Ajker Patrika

ইসলামে আত্মহত্যার ভয়াবহ শাস্তি

মুনীরুল ইসলাম
আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২৩: ৩২
ইসলামে আত্মহত্যার ভয়াবহ শাস্তি

আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। সারা বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে আত্মহত্যা করে। সে হিসাবে প্রতিদিন দুই সহস্রাধিক এবং প্রতি বছর আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধের লক্ষ্যে এ গবেষণা জরিপ চালানো হয়। ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা আত্মহননের পথ বেছে নেয়, তাদের ৭৫ শতাংশই স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশ কয়েকটি দেশে এ প্রবণতা কম বলে গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। আত্মহত্যার কারণ একেক দেশে একেক রকম এবং তা সেই দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীতে বিভিন্ন বয়সের মানুষ আত্মহত্যা করে। তবে দেখা গেছে, যাদের বয়স ৭০ বছর কিংবা তার বেশি, তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আর ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার সংখ্যা বিশ্বে বেশি। আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। এ জন্য লেখালেখি, সভা-সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একজন মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে আত্মহত্যার মতো মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। 

আত্মহত্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন, সাংসারিক দ্বন্দ্ব-কলহে পড়ে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া, নিজের কাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু লাভ করতে গিয়ে নিরাশ বা বঞ্চিত হওয়া। লজ্জার ও মানহানিকর কোনো কিছু ঘটে যাওয়া বা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকাশ হওয়া, অভাব, দারিদ্র্যের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার অসুখ-বিসুখে জর্জরিত হওয়া প্রভৃতি। আবার নারীদের মধ্যেই আত্মহত্যার হার বেশি। 

ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ। শিরকের পর সবচেয়ে বড় গুনাহ। সকল উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতেই আত্মহত্যা হারাম। কারণ, আল্লাহ তাআলা মানুষকে মরণশীল হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন। সব শ্রেণির মানুষকেই একদিন মরতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তার পর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৫৭) 

মানুষের এই শরীর-প্রাণ আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে আমানতস্বরূপ। এই শরীর-প্রাণ নিয়ে মানুষের যেমন খুশি তেমন ব্যবহারের অধিকার নেই। একমাত্র আল্লাহই মানুষের জীবন-মৃত্যু দানকারী। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান, আর তাঁর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫৬) 

সুতরাং বোঝা গেল, মানুষের মৃত্যু ঘটানোর কাজটি একমাত্র আল্লাহর। কেউ যদি নিজেই নিজের মৃত্যু ঘটায়, তবে সে অনধিকার চর্চাই করবে। আল্লাহ তা পছন্দ করেন না। ইসলামে তাই আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলে গণ্য করা হয়েছে। এ কাজ থেকে বিরত থাকতে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরিণাম ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির বর্ণনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। যে কেউ জুলুম করে অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্যই আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করব, আল্লাহর পক্ষে তা সহজসাধ্য।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯-৩০) এই আয়াতের এক তাফসির অনুযায়ী এখানে আত্মহত্যার কথাই বোঝানো হয়েছে। হাদিস গ্রন্থগুলোতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আত্মহত্যার বেশ কয়েকটি হাদিস এসেছে। (ইবনে কাসির, সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসির)

অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজ হাতে নিজদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫) 

ধৈর্যহারা হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ বিপদে-আপদে ধৈর্যহারা হবে না। ইমানদার চরম বিপদেও আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। কোনোভাবেই নিরাশায় হাবুডুবু খেয়ে এ মহাপাপের পথ বেছে নেবে না। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ যাবতীয় অপরাধ মার্জনা করেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩) 

আত্মহত্যা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে গেছেন। হজরত জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, একজন ব্যক্তি জখম হলে, সে (অধৈর্য হয়ে) আত্মহত্যা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার নির্ধারিত সময়ের আগেই নিজের জীবনের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (বুখারি, হাদিস: ১২৭৫) 

যে ব্যক্তি যেভাবে আত্মহত্যা করবে, পরকালে আল্লাহ তাকে সেভাবে শাস্তি দেবেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে অনুরূপভাবে (পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে পড়ে) আত্মহত্যা করতে থাকবে। এটা হবে তার স্থায়ী বাসস্থান। যে ব্যক্তি বিষ পানে আত্মহত্যা করবে, বিষ তার হাতে থাকবে, জাহান্নামে সে সারাক্ষণ বিষ পান করে আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর এটা হবে তার স্থায়ী বাসস্থান। আর যে ব্যক্তি লৌহাস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সেই লৌহাস্ত্রই তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সে তা নিজ পেটে ঢোকাতে থাকবে, আর সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৩৩৩, মুসলিম, হাদিস: ১২৭৬) 

হজরত জাবের বিন সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলো, যে লোহার ফলা দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, ফলে তিনি তার জানাজার নামাজ আদায় করেননি।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৬২৪) তবে ইসলামি আইনবিদেরা বলেন, আত্মহত্যাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য মহানবী (সা.) এমনটি করেছেন। অর্থাৎ, সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ও ধর্মনেতারা জানাজায় অংশ না নিলেও সাধারণ মানুষ তার জানাজা ও কাফন-দাফন সম্পন্ন করবে। 

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে অনুমান করা যায়, আত্মহত্যা করা কত বড় পাপ এবং আত্মহত্যাকারী কত জঘন্য পাপী। যার শাস্তি হলো জাহান্নাম। আত্মহত্যা ইহকাল-পরকাল উভয়টি ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ সবাইকে এই মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন। 

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

হালাল রোজগার: দুনিয়া-আখিরাতের সাফল্যের নিশ্চয়তা

ইসলাম ডেস্ক 
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১০: ১২
পবিত্র কোরআন। ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র কোরআন। ছবি: সংগৃহীত

হালাল উপার্জন মুমিনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। এ ছাড়া অন্যান্য ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্তও এটি। হালালকে গ্রহণ ও হারামকে বর্জনের মাধ্যমেই একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে হালাল উপার্জনের বিষয়ে বিভিন্ন স্থানে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মানব জাতি, তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা: ১৬৮)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, ‘নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে।’ (সুরা জুমুআ: ১০)

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে দেহের গোশত হারাম খাদ্যে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম খাদ্যে গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামই সমীচীন।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৭৭২)। অন্য হাদিসে আরও এসেছে, ‘হারাম দিয়ে পরিপুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৭৮৭)

নিজ হাতে উপার্জনের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।’ (সহিহ্ বুখারি: ২০৭২)

হালাল উপার্জনের জন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা মুমিনের অন্যতম গুণ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর ওপরই ভরসা করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা মায়িদা: ২৩)। তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করবেন।’ (সুরা তালাক: ৩)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২৯ নভেম্বর ২০২৫

ইসলাম ডেস্ক 
আজকের নামাজের সময়সূচি। ছবি: সংগৃহীত
আজকের নামাজের সময়সূচি। ছবি: সংগৃহীত

জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে এবং আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে নামাজের কোনো বিকল্প নেই। একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যম। এটি এমন এক ইবাদত—যা আমাদের মনে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি আনে, জীবনের প্রতিটি কাজে আনে বরকত।

প্রতিদিন সময় মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর আবশ্যক। তাই জেনে নেওয়া যাক আজ কোন ওয়াক্তের নামাজ কখন আদায় করতে হবে।

আজ শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ইংরেজি, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বাংলা, ০৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৭ হিজরি। ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো—

আজকের নামাজের সময়সূচি
নামাজ ওয়াক্ত শুরুওয়াক্ত শেষ
তাহাজ্জুদ ও সেহরির শেষ সময়০০: ০০০৫: ০২ মিনিট
ফজর০৫: ০৩ মিনিট০৬: ২১ মিনিট
জোহর১১: ৪৮ মিনিট০৩: ৩৪ মিনিট
আসর০৩: ৩৫ মিনিট০৫: ১০ মিনিট
মাগরিব০৫: ১২ মিনিট০৬: ২৯ মিনিট
এশা০৬: ৩০ মিনিট০৫: ০২ মিনিট

উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগের সময় যোগ-বিয়োগ করতে হবে, সেগুলো হলো:

বিয়োগ করতে হবে—
চট্টগ্রাম: ০৫ মিনিট
সিলেট: ০৬ মিনিট

যোগ করতে হবে—
খুলনা: ০৩ মিনিট
রাজশাহী: ০৭ মিনিট
রংপুর: ০৮ মিনিট
বরিশাল: ০১ মিনিট

নামাজ আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যেমন আমাদের দৈহিক পবিত্রতা নিশ্চিত করে, তেমনই আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। আজকের এই নামাজের সময়সূচি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের ব্যস্ততা যতই থাকুক না কেন, আল্লাহর জন্য সময় বের করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব।

আসুন, নামাজের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে তাঁর আরও কাছে নিয়ে যাই। জীবনে নিয়ে আসি ইমানের নুর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

টঙ্গীতে শুরু হয়েছে তাবলিগ জামাতের জোড় ইজতেমা

ইসলাম ডেস্ক 
পাঁচ দিনের ‘জোড়’ ইজতেমায় আসা মুসল্লিরা । ছবি: আজকের পত্রিকা
পাঁচ দিনের ‘জোড়’ ইজতেমায় আসা মুসল্লিরা । ছবি: আজকের পত্রিকা

গাজীপুরের টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আজ শুক্রবার ফজরের পর মাওলানা ওমর ফারুকের আমবয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ি নেজামের আয়োজনে পাঁচ দিনের জোড়। আগামী ২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এই জোড় ইজতেমার সমাপ্তি হবে।

বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের শুরায়ি নেজামের গণমাধ্যম সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান।

হাবিবুল্লাহ রায়হান জানান, প্রতিবছর ইজতেমার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এই জোড় অনুষ্ঠিত হয়। এখানে তাবলিগের সাথিরা পুরো বছরের কাজের কারগুজারি পেশ করেন এবং মুরব্বিদের থেকে রাহবারি নেওয়ার সুযোগ পান। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের শুরায়ি নেজামের প্রবীণ মুরব্বিরা ইতিমধ্যে টঙ্গীতে সমবেত হয়েছেন।

হাবিবুল্লাহ রায়হান আরও বলেন, ‘পাঁচ দিনের জোড় তাবলিগ জামাতের সোনালি ঐতিহ্য। দাওয়াতের কাজের চেতনার স্পন্দন জাগানো একটি বিশেষ আয়োজন। এখান থেকেই সারা বছরের কাজের সঠিক নকশা ও দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়। দায়িদের আমল, দাওয়াত, তরতিব এবং দেশের প্রেক্ষাপটে করণীয়-নিষ্করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান উপস্থাপন করেন বড়রা; যা একজন সাথির দুনিয়া ও আখেরাতের জিন্দেগি পরিচালনায় দিশা দেয়।’

তিনি আরও জানান, জোড় ইজতেমায় কেবল তিন চিল্লার সাথি এবং কমপক্ষে এক চিল্লা সময় লাগানো আলেমরা অংশ নিতে পারেন। এতে জোড়ের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও গুরুত্ব বজায় থাকে।

হাবিবুল্লাহ রায়হান বলেন, একসময় পাঁচ দিনের জোড়ে বয়ান করতেন মাওলানা সাইদ আহমদ খান পালনপুরি (রহ.), মিয়াজি মেহরাব, মাওলানা উমর পালনপুরি (রহ.), মাওলানা ওবাইদুল্লাহ বালিয়াভি (রহ.), কারি জহির (রহ.)-সহ বহু মনীষী। এখনো প্রতিবছর হিন্দুস্তান, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবীণ আলেম ও মাওলানা ইউসুফ (রহ.) ও মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.)-এর সোহবতপ্রাপ্ত মুরব্বিরা এসে বয়ান করেন।

পাঁচ দিনব্যাপী এই জোড় থেকে তাবলিগের সাথিরা সারা বছরের দাওয়াতি কাজের পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় রাহবারি (দিকনির্দেশনা) লাভ করবেন বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

আল্লাহর প্রতি ইমান ও মুমিনের মৃত্যুর প্রস্তুতি

কাউসার লাবীব
আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ১৩: ৪১
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি ইমান। ইমান হলো এমন বিশ্বাস, যা মুসলমানদের জীবন পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি এবং পরকালীন নাজাতের পূর্বশর্ত। ইমানের মাধ্যমেই একজন মানুষ জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য—মৃত্যু এবং তার পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়।

আল্লাহর প্রতি ইমানের মর্মকথা

আল্লাহর প্রতি ইমান হলো এই মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে তিনিই অনাদি ও অনন্তকাল ধরে আছেন এবং থাকবেন। তিনিই বিশ্বজগতের স্রষ্টা, মালিক, প্রতিপালক ও শাসন পরিচালনাকারী, যাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি যাবতীয় ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত এবং সদগুণাবলির অধিকারী।

আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি ইমান কোনো অলীক ধারণা নয়; এর পক্ষে অসংখ্য দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ এবং এর নিখুঁত পরিচালনা পদ্ধতি তাঁর অস্তিত্বের এক বড় প্রমাণ। যেহেতু স্রষ্টা ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্বে আসা সম্ভব নয়, তাই এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও পরিচালনার পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক রয়েছেন—এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট।

খাঁটি ইমান হলো হৃদয়ের প্রশান্তি ও মুক্তির আলোকবর্তিকা। আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ছাড়া আত্মার প্রশান্তি অর্জন অসম্ভব। এই ইমানের অন্তর্ভুক্ত হলো—এক. আল্লাহই সবকিছুর প্রতিপালক, মালিক ও স্রষ্টা। দুই. নামাজ, রোজা, চাওয়া-পাওয়া, আশা-ভরসাসহ সকল ইবাদতের একক হকদার কেবল তিনিই। তিন. ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবী-রাসুল, পরকাল ও তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।

মানুষের অনিবার্য গন্তব্য: মৃত্যু

জীবন হলো একটা নির্দিষ্ট সময়ের সমষ্টি। প্রতিনিয়ত আমাদের হায়াতের দিনগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আলোর গতিতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছি। দুনিয়ার রং-রসে মেতে মৃত্যুকে হয়তো ভুলে থাকা যায়, কিন্তু মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচা যায় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বলে দাও, নিশ্চয়ই যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের কাছে উপস্থিত হবে। অতঃপর তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে সেই সত্তার কাছে, যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু সম্পর্কে অবগত। অতঃপর তিনি তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন।’ (সুরা জুমুআ: ৮)

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং এর সময় নির্ধারিত। যখন নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও বিলম্ব বা ত্বরান্বিত করা যাবে না। আমরা দুনিয়ার সবকিছুর জন্যই প্রস্তুতি নিই—চাকরি, বিয়ে, ক্যারিয়ার—কিন্তু প্রস্তুতির ক্ষেত্রে উদাসীন থাকি কেবল মৃত্যুর জন্য! অথচ একজন বুদ্ধিমান মুমিনের উচিত মৃত্যু আসার আগেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘যখন সন্ধ্যা উপনীত হয়, তখন সকালের জন্য অপেক্ষা কোরো না। আর সকাল উপনীত হলে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষায় থেকো না। তোমার সুস্থতা থেকে কিছু সময় তোমার অসুস্থতার জন্য বরাদ্দ রাখো এবং সময় থাকতে মৃত্যুর জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪১৬)

মৃত্যুর প্রস্তুতি ও করণীয়

একজন মুমিনের উচিত মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা। এর ফলে দুনিয়ার প্রতি আসক্তি দূর হয়, ইমান বৃদ্ধি পায় এবং পরকালের জন্য পাথেয় খুঁজতে সাহায্য করে। এ ছাড়া মৃত্যুর প্রস্তুতির জন্য করণীয় হলো—

১. খাঁটি তাওবা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা: নিয়মিত খাঁটি তাওবা করা এবং আল্লাহ ও বান্দার হক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা। যত ছোটই হোক না কেন, সব রকমের গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করা।

২. ফরজ ইবাদত আদায়: সময়মতো ও মনোযোগের সঙ্গে নামাজ আদায় করা। কিয়ামতের দিন প্রথম যে বিষয়ে হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো নামাজ। হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল রিজিক গ্রহণ নিশ্চিত করা।

৩. মানুষের হক আদায়: জুলুম বা অন্যের অধিকার নষ্ট করে ইন্তেকাল না করার জন্য জীবদ্দশায় মানুষের পাওনা থাকলে তা আদায় করা বা আদায়ের ব্যবস্থা রাখা।

৪. নেক আমলে জীবন সাজানো: বেশি বেশি নেক আমল করা ও ইবাদতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সুস্থ ও জীবিতাবস্থায় দান-সদকা করা (যা মৃত্যুর পরও সওয়াব বয়ে আনবে)।

৫. অসিয়ত লিখে রাখা: নিজের সম্পদের সুষম বণ্টন, ঋণ পরিশোধ এবং পরিপূর্ণ সুন্নত পদ্ধতিতে দাফনের জন্য অসিয়ত লিখে রাখা।

৬. আল্লাহর রহমতের আশা: মৃত্যুকালীন অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা এবং আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ পোষণ করা। বিপদে বা কষ্টে কোনো অবস্থাতেই মৃত্যু কামনা না করা।

৭. ইমানের ওপর অটল থাকার দোয়া: ইমানের ওপর অটল থাকতে নির্জনে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা। সুরা আলে ইমরানে বর্ণিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা যেতে পারে—‘রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা-দা ইজ হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব।’ অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি যখন আমাদের সৎপথ দেখিয়েছ, এরপর আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দিয়ো না। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের দান করো রহমত। নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা।’

মৃত্যু অনিবার্য এবং তার সময় শুধু আল্লাহই জানেন। মুমিনের উচিত হলো দুনিয়ার সফলতার চেষ্টা করা, তবে কখনোই তা আখিরাতকে নষ্ট করে নয়। আল্লাহর স্মরণে হৃদয়ের বিগলিত হওয়া মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আল্লাহ যেন আমাদের প্রত্যেককে সুন্দর মৃত্যু নসিব করেন এবং বলেন, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো তোমার প্রতিপালকের দিকে—তুমি সন্তুষ্ট, তিনিও সন্তুষ্ট। প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ (সুরা ফজর: ২৭-৩০)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত