি প্রকল্পের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে।
এসব বিষয় স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এবং কৌশলগত শিল্পের ওপর কেন্দ্রীয় নজরদারির গঠন করা হয়। এই সংস্থায় সামরিক–বেসামরিক যৌথ নেতৃত্ব আছে। প্রধানমন্ত্রী এই সংস্থার চেয়ারম্যান হলেও সেনাপ্রধান সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা অ্যাপেক্স কমিটির সদস্য এবং একজন কর্মরত জেনারেল জাতীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। এই নতুন চ্যানেলের মাধ্যমে বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন নামে সেনা পরিচালিত একটি সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরিভিত্তিক ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালসের সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিরল খনিজ রপ্তানির চুক্তি করে। ইসলামাবাদে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, মুনির নিজেই এই চুক্তি তদারকি করেছেন।
এরপর হোয়াইট হাউসে আবারও বৈঠকে বসেন মুনির। গত ২৬ সেপ্টেম্বর অবশ্য মুনির ও শরিফ একসঙ্গে ওয়াশিংটনে যান। এটি ছিল ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। সেনাপ্রধান ট্রাম্পের সামনে পাকিস্তানের বিরল খনিজ ও রত্ন উপস্থাপন করছেন—এমন একটি ছবি সে সময় ব্যাপক প্রচার করা হয়। এটি হয়তো বিক্রেতার একটি প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইন, কিন্তু তা এক ধরনের নীতিমালার ঘোষণাও বটে। সেটা হলো—পাকিস্তানের নতুন কূটনীতিতে সেনাবাহিনী হলো গ্যারান্টর, আলোচক এবং চূড়ান্ত সমঝোতার কারিগর।
অতীতের সঙ্গে তুলনা ইঙ্গিতপূর্ণ। ২০১৯ সালে ইমরান খান যখন হোয়াইট হাউসে যান, তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়া তাঁর সঙ্গে গেলেও তিনি সেখানে কেবলই আলঙ্কারিকভাবে উপস্থিত ছিলেন এবং শুধুমাত্র কিছু সরকারি ছবিতে বাজওয়াকে দেখা গেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মুনির আর পেছনে থাকা নীরব পর্যবেক্ষক নন। তিনি নীতিনির্ধারণের প্রধান অংশ। এটি প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ—পাকিস্তানে এখন এমন এক ক্ষমতা ব্যবস্থা বিরাজ করছে, যেখানে ক্ষমতার আসল ঠিকানা লুকানোর চেষ্টা বন্ধ হয়ে গেছে।
ওভাল অফিসে সেই বৈঠকের তিন দিন পর ট্রাম্প তাঁর গাজা পরিকল্পনা প্রচারের সময় শরিফ ও মুনিরের নাম উল্লেখ করেন। এই উল্লেখ ইসলামাবাদকে সন্তুষ্ট করেছে। এটি পাকিস্তান সরকারকে ভৌগোলিক ও কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপযুক্ত অংশীদার হিসেবে প্রমাণ করার প্রচেষ্টার সমর্থন বলেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে, এমন সময়ে যখন ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের সম্পর্কের অস্থির মুহূর্তে ইসলামাবাদ তার দীর্ঘমেয়াদি মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে অনন্য অবস্থান ব্যবহার করতে পারে যা ওয়াশিংটনকে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে এবং যেসব খেলোয়াড়কে সরাসরি প্রভাবিত করা যায় না তাদের সঙ্গে চ্যানেল রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পাকিস্তানকে গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, যা পাকিস্তানি কূটনীতিতে সেনাবাহিনীর এগিয়ে আসার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
এই পরিবর্তন অতীতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ নয়, বরং পরিচিত ধারা নতুন সময়ের সাপেক্ষে আপডেট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়লে পাকিস্তানি সামরিক শক্তিধরদের বেছে নিয়েছেন। ১৯৬০-এর দশকে যখন ওয়াশিংটন এশিয়ায় নির্ভরযোগ্য স্নায়ুযুদ্ধের পার্টনার খুঁজছিল তখন আইয়ুব খান; ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থিত সোভিয়েতবিরোধী জিহাদ চলাকালে জিয়াউল হক এবং ৯ / ১১-এর পরে পারভেজ মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্রের আস্থায় ছিলেন।
তবে বর্তমান সময়ের ভিন্নতা হলো, মুনির এই প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছেন কোনো অভ্যুত্থান ছাড়াই। সেনাবাহিনী পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক শাসন কাঠামোর ভেতরে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বিনিয়োগ সংস্থা পরিচালনা, বৈদেশিক নীতি গঠন, কমান্ড ক্ষমতার পুনর্গঠন এবং সেনাপ্রধানকে বেসামরিক ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিদেশের অনেকের কাছে পাকিস্তানের ইউনিফর্ম পরা নেতৃত্বের স্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর জন্যও এই হাইব্রিড শাসন গ্রহণ করা যৌক্তিক। মুনির সাধারণ কোনো সেনাপ্রধান নন। এই বছরের শুরুতে তাঁকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়েছে (প্রায় ছয় দশকের মধ্যে প্রথম), সেনাপ্রধান হিসেবে মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়েছে, সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে এবং এখন অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। তিনি সাম্প্রতিক স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনা কর্মকর্তা।
তাঁর উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বিরূপ বিষয় হলো—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের চোখে সেনাবাহিনী বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল। ইমরান খানের অপসারণ ও পরবর্তী অস্থিরতা লাখ লাখ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষকতা থাকা সত্ত্বেও দেশের ক্ষতিকর বল মনে করতে শুরু করেছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে খানের সমর্থকেরা সেনা স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, যার মধ্যে লাহোরে করপস কমান্ডারের বাসভবনও ছিল, যা পাকিস্তানে অনন্য ঘটনা। জেনারেলরা মনে করেন, ছায়ায় থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। বরং প্রকাশ্যভাবে নেতৃত্ব দাবি করা ভালো, খলনায়ক সাজার নাটক আর নয়, বরং স্থিতিশীলতার শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা ভালো এবং প্রয়োজন।
তাদের হিসাব স্পষ্ট—ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘর্ষের পর জনপ্রিয়তা বাড়ার পর, জেনারেলরা বুঝেছেন যে, অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ চুক্তি এবং অন্যান্য উদ্যোগ যদি জনসাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে চায়, তবে তা খোলামেলাভাবে করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, সেনাবাহিনী এখন কেবল ক্ষমতা একত্রিত করছে না, বরং নিজেকে দেশের অপরিহার্য জীবনরেখা হিসেবে বাজারে উপস্থাপন করছে।
অদৃশ্য নয়, দৃশ্যমান হাত
পাকিস্তান আগেও সামরিক শাসন দেখেছে, কিন্তু আজকের পরিস্থিতি শুধুমাত্র আইয়ুব, জিয়াউল বা মোশাররফের যুগের পুনরাবৃত্তি নয়। এখানে কোনো অভ্যুত্থান হয়নি, সংবিধান স্থগিত হয়নি, পার্লামেন্টও বাতিল হয়নি। যে বিষয়টি এই মুহূর্তকে আলাদা এবং তাৎপর্যপূর্ণ করছে তা হলো—সেনাবাহিনী এখন গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে, বাইরে থেকে নয়। জেনারেলরা কার্যত রাজনৈতিক ব্যবস্থা দখল করেছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে সেটিকে নতুন কোনো ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিস্থাপন করেনি। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখাকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনকে বছরের পর বছর প্রভাবিত করবে।
এই পরিবর্তনে অনেক কিছুই অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হয়েছে এবং তা গুরুত্বপূর্ণ। এটি ক্ষমতা কাঠামোর মূল খেলোয়াড়দের মনোভাব বদলে দেয়, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে এবং দেশ যে আন্তর্জাতিক পরিবেশে চলাফেরা করে সেটাকেও বদলে দেয়। এর একটি প্রভাব হলো—এই পুরো পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এবং বেসামরিক জনজীবনে সামরিক আধিপত্যকে স্বাভাবিক করে তোলে। রাজনৈতিক দলগুলো এখানে আর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে না থেকে স্রেফ প্রশাসনিক সংযোজন হিসেবে পরিণত হয়। পার্লামেন্ট হয়ে যায় নাট্যমঞ্চ এবং প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন অন্য কোথাও নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রশাসক। এটি হলো রাজনীতিবিদদের সেই চুক্তির মূল্য, যা ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে করা হয়েছিল।
তবে ক্ষমতা কাঠামোতে সেনাবাহিনীর দৃশ্যমান অবস্থান নতুন ধরনের জবাবদিহি তৈরি করে। যখন সেনাবাহিনী খোলাখুলি নীতি নির্ধারণ করে, তখন তার ফলাফলও গ্রহণ করতে হয়। বৃদ্ধি থমকে গেলে, বিনিয়োগ ব্যর্থ হলে, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে—জেনারেলরা অযোগ্য মন্ত্রিপরিষদকে দোষ দিতে পারবে না। প্রদর্শিত ক্ষমতা সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার জন্যও জবাবদিহি করতে বাধ্য। এই ডাইনামিকস এরই মধ্যে স্পষ্ট। সামরিক নেতৃত্ব বারবার জনমত জরিপের কথা উল্লেখ করছে, প্রেস ব্রিফিংয়ে তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে উকালতি করছে এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনের ক্রেডিট চাইছে। এটি দেখায় যে, জেনারেলরা এখন নতুনভাবে সচেতন যে, অর্জন ব্যর্থ হলে তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
বেসামরিক ক্ষমতাকাঠামোর ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাইপাস করার বিষয়টি সেনাবাহিনীকে দ্বিধার সম্মুখীন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিলের কথা বলা যেতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৌশলগত শিল্প সম্পর্কিত বিষয়গুলো সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারে। কিন্তু সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা সংরক্ষণ মন্ত্রণালয়গুলোকে দুর্বল করতে পারে, বেসামরিক বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে পারে এবং পার্লামেন্টারি তদারকি, গণমাধ্যমের সমালোচনা ও বিরোধীদের নজরদারি কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এসব বিষয়ই মূলত গণতন্ত্রে সরকারকে আত্মসংশোধনের সুযোগ দেয়।
যখন একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা কতিপয় এলিট জেনারেলর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের অতীত সামরিক সরকারের উদাহরণ এটি স্পষ্ট দেখিয়েছ। সামরিক শাসন প্রায়ই সাময়িক স্থিতিশীলতা দেয়, কিন্তু বৃদ্ধি থেমে গেলে বা সংকট এলে, প্রাতিষ্ঠানিক বাফারের অভাব দ্রুত পতন ত্বরান্বিত করে।
ইমরান খানের দুই বছরের কারাবাস সামরিক বাহিনীর দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা যে দেশকে খোলেআম শাসন করছে—সেটা নিশ্চিত করার জন্য হয় নির্বাচন বা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে, নতুবা তাঁকে চিরতরে রাজনৈতিক অঙ্গনে থেকে সরিয়ে দিতে হবে। দুই পথই বিপজ্জনক। পুনর্বাসন নতুন শৃঙ্খলাকে অস্থির করতে পারে, অপরদিকে অবিরাম দমন সেনাবাহিনীর শাসনের বৈধতা দ্রুত ক্ষয় করে দিতে পারে।
যদিও কিছু দেশ—যেমন যুক্তরাষ্ট্র—সামরিক নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। কারণ, সেনাপ্রধানের দৃশ্যমান ভূমিকায় কার্যত নেতা হিসেবে থাকা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির পরিসর ছোট করে আনতে পারে পারে। এর ফলে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিরাপত্তা কেন্দ্রিক হয়ে যাবে, যা মূলত বেসামরিক প্রশাসনের বিপরীতে সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে সংলাপ কঠিন হবে এবং উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে—যেখানে পাকিস্তান সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে—সামরিক নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান অন্যান্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে, যার ফলে ইরানের সঙ্গে নীতিগত বিচ্যুতি এবং পাকিস্তানের অযাচিত সংঘর্ষে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
পর্দা সরে গেছে, মঞ্চ আলোকিত
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের ডিপ স্টেট জেনারেলদের দায়িত্বহীনভাবে ক্ষমতায় থাকতে দিয়েছে, আর ব্যর্থতার বোঝা তুলে দিয়েছে সাধারণ নাগরিকদের কাঁধে। মুনির মডেল সেই চুক্তি উল্টে দিয়েছে। সেনা শক্তিকে প্রকাশ্য এনে সেনাবাহিনী কার্যকারিতা ও দ্রুততার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই চুক্তি উর্দি ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার ফারাকটুকুও মুছে দিয়েছে। এটি কোনো ক্রমবর্ধমান অভ্যুত্থান নয়। এটি আরও সূক্ষ্ম কিছু: কৌশলগত সংহতি। সেনারা তাদের প্রাধান্যকে গোপন না করেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হাস্যকর হলে সত্যি যে, এখন শাহবাজ শরিফ সেই ব্যবস্থারই প্রধান, যা তাঁর বড় ভাই নওয়াজ শরিফ এক সময় প্রতিরোধ করেছিলেন। বড় ভাই যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি জেনারেলদের সঙ্গে বারবার সংঘাতে জড়িয়েছেন। ১৯৯৮ সালে তখনকার সেনাপ্রধান জাহাঙ্গীর করমাত তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মতো একটি সংবিধানগত কাঠামো প্রস্তাব করেছিলেন—যেখানে শাসনে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হতো। নওয়াজ সেটিকে বেসামরিক শাসনে হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই নওয়াজ করমাতকে পদত্যাগ করতে বলেন। সেই প্রথম পাকিস্তানের রাজনৈতিক যুদ্ধে বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী জিতেছিলেন, জেনারেল নয়। শাহবাজের অধীনে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেছে।
এই শাসনকে বিভিন্ন চটকদার কিন্তু শালীন ভাষা বাদ দিলে, এই হাইব্রিড মডেল হলো—পুরোনো সত্যকে নতুন আঙ্গিকে ঢেকে রাখার চেষ্টা—সেনারা শাসন চালায় এবং বেসামরিক প্রশাসন তা মেনে চলে। এখন পার্থক্য শুধু এটুকুই যে পর্দা সরে গেছে, মঞ্চ পুরোপুরি আলোকিত—যেন সবাই তা দেখতে পারে।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাজা যুদ্ধ বন্ধে ২০ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। প্রস্তাব উত্থাপনের মাঝে ট্রাম্প দুজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন, যারা এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। তাঁরা হলেন—পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
ওই অনুষ্ঠানে স্বল্প সময়ের জন্য নাম দুটি উচ্চারিত হয়েছিল, কিন্তু সেটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের নামোল্লেখ ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সংক্রান্ত বোঝাপড়ার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। দুজনের নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে সমান গুরুত্ব দেন। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শাহবাজ শরিফ সরকারপ্রধান হলেও প্রকৃত ক্ষমতা মুনিরের হাতেই বাঁধা।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান বারবার বেসামরিক ও সামরিক শাসনের দোলাচলে দুলেছে। দেশটিতে সর্বশেষ অভ্যুত্থান হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে (শাহবাজের বড় ভাই) ক্ষমতাচ্যুত করে তখতে আসীন হন। ২০০৮ সালে পাকিস্তান আবার বেসামরিক শাসনে ফেরে। এরপর কয়েক দফা বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে, সামরিক চাপের ভেতরেও তারা কিছু নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা পেয়েছিল, দেশীয় এজেন্ডার একটা অংশ ঠিক করতে পেরেছিল, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিল। সেই দিনগুলো এখন অতীত। চোখে পড়ার মতো কোনো অভ্যুত্থান ছাড়াই এখন দেশ চালাচ্ছে জেনারেলরা, আর বেসামরিক নেতৃত্ব শুধু বাহারি পোস্টার।
একে বলা যায় ‘মুনির মডেল’ নামে। গণতন্ত্রের আবরণে সামরিক নিয়ন্ত্রণ। ২০০৮ সালে সরাসরি সামরিক শাসন শেষ হওয়ার পর থেকে এটাই পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর সবচেয়ে তীক্ষ্ণ পুনর্গঠন। এই ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী আর আড়ালে থেকে সুতো টানে না, বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটিয়ে বা কখনো সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে শাসন করে। নীতি প্রণয়ন থেকে কূটনীতি, অর্থনীতির দিকনির্দেশনা—সবকিছুতেই তাদের হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট। নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা বিষয় তো তাদের ঐতিহ্যগত কর্তৃত্বের ক্ষেত্র হিসেবে আছেই।
ক্ষমতার এই সংহতি এখন শুধু অলিখিত প্রথায় সীমাবদ্ধ নেই, আইনেও গাঁথা হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেই পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধন করে মুনিরকে দেশের সব বাহিনীর শীর্ষে বসিয়েছে। তাঁকে দেওয়া হয়েছে আজীবন আইনি দায়মুক্তি আর নবায়নযোগ্য ৫ বছরের মেয়াদ। অর্থাৎ, সেনাপ্রধানের চারপাশে বিস্তৃত এক নতুন কমান্ড কাঠামো আইনগত রূপ পেয়েছ, আর তিনি চাইলে মোট ১০ বছর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকতে পারবেন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এ বছরের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন হাইব্রিড। সামরিক ও বেসামরিক সরকার ‘ক্ষমতার কাঠামোর যৌথ মালিক।’ কোনো লজ্জা ছাড়াই তিনি যোগ করেন, ‘এই হাইব্রিড ব্যবস্থাটা দারুণ কাজ করছে।’
সেনাপ্রধানের সমর্থকেরা অবশ্য বিগত এক বছরের ‘দারুণ কাজের’ ফিরিস্তি তুলে ধরবেন। মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান নতুন আইএমএফ ঋণ পেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ চালু হয়েছে, যেখান থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে। সামরিক নেতৃত্বে গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিল এখন বিদেশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার মূল রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্ম—বিশেষ করে জ্বালানি, কৃষি ও খনিজ খাতে।
সমর্থকদের মতে, এমন কেন্দ্রীভূত ও সামরিক-নির্ভর শাসন পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর এক ধরনের সামঞ্জস্য ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু, এখন যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কার্যত সেনাবাহিনীর হাতে, তখন সেনা কর্মকর্তাদেরও আর আড়ালে থাকার জায়গা নেই। দেশের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দায়ও এখন তাঁদের কাঁধেই পড়বে।
রাষ্ট্র গলঃধকরণ
২০২২ সালের এপ্রিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তখন প্রায় সবারই ধারণা ছিল, তাঁর পতনের নেপথ্যে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা আছে। এরপর শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা পুরোপুরি সামরিক সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বেসামরিক সরকারের পার্লামেন্টারি আবরণ ছিল, কিন্তু দেশের কঠিনতম কাজগুলো সামলাচ্ছিল সেনাবাহিনীই। ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, রাজনৈতিক অস্থিরতা দমন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নজরদারি, বিদেশনীতি পরিচালনা—সবই ছিল জেনারেলদের হাতে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই বাস্তবতাকেই আবারও পুনর্নিশ্চিত করে। নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞায় ইমরান খানের দল দলীয়ভাবে ভোটে দাঁড়াতে পারেনি; নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবেই অংশ নিতে হয়। তবু তারা সর্বাধিক আসন পায়, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়তে পারেনি। শাহবাজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ আবারও দুর্বল জোট সরকারের নেতৃত্বে ফিরে আসে। তারা পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করে। জাতীয় পরিষদের এই অঙ্ক তাদের বৈধতা দিতে পারে বটে, কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি ছিল সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, আদালত ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব, এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা—সবকিছু মিলিয়ে রাজনৈতিক মাঠ কারা সাজাবে, কোন জোট সরকারে আসবে এবং কত দূর শাসন করতে পারবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই ছিল।
এই পথ বেছে নিতে বেসামরিক রাজনীতিবিদদের খুব একটা দ্বিধা ছিল না। শাহবাজের মন্ত্রিসভার এক সদস্য ২০২৩ সালে বলেছিলেন, ‘ইমরান খানকে সেনাবাহিনী ছাড়া আমরা সরাতে পারব না।’ ২০২৩-এর আগস্টে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পাওয়া কিছু রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি থেকে অর্জিত আয়ের তথ্য তিনি গোপন করেছিলেন, যা পাকিস্তানি আইনে দণ্ডনীয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে। তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক। তাঁর মোকাবিলা বেসামরিক রাজনীতির সামর্থ্যের বাইরে বলে অনেকেই মনে করেন। নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তাদের সুযোগ করে দেয় ইমরানের রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, তাঁর দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা দুর্বল করা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনকে নিজেদের মতো রূপ দিতে। ইমরানবিরোধীদের সঙ্গে জেনারেলদের শুরুতে কৌশলগত যে জোট হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাঠামোগত ক্ষমতা হস্তান্তরে রূপ নেয়।
দুই বছর কেটে গেছে। ইমরান খান এখনো কারাগারে, জনসমক্ষে কার্যত অদৃশ্য। এমন সব মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে যেগুলোকে অধিকাংশ পাকিস্তানি ন্যায্য মনে করেন না। ২০২২ সালে তাঁকে সরিয়ে রাজনৈতিক সংকট থামানোর যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, সেটি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু সেই দুর্বল মুহূর্তে বেসামরিক রাজনীতিবিদেরা যে ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তা আর ফেরত পাওয়া যায়নি। বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুরু হয়েছিল একজন মানুষকে কেন্দ্র করে, শেষে এসে রাষ্ট্রটাই গিলে ফেলা হলো।
ফিল্ড মার্শালের সুখের সময়
ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের মে মাসে, ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক যুদ্ধে। সেই যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ ছিল ভারতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরে একটি হামলা। এই হামলার পর নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের ওপর দায় চাপায়। শুরু হয় যুদ্ধ। কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর দুই পক্ষই সরে আসে, যুদ্ধ থেমে যায়। পাকিস্তান বিজয় দাবি করে এবং দেশটির সাধারণ মানুষও তা বিশ্বাস করে। ভারত ও তার জনগণও তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিজয় মনে করে। তবে মাঠের কাহিনির চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যুদ্ধবিরতি কৌশল। প্রকাশ্যে আসে যে, শাহবাজ শরিফ ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ থামানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মুনিরের সঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি ও বিদেশিদের কাছে একটি পুরোনো একটি সত্য আবারও প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধ ও শান্তির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে।
পরবর্তী মাসগুলোতে এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া পাকিস্তানের ক্ষমতা ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। জুনে ট্রাম্প মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় কোনো বেসামরিক নেতা তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন না। ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের কোনো বেসামরিক নেতাকে আতিথেয়তা না দিয়ে একা কেবল সেনাপ্রধানকে গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী—বৈঠকের বিষয়বস্তু কেবল নিরাপত্তা নয়, সেখানে ছিল বাণিজ্য, শক্তি, প্রযুক্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিরল খনিজসম্পদের আলোচনা। এসব বিষয় একসময় বেসামরিক সরকারের দায়িত্ব থাকলেও, তা এখন সরাসরি জেনারেলের ডেস্কে চলে আসে।
চলতি বছরের গ্রীষ্ম শেষের দিকে, মুনিরের নেতৃত্বে নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতি শুরু হয়। জুলাইয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক কাঠামো ঘোষণা করেন, যেখানে পাকিস্তান এই অঞ্চলে সবচেয়ে কম, মাত্র ১৯ শতাংশ শুল্কে সুবিধা পায়। এ ছাড়া, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি, খনি ও জ্বালানি প্রকল্পের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে।
এসব বিষয় স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এবং কৌশলগত শিল্পের ওপর কেন্দ্রীয় নজরদারির গঠন করা হয়। এই সংস্থায় সামরিক–বেসামরিক যৌথ নেতৃত্ব আছে। প্রধানমন্ত্রী এই সংস্থার চেয়ারম্যান হলেও সেনাপ্রধান সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা অ্যাপেক্স কমিটির সদস্য এবং একজন কর্মরত জেনারেল জাতীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। এই নতুন চ্যানেলের মাধ্যমে বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন নামে সেনা পরিচালিত একটি সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরিভিত্তিক ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালসের সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিরল খনিজ রপ্তানির চুক্তি করে। ইসলামাবাদে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, মুনির নিজেই এই চুক্তি তদারকি করেছেন।
এরপর হোয়াইট হাউসে আবারও বৈঠকে বসেন মুনির। গত ২৬ সেপ্টেম্বর অবশ্য মুনির ও শরিফ একসঙ্গে ওয়াশিংটনে যান। এটি ছিল ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। সেনাপ্রধান ট্রাম্পের সামনে পাকিস্তানের বিরল খনিজ ও রত্ন উপস্থাপন করছেন—এমন একটি ছবি সে সময় ব্যাপক প্রচার করা হয়। এটি হয়তো বিক্রেতার একটি প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইন, কিন্তু তা এক ধরনের নীতিমালার ঘোষণাও বটে। সেটা হলো—পাকিস্তানের নতুন কূটনীতিতে সেনাবাহিনী হলো গ্যারান্টর, আলোচক এবং চূড়ান্ত সমঝোতার কারিগর।
অতীতের সঙ্গে তুলনা ইঙ্গিতপূর্ণ। ২০১৯ সালে ইমরান খান যখন হোয়াইট হাউসে যান, তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়া তাঁর সঙ্গে গেলেও তিনি সেখানে কেবলই আলঙ্কারিকভাবে উপস্থিত ছিলেন এবং শুধুমাত্র কিছু সরকারি ছবিতে বাজওয়াকে দেখা গেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মুনির আর পেছনে থাকা নীরব পর্যবেক্ষক নন। তিনি নীতিনির্ধারণের প্রধান অংশ। এটি প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ—পাকিস্তানে এখন এমন এক ক্ষমতা ব্যবস্থা বিরাজ করছে, যেখানে ক্ষমতার আসল ঠিকানা লুকানোর চেষ্টা বন্ধ হয়ে গেছে।
ওভাল অফিসে সেই বৈঠকের তিন দিন পর ট্রাম্প তাঁর গাজা পরিকল্পনা প্রচারের সময় শরিফ ও মুনিরের নাম উল্লেখ করেন। এই উল্লেখ ইসলামাবাদকে সন্তুষ্ট করেছে। এটি পাকিস্তান সরকারকে ভৌগোলিক ও কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপযুক্ত অংশীদার হিসেবে প্রমাণ করার প্রচেষ্টার সমর্থন বলেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে, এমন সময়ে যখন ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের সম্পর্কের অস্থির মুহূর্তে ইসলামাবাদ তার দীর্ঘমেয়াদি মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে অনন্য অবস্থান ব্যবহার করতে পারে যা ওয়াশিংটনকে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে এবং যেসব খেলোয়াড়কে সরাসরি প্রভাবিত করা যায় না তাদের সঙ্গে চ্যানেল রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পাকিস্তানকে গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, যা পাকিস্তানি কূটনীতিতে সেনাবাহিনীর এগিয়ে আসার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
এই পরিবর্তন অতীতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ নয়, বরং পরিচিত ধারা নতুন সময়ের সাপেক্ষে আপডেট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়লে পাকিস্তানি সামরিক শক্তিধরদের বেছে নিয়েছেন। ১৯৬০-এর দশকে যখন ওয়াশিংটন এশিয়ায় নির্ভরযোগ্য স্নায়ুযুদ্ধের পার্টনার খুঁজছিল তখন আইয়ুব খান; ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থিত সোভিয়েতবিরোধী জিহাদ চলাকালে জিয়াউল হক এবং ৯ / ১১-এর পরে পারভেজ মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্রের আস্থায় ছিলেন।
তবে বর্তমান সময়ের ভিন্নতা হলো, মুনির এই প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছেন কোনো অভ্যুত্থান ছাড়াই। সেনাবাহিনী পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক শাসন কাঠামোর ভেতরে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বিনিয়োগ সংস্থা পরিচালনা, বৈদেশিক নীতি গঠন, কমান্ড ক্ষমতার পুনর্গঠন এবং সেনাপ্রধানকে বেসামরিক ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিদেশের অনেকের কাছে পাকিস্তানের ইউনিফর্ম পরা নেতৃত্বের স্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর জন্যও এই হাইব্রিড শাসন গ্রহণ করা যৌক্তিক। মুনির সাধারণ কোনো সেনাপ্রধান নন। এই বছরের শুরুতে তাঁকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়েছে (প্রায় ছয় দশকের মধ্যে প্রথম), সেনাপ্রধান হিসেবে মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়েছে, সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে এবং এখন অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। তিনি সাম্প্রতিক স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনা কর্মকর্তা।
তাঁর উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বিরূপ বিষয় হলো—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের চোখে সেনাবাহিনী বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল। ইমরান খানের অপসারণ ও পরবর্তী অস্থিরতা লাখ লাখ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষকতা থাকা সত্ত্বেও দেশের ক্ষতিকর বল মনে করতে শুরু করেছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে খানের সমর্থকেরা সেনা স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, যার মধ্যে লাহোরে করপস কমান্ডারের বাসভবনও ছিল, যা পাকিস্তানে অনন্য ঘটনা। জেনারেলরা মনে করেন, ছায়ায় থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। বরং প্রকাশ্যভাবে নেতৃত্ব দাবি করা ভালো, খলনায়ক সাজার নাটক আর নয়, বরং স্থিতিশীলতার শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা ভালো এবং প্রয়োজন।
তাদের হিসাব স্পষ্ট—ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘর্ষের পর জনপ্রিয়তা বাড়ার পর, জেনারেলরা বুঝেছেন যে, অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ চুক্তি এবং অন্যান্য উদ্যোগ যদি জনসাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে চায়, তবে তা খোলামেলাভাবে করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, সেনাবাহিনী এখন কেবল ক্ষমতা একত্রিত করছে না, বরং নিজেকে দেশের অপরিহার্য জীবনরেখা হিসেবে বাজারে উপস্থাপন করছে।
অদৃশ্য নয়, দৃশ্যমান হাত
পাকিস্তান আগেও সামরিক শাসন দেখেছে, কিন্তু আজকের পরিস্থিতি শুধুমাত্র আইয়ুব, জিয়াউল বা মোশাররফের যুগের পুনরাবৃত্তি নয়। এখানে কোনো অভ্যুত্থান হয়নি, সংবিধান স্থগিত হয়নি, পার্লামেন্টও বাতিল হয়নি। যে বিষয়টি এই মুহূর্তকে আলাদা এবং তাৎপর্যপূর্ণ করছে তা হলো—সেনাবাহিনী এখন গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে, বাইরে থেকে নয়। জেনারেলরা কার্যত রাজনৈতিক ব্যবস্থা দখল করেছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে সেটিকে নতুন কোনো ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিস্থাপন করেনি। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখাকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনকে বছরের পর বছর প্রভাবিত করবে।
এই পরিবর্তনে অনেক কিছুই অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হয়েছে এবং তা গুরুত্বপূর্ণ। এটি ক্ষমতা কাঠামোর মূল খেলোয়াড়দের মনোভাব বদলে দেয়, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে এবং দেশ যে আন্তর্জাতিক পরিবেশে চলাফেরা করে সেটাকেও বদলে দেয়। এর একটি প্রভাব হলো—এই পুরো পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এবং বেসামরিক জনজীবনে সামরিক আধিপত্যকে স্বাভাবিক করে তোলে। রাজনৈতিক দলগুলো এখানে আর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে না থেকে স্রেফ প্রশাসনিক সংযোজন হিসেবে পরিণত হয়। পার্লামেন্ট হয়ে যায় নাট্যমঞ্চ এবং প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন অন্য কোথাও নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রশাসক। এটি হলো রাজনীতিবিদদের সেই চুক্তির মূল্য, যা ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে করা হয়েছিল।
তবে ক্ষমতা কাঠামোতে সেনাবাহিনীর দৃশ্যমান অবস্থান নতুন ধরনের জবাবদিহি তৈরি করে। যখন সেনাবাহিনী খোলাখুলি নীতি নির্ধারণ করে, তখন তার ফলাফলও গ্রহণ করতে হয়। বৃদ্ধি থমকে গেলে, বিনিয়োগ ব্যর্থ হলে, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে—জেনারেলরা অযোগ্য মন্ত্রিপরিষদকে দোষ দিতে পারবে না। প্রদর্শিত ক্ষমতা সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার জন্যও জবাবদিহি করতে বাধ্য। এই ডাইনামিকস এরই মধ্যে স্পষ্ট। সামরিক নেতৃত্ব বারবার জনমত জরিপের কথা উল্লেখ করছে, প্রেস ব্রিফিংয়ে তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে উকালতি করছে এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনের ক্রেডিট চাইছে। এটি দেখায় যে, জেনারেলরা এখন নতুনভাবে সচেতন যে, অর্জন ব্যর্থ হলে তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
বেসামরিক ক্ষমতাকাঠামোর ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাইপাস করার বিষয়টি সেনাবাহিনীকে দ্বিধার সম্মুখীন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিলের কথা বলা যেতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৌশলগত শিল্প সম্পর্কিত বিষয়গুলো সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারে। কিন্তু সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা সংরক্ষণ মন্ত্রণালয়গুলোকে দুর্বল করতে পারে, বেসামরিক বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে পারে এবং পার্লামেন্টারি তদারকি, গণমাধ্যমের সমালোচনা ও বিরোধীদের নজরদারি কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এসব বিষয়ই মূলত গণতন্ত্রে সরকারকে আত্মসংশোধনের সুযোগ দেয়।
যখন একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা কতিপয় এলিট জেনারেলর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের অতীত সামরিক সরকারের উদাহরণ এটি স্পষ্ট দেখিয়েছ। সামরিক শাসন প্রায়ই সাময়িক স্থিতিশীলতা দেয়, কিন্তু বৃদ্ধি থেমে গেলে বা সংকট এলে, প্রাতিষ্ঠানিক বাফারের অভাব দ্রুত পতন ত্বরান্বিত করে।
ইমরান খানের দুই বছরের কারাবাস সামরিক বাহিনীর দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা যে দেশকে খোলেআম শাসন করছে—সেটা নিশ্চিত করার জন্য হয় নির্বাচন বা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে, নতুবা তাঁকে চিরতরে রাজনৈতিক অঙ্গনে থেকে সরিয়ে দিতে হবে। দুই পথই বিপজ্জনক। পুনর্বাসন নতুন শৃঙ্খলাকে অস্থির করতে পারে, অপরদিকে অবিরাম দমন সেনাবাহিনীর শাসনের বৈধতা দ্রুত ক্ষয় করে দিতে পারে।
যদিও কিছু দেশ—যেমন যুক্তরাষ্ট্র—সামরিক নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। কারণ, সেনাপ্রধানের দৃশ্যমান ভূমিকায় কার্যত নেতা হিসেবে থাকা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির পরিসর ছোট করে আনতে পারে পারে। এর ফলে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিরাপত্তা কেন্দ্রিক হয়ে যাবে, যা মূলত বেসামরিক প্রশাসনের বিপরীতে সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে সংলাপ কঠিন হবে এবং উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে—যেখানে পাকিস্তান সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে—সামরিক নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান অন্যান্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে, যার ফলে ইরানের সঙ্গে নীতিগত বিচ্যুতি এবং পাকিস্তানের অযাচিত সংঘর্ষে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
পর্দা সরে গেছে, মঞ্চ আলোকিত
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের ডিপ স্টেট জেনারেলদের দায়িত্বহীনভাবে ক্ষমতায় থাকতে দিয়েছে, আর ব্যর্থতার বোঝা তুলে দিয়েছে সাধারণ নাগরিকদের কাঁধে। মুনির মডেল সেই চুক্তি উল্টে দিয়েছে। সেনা শক্তিকে প্রকাশ্য এনে সেনাবাহিনী কার্যকারিতা ও দ্রুততার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই চুক্তি উর্দি ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার ফারাকটুকুও মুছে দিয়েছে। এটি কোনো ক্রমবর্ধমান অভ্যুত্থান নয়। এটি আরও সূক্ষ্ম কিছু: কৌশলগত সংহতি। সেনারা তাদের প্রাধান্যকে গোপন না করেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হাস্যকর হলে সত্যি যে, এখন শাহবাজ শরিফ সেই ব্যবস্থারই প্রধান, যা তাঁর বড় ভাই নওয়াজ শরিফ এক সময় প্রতিরোধ করেছিলেন। বড় ভাই যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি জেনারেলদের সঙ্গে বারবার সংঘাতে জড়িয়েছেন। ১৯৯৮ সালে তখনকার সেনাপ্রধান জাহাঙ্গীর করমাত তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মতো একটি সংবিধানগত কাঠামো প্রস্তাব করেছিলেন—যেখানে শাসনে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হতো। নওয়াজ সেটিকে বেসামরিক শাসনে হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই নওয়াজ করমাতকে পদত্যাগ করতে বলেন। সেই প্রথম পাকিস্তানের রাজনৈতিক যুদ্ধে বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী জিতেছিলেন, জেনারেল নয়। শাহবাজের অধীনে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেছে।
এই শাসনকে বিভিন্ন চটকদার কিন্তু শালীন ভাষা বাদ দিলে, এই হাইব্রিড মডেল হলো—পুরোনো সত্যকে নতুন আঙ্গিকে ঢেকে রাখার চেষ্টা—সেনারা শাসন চালায় এবং বেসামরিক প্রশাসন তা মেনে চলে। এখন পার্থক্য শুধু এটুকুই যে পর্দা সরে গেছে, মঞ্চ পুরোপুরি আলোকিত—যেন সবাই তা দেখতে পারে।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না।
০৮ অক্টোবর ২০২৫
২১ নভেম্বর দুবাই এয়ার শোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান (এলসিএ) তেজস এমকে-১-এর দুর্ঘটনার পর থেকেই এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড...
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর ভারত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা।
২ দিন আগেআজকের পত্রিকা ডেস্ক

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বকীয় পথের সন্ধান করছে, তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হলো, স্বল্প বিরতিতে চীন, রাশিয়া এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের দেশটিতে আতিথেয়তা দেওয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ডিসেম্বরেই ভারতে আসার কথা। ইউক্রেন আক্রমণের পর এটি হবে তাঁর প্রথম ভারত সফর। আগামী বছর ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করছে ভারত, সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের উপস্থিতিও প্রায় নিশ্চিত। এ বছরের কোয়াড সম্মেলন—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও সদস্য—এ মাসেই ভারতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেওয়ায় তা পিছিয়ে গেছে। নতুন তারিখ ঠিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারতে আসতে পারেন।
কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা দেশগুলো বা রাশিয়ান জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো একই মাত্রার শাস্তি পায়নি। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চীনকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, আর মার্কিন মিত্র হওয়ায় জাপান-তুরস্কও রেহাই পেয়েছে। এই বৈষম্য দেখায় যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতের নিজস্ব কৌশলগত অপরিহার্য অবস্থান এখনো দুর্বল। ভারতের জন্য প্রধান শিক্ষা হলো—আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতিকে আরও উদ্যোগী ও দৃঢ় রূপে গড়ে তোলা।
২০২৫ সালটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য ২০১৪ সালের ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক বছর হয়ে উঠেছে। এপ্রিলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর মে মাসে চার দিনের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত শুরু হয়। সময়ের দিক থেকে ছোট হলেও, গত কয়েক দশকের সবচেয়ে তীব্র মুখোমুখি অবস্থান ছিল এটি।
এই সংঘাত থেকেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতাতেই দুই দেশের সংঘাত থেমেছে। দিল্লি এই দাবি অস্বীকার করে, কিন্তু ইসলামাবাদ তা আগ্রহ নিয়ে প্রচার করতে থাকে। পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করে তোলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। সংঘাতের পরপরই পাকিস্তান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে দুই দফা হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হয়। জুনে মোদি ও ট্রাম্পের ফোনালাপে ট্রাম্প নাকি মোদি ও মুনিরকে একসঙ্গে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব দেন। কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বরাবরই না মানার নীতি অনুসরণ করে মোদি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে স্পষ্ট শীতলতা নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে গিয়ে দুজন আবার কথা বলার আগপর্যন্ত তাঁরা আর যোগাযোগ করেননি।
মাঝখানের সময়টায় দুই দেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি দেখা দেয়। আগস্টে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করতে না পারা, তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বোচ্চ শুল্কের ধাক্কা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তিক্ত হয়ে ওঠে। ট্রাম্প ভারতের অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে কটাক্ষ করেন, দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা সামান্যই। তার সঙ্গে যোগ হয় তাঁর বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারোর তীক্ষ্ণ মন্তব্য—ভারত নাকি ‘ক্রেমলিনের লন্ড্রি।’ এসব মন্তব্য দুই দেশের আস্থার ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়।
সাম্প্রতিক কালে দুই নেতার শান্ত সুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তেজনা হয়তো কমছে, আর শেষমেশ একটি বাণিজ্যচুক্তিও হতে পারে। তবু দিল্লির আগের অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে ভারতীয়দের যে প্রবল আশাবাদ ছিল, তা আজ আর নেই। একই সঙ্গে মিলিয়ে গেছে সেই দাবি যে নরেন্দ্র মোদি ও ট্রাম্প নাকি বিশেষ কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কে আবদ্ধ। মোদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির গর্ব করেছেন, যেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক নীতির সামনে তা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
আরও গভীরে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর সংকটগুলোই উন্মোচন করে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত বহুদিন ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের যে নীতি ধরে রেখেছে, তা যেমন আশীর্বাদ, তেমনি দায়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে, এর কারণে ভারতের হাতে রয়েছে নানা কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর যখন চীন-ভারত সম্পর্ক তলানিতে যায়, তখনই এই নমনীয়তার ফল দেখা যায়। দিল্লি তখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করে, বিশেষ করে কোয়াড কাঠামোয় ভারতের অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ানো হয়—তা তার স্পষ্ট উদাহরণ।
এমন বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জন্য একটি পরিষ্কার সুবিধা এনে দেয়—কোনো এক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। ২০২৪ সালের মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের উচিত প্রশংসিত হওয়া। কারণ, দেশটি পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বহু বিকল্প’ পথ ধরে রেখেছে।
কিন্তু গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ এই অবস্থানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে বেছে নিতে হয়, তখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক আরোপের সময়। ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর ওপর চাপ তৈরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নেয়। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফাটল ধরতেই দিল্লির মস্কো-সম্পর্ক ওয়াশিংটনের তীক্ষ্ণ নজরে পড়ে।
ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের শিকড় আছে স্নায়ু যুদ্ধকালের জোট নিরপেক্ষতার ধারণায়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ঔপনিবেশিকতার ক্ষত ভারতকে এমন কোনো জালে জড়াতে দেয়নি, যা দেশটির স্বাধীনতা বা নীতিগত স্বায়ত্তশাসনকে বিপন্ন করতে পারে। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারত তখন নিরপেক্ষ পথ বেছে নেয়। এর মূল চেতনা ছিল স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখা, কিন্তু কারও অধীন না হওয়া। আজকের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নমনীয়তা ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক বিকল্প ধরে রাখার বাসনা।
স্নায়ুযুদ্ধ যুগের নিরপেক্ষতার নীতি কাগজে যতই চকচকে দেখাক, বাস্তবে তা সব সময় টেকেনি। ভারতের ওপর যখনই অস্তিত্বগত সংকট নেমে এসেছে, কৌশলগত নমনীয়তা দ্রুত ক্ষয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি বাধ্য হয়েছে দুই পরাশক্তির একটির শরণাপন্ন হতে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের তীব্রতম মুহূর্তে নয়াদিল্লি যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সমন্বয়ের কথা ভাবছিল, তখনই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালেও একই দৃশ্য। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে ভারত। কারণ, তখন ইসলামাবাদ হাত মিলিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে।
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বাস্তবতা ভারতকে নিরপেক্ষতার নীতি ছাড়তে বাধ্য করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর নয়াদিল্লি বুঝতে পারে, হারিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ বাজার আর পণ্যবিনিময়ের বিশেষ সুবিধা। তাই বৈদেশিক সম্পর্ক নতুন করে সাজানো ছাড়া উপায় ছিল না। এই পরিস্থিতিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের নতুন ঘনিষ্ঠতার পথ খুলে দেয়। তবে একই সঙ্গে ভারত বহুমুখী বা সর্বমুখী কূটনীতির নীতি বজায় রাখে। বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এক মেরু বিশ্বব্যবস্থা ম্লান হয়ে বহু-মেরু প্রতিযোগিতা ফিরে আসায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে, তা ভারতের জন্য আরও সক্রিয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় প্রযুক্তি-উদ্ভাবন অংশীদারত্বের ঘোষণা দেখায় যে নয়াদিল্লির লক্ষ্য হলো—গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা, পশ্চিমের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়া এবং দুই পক্ষের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করা। মোদি সরকার ভারতকে ‘বিশ্বমিত্র’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। তবে বিশ্বমিত্র হওয়া আর বিশ্বকে একে অপরের বন্ধু বানাতে সাহায্য করা—দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখলেও সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনে নয়াদিল্লির সক্রিয় ভূমিকা ছিল সীমিত। অথচ কাতার, তুরস্ক, ব্রাজিল, এমনকি চীনও যে ভূমিকা নিয়েছে, ভারত সেই জায়গা থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ভূমিকা নিলে তা ভারতের ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গেই মানানসই হতো। কারণ, তখন ভারত আজকের তুলনায় অনেক দুর্বল দেশ হয়েও মধ্যস্থতায় ছিল বেশ সক্রিয়। পঞ্চাশের দশকে কোরীয় যুদ্ধ থেকে তাইওয়ান প্রণালির সংকট—বহু আন্তর্জাতিক বিরোধে ভারতের কণ্ঠ ছিল বিশেষভাবে প্রভাবশালী।
ভারত বরং দূরেই থাকতে চেয়েছে। এর প্রমাণ মিলেছে নীরব এক অক্টোবরে। এই সময়ে মোদি দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যাননি—শারম আল শেখে গাজা শান্তি সম্মেলন এবং কুয়ালালামপুরে পূর্ব এশিয়া সম্মেলন। দুটিতেই আমন্ত্রণ ছিল, তবু তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) যেগুলোকে ভারত তার ‘বর্ধিত প্রতিবেশ’ বলে মনে করে, সেখানে এমন দুটি বৈঠকের আয়োজন ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির দূরত্ব ও দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানই এখানে দেখাচ্ছে একপ্রকার সক্রিয় কূটনীতির পাঠ। ইসলামাবাদও নিজস্ব ধরনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চর্চা করছে; চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান আর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক জোরদার করছে। নয়াদিল্লি যেখানে ভূরাজনীতির জ্বলন্ত ইস্যুগুলো থেকে দূরে থাকতে চায়, সেখানে ইসলামাবাদ বরাবরই সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ষাটের দশকের শেষভাগে চীন-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতার মধ্যস্থতা থেকে শুরু করে আশির দশকে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া, দুই হাজারের দশকে সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ, আর সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় অবদান—সবকিছুই সেই প্রবণতার অংশ।
পাকিস্তান কতটা টেকসইভাবে এই পথ ধরে এগোতে পারবে, সেটি অবশ্যই আলাদা প্রশ্ন। কারণ, দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ভেতরেই রয়েছে বহু বৈপরীত্য। যেমন চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকেও একসঙ্গে বন্দর প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আর সীমান্তের টানাপোড়েনে জর্জরিত অবস্থায় ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে কীভাবে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে, সেটাও অজানা। তবুও, সক্রিয় ও উদ্যোগী কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলতে কী বোঝায়, তার একটি উদাহরণ ইসলামাবাদ দিয়েছে—যা নয়াদিল্লিতে সচরাচর দেখা যায় না।
বাড়তে থাকা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে ভারতকে নতুনভাবে ভাবতে হবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে। এ বছর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের শীতলতা দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে ভারতের মর্যাদা কোনোভাবেই নিশ্চিত নয়। দীর্ঘদিন যেসব সিদ্ধান্ত নিতে ভারত অনীহা দেখিয়েছে, এখন ক্রমাগত চাপ বাড়ছে সেসব বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেকে আরও অপরিহার্য করে তুলতে পারলেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রোষ অথবা অন্য যেকোনো দেশের খামখেয়ালি আচরণ থেকে বেশি সুরক্ষিত থাকবে। কপ-৩০ এবং সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনসহ বৈশ্বিক পরিসরে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুপস্থিত কিংবা কখনো-সখনো অস্থিতিশীল ভূমিকা নেতৃত্বহীনতার এক শূন্যতা তৈরি করেছে। ভারত চাইলে ঠিক এই মুহূর্তটিই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হয়ে উঠতে পারে।
ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বকীয় পথের সন্ধান করছে, তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হলো, স্বল্প বিরতিতে চীন, রাশিয়া এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের দেশটিতে আতিথেয়তা দেওয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ডিসেম্বরেই ভারতে আসার কথা। ইউক্রেন আক্রমণের পর এটি হবে তাঁর প্রথম ভারত সফর। আগামী বছর ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করছে ভারত, সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের উপস্থিতিও প্রায় নিশ্চিত। এ বছরের কোয়াড সম্মেলন—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও সদস্য—এ মাসেই ভারতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেওয়ায় তা পিছিয়ে গেছে। নতুন তারিখ ঠিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারতে আসতে পারেন।
কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা দেশগুলো বা রাশিয়ান জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো একই মাত্রার শাস্তি পায়নি। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চীনকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, আর মার্কিন মিত্র হওয়ায় জাপান-তুরস্কও রেহাই পেয়েছে। এই বৈষম্য দেখায় যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতের নিজস্ব কৌশলগত অপরিহার্য অবস্থান এখনো দুর্বল। ভারতের জন্য প্রধান শিক্ষা হলো—আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতিকে আরও উদ্যোগী ও দৃঢ় রূপে গড়ে তোলা।
২০২৫ সালটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য ২০১৪ সালের ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক বছর হয়ে উঠেছে। এপ্রিলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর মে মাসে চার দিনের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত শুরু হয়। সময়ের দিক থেকে ছোট হলেও, গত কয়েক দশকের সবচেয়ে তীব্র মুখোমুখি অবস্থান ছিল এটি।
এই সংঘাত থেকেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতাতেই দুই দেশের সংঘাত থেমেছে। দিল্লি এই দাবি অস্বীকার করে, কিন্তু ইসলামাবাদ তা আগ্রহ নিয়ে প্রচার করতে থাকে। পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করে তোলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। সংঘাতের পরপরই পাকিস্তান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে দুই দফা হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হয়। জুনে মোদি ও ট্রাম্পের ফোনালাপে ট্রাম্প নাকি মোদি ও মুনিরকে একসঙ্গে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব দেন। কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বরাবরই না মানার নীতি অনুসরণ করে মোদি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে স্পষ্ট শীতলতা নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে গিয়ে দুজন আবার কথা বলার আগপর্যন্ত তাঁরা আর যোগাযোগ করেননি।
মাঝখানের সময়টায় দুই দেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি দেখা দেয়। আগস্টে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করতে না পারা, তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বোচ্চ শুল্কের ধাক্কা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তিক্ত হয়ে ওঠে। ট্রাম্প ভারতের অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে কটাক্ষ করেন, দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা সামান্যই। তার সঙ্গে যোগ হয় তাঁর বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারোর তীক্ষ্ণ মন্তব্য—ভারত নাকি ‘ক্রেমলিনের লন্ড্রি।’ এসব মন্তব্য দুই দেশের আস্থার ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়।
সাম্প্রতিক কালে দুই নেতার শান্ত সুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তেজনা হয়তো কমছে, আর শেষমেশ একটি বাণিজ্যচুক্তিও হতে পারে। তবু দিল্লির আগের অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে ভারতীয়দের যে প্রবল আশাবাদ ছিল, তা আজ আর নেই। একই সঙ্গে মিলিয়ে গেছে সেই দাবি যে নরেন্দ্র মোদি ও ট্রাম্প নাকি বিশেষ কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কে আবদ্ধ। মোদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির গর্ব করেছেন, যেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক নীতির সামনে তা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
আরও গভীরে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর সংকটগুলোই উন্মোচন করে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত বহুদিন ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের যে নীতি ধরে রেখেছে, তা যেমন আশীর্বাদ, তেমনি দায়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে, এর কারণে ভারতের হাতে রয়েছে নানা কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর যখন চীন-ভারত সম্পর্ক তলানিতে যায়, তখনই এই নমনীয়তার ফল দেখা যায়। দিল্লি তখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করে, বিশেষ করে কোয়াড কাঠামোয় ভারতের অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ানো হয়—তা তার স্পষ্ট উদাহরণ।
এমন বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জন্য একটি পরিষ্কার সুবিধা এনে দেয়—কোনো এক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। ২০২৪ সালের মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের উচিত প্রশংসিত হওয়া। কারণ, দেশটি পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বহু বিকল্প’ পথ ধরে রেখেছে।
কিন্তু গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ এই অবস্থানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে বেছে নিতে হয়, তখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক আরোপের সময়। ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর ওপর চাপ তৈরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নেয়। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফাটল ধরতেই দিল্লির মস্কো-সম্পর্ক ওয়াশিংটনের তীক্ষ্ণ নজরে পড়ে।
ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের শিকড় আছে স্নায়ু যুদ্ধকালের জোট নিরপেক্ষতার ধারণায়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ঔপনিবেশিকতার ক্ষত ভারতকে এমন কোনো জালে জড়াতে দেয়নি, যা দেশটির স্বাধীনতা বা নীতিগত স্বায়ত্তশাসনকে বিপন্ন করতে পারে। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারত তখন নিরপেক্ষ পথ বেছে নেয়। এর মূল চেতনা ছিল স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখা, কিন্তু কারও অধীন না হওয়া। আজকের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নমনীয়তা ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক বিকল্প ধরে রাখার বাসনা।
স্নায়ুযুদ্ধ যুগের নিরপেক্ষতার নীতি কাগজে যতই চকচকে দেখাক, বাস্তবে তা সব সময় টেকেনি। ভারতের ওপর যখনই অস্তিত্বগত সংকট নেমে এসেছে, কৌশলগত নমনীয়তা দ্রুত ক্ষয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি বাধ্য হয়েছে দুই পরাশক্তির একটির শরণাপন্ন হতে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের তীব্রতম মুহূর্তে নয়াদিল্লি যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সমন্বয়ের কথা ভাবছিল, তখনই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালেও একই দৃশ্য। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে ভারত। কারণ, তখন ইসলামাবাদ হাত মিলিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে।
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বাস্তবতা ভারতকে নিরপেক্ষতার নীতি ছাড়তে বাধ্য করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর নয়াদিল্লি বুঝতে পারে, হারিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ বাজার আর পণ্যবিনিময়ের বিশেষ সুবিধা। তাই বৈদেশিক সম্পর্ক নতুন করে সাজানো ছাড়া উপায় ছিল না। এই পরিস্থিতিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের নতুন ঘনিষ্ঠতার পথ খুলে দেয়। তবে একই সঙ্গে ভারত বহুমুখী বা সর্বমুখী কূটনীতির নীতি বজায় রাখে। বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এক মেরু বিশ্বব্যবস্থা ম্লান হয়ে বহু-মেরু প্রতিযোগিতা ফিরে আসায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে, তা ভারতের জন্য আরও সক্রিয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় প্রযুক্তি-উদ্ভাবন অংশীদারত্বের ঘোষণা দেখায় যে নয়াদিল্লির লক্ষ্য হলো—গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা, পশ্চিমের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়া এবং দুই পক্ষের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করা। মোদি সরকার ভারতকে ‘বিশ্বমিত্র’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। তবে বিশ্বমিত্র হওয়া আর বিশ্বকে একে অপরের বন্ধু বানাতে সাহায্য করা—দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখলেও সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনে নয়াদিল্লির সক্রিয় ভূমিকা ছিল সীমিত। অথচ কাতার, তুরস্ক, ব্রাজিল, এমনকি চীনও যে ভূমিকা নিয়েছে, ভারত সেই জায়গা থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ভূমিকা নিলে তা ভারতের ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গেই মানানসই হতো। কারণ, তখন ভারত আজকের তুলনায় অনেক দুর্বল দেশ হয়েও মধ্যস্থতায় ছিল বেশ সক্রিয়। পঞ্চাশের দশকে কোরীয় যুদ্ধ থেকে তাইওয়ান প্রণালির সংকট—বহু আন্তর্জাতিক বিরোধে ভারতের কণ্ঠ ছিল বিশেষভাবে প্রভাবশালী।
ভারত বরং দূরেই থাকতে চেয়েছে। এর প্রমাণ মিলেছে নীরব এক অক্টোবরে। এই সময়ে মোদি দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যাননি—শারম আল শেখে গাজা শান্তি সম্মেলন এবং কুয়ালালামপুরে পূর্ব এশিয়া সম্মেলন। দুটিতেই আমন্ত্রণ ছিল, তবু তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) যেগুলোকে ভারত তার ‘বর্ধিত প্রতিবেশ’ বলে মনে করে, সেখানে এমন দুটি বৈঠকের আয়োজন ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির দূরত্ব ও দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানই এখানে দেখাচ্ছে একপ্রকার সক্রিয় কূটনীতির পাঠ। ইসলামাবাদও নিজস্ব ধরনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চর্চা করছে; চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান আর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক জোরদার করছে। নয়াদিল্লি যেখানে ভূরাজনীতির জ্বলন্ত ইস্যুগুলো থেকে দূরে থাকতে চায়, সেখানে ইসলামাবাদ বরাবরই সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ষাটের দশকের শেষভাগে চীন-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতার মধ্যস্থতা থেকে শুরু করে আশির দশকে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া, দুই হাজারের দশকে সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ, আর সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় অবদান—সবকিছুই সেই প্রবণতার অংশ।
পাকিস্তান কতটা টেকসইভাবে এই পথ ধরে এগোতে পারবে, সেটি অবশ্যই আলাদা প্রশ্ন। কারণ, দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ভেতরেই রয়েছে বহু বৈপরীত্য। যেমন চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকেও একসঙ্গে বন্দর প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আর সীমান্তের টানাপোড়েনে জর্জরিত অবস্থায় ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে কীভাবে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে, সেটাও অজানা। তবুও, সক্রিয় ও উদ্যোগী কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলতে কী বোঝায়, তার একটি উদাহরণ ইসলামাবাদ দিয়েছে—যা নয়াদিল্লিতে সচরাচর দেখা যায় না।
বাড়তে থাকা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে ভারতকে নতুনভাবে ভাবতে হবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে। এ বছর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের শীতলতা দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে ভারতের মর্যাদা কোনোভাবেই নিশ্চিত নয়। দীর্ঘদিন যেসব সিদ্ধান্ত নিতে ভারত অনীহা দেখিয়েছে, এখন ক্রমাগত চাপ বাড়ছে সেসব বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেকে আরও অপরিহার্য করে তুলতে পারলেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রোষ অথবা অন্য যেকোনো দেশের খামখেয়ালি আচরণ থেকে বেশি সুরক্ষিত থাকবে। কপ-৩০ এবং সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনসহ বৈশ্বিক পরিসরে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুপস্থিত কিংবা কখনো-সখনো অস্থিতিশীল ভূমিকা নেতৃত্বহীনতার এক শূন্যতা তৈরি করেছে। ভারত চাইলে ঠিক এই মুহূর্তটিই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হয়ে উঠতে পারে।
ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদি দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা মিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশই নিজেকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয় না।
০৮ অক্টোবর ২০২৫
২১ নভেম্বর দুবাই এয়ার শোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান (এলসিএ) তেজস এমকে-১-এর দুর্ঘটনার পর থেকেই এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এই ঘটনা ঘটতে দেখে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড...
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর ভারত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
তাঁদের নামোল্লেখ ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সংক্রান্ত বোঝাপড়ার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। দুজনের নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে সমান গুরুত্ব দে
১ দিন আগে