Ajker Patrika

চিকিৎসা ছাড়াই মারা যায় অর্ধেকের বেশি

আজাদুল আদনান, ঢাকা
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২১, ০৯: ২০
চিকিৎসা ছাড়াই মারা যায় অর্ধেকের বেশি

প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে চার দিনের শিশু শরিফ হোসাইনকে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা যায় শরিফ নিউমোনিয়া আক্রান্ত। কিন্তু ঠিক সময়ে হাসপাতাল আনতে না পারায় শারীরিক অবস্থা অবনতি হতে থাকে। উপজেলা পর্যায়ে নিউমোনিয়ার সুচিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে গত ৯ নভেম্বর রাজধানীর শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। কিন্তু অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল, হাসপাতালে ভর্তির পরও বাঁচানো যায়নি শরিফকে।

শুধু শরিফ নয় দেশে নিউমোনিয়া আক্রান্ত অর্ধেকের বেশি শিশুর মৃত্যু হয় চিকিৎসা ছাড়াই। এর অন্যতম কারণ, জেলা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে নিউমোনিয়া রোগী চিকিৎসায় সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। ফলে একদিকে বাড়ছে প্রাণহানি অন্যদিকে জীবন বাঁচাতে ঢাকামুখী হচ্ছে মানুষ।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় বলা হয়, দেশে বিভিন্ন রোগে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু যে হারে মারা যাচ্ছে তার ২৮ শতাংশই নিউমোনিয়ায়। প্রতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ৮০ হাজার শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার মারা যাচ্ছে। অথচ শিশুর সেবা নিশ্চিতে দেশে বিশেষায়িত হাসপাতাল মাত্র একটি। বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটির জরিপ বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর ১০ লাখ শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়। দেশে এই রোগে ৬৭ জন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। যার ৫২ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সঠিক সময় চিকিৎসাকেন্দ্র না আসার কারণে ৪৫ শতাংশ শিশু মারা যায়। ৫০ ভাগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই অক্সিজেন কনসেনট্রেটর। এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেনের অন্যান্য উৎসও অনুপস্থিত। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জেলা হাসপাতালে আছে পালস অক্সিমিটার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৯৫ শতাংশ হাসপাতালে নিউমোনিয়া চিকিৎসার সুব্যবস্থাপনা নেই। যে কারণে ফুসফুস সংক্রমণ দেখা দেওয়ার ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪২ শতাংশ চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেওয়া হয়। অন্য কোনো চিকিৎসা সেবা না থাকায় ৩৪ শতাংশ শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেওয়া হয়।

দেশে প্রতি বছর ২৪ হাজার ৩০০ জন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। যার ৫০ শতাংশ বাড়িতে। এখন পর্যন্ত ৫০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার কারণ জানা যায় না। এ ছাড়া অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া জনিত মৃত্যুর প্রবণতা ১৫ গুণ বেশি।

শিশুদের চিকিৎসায় দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতাল। যেখানে বিভিন্ন অসুখে ভোগা পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে দেড় শর মতো নিউমোনিয়ার। গত নয় দিনে এই হাসপাতালে নিউমোনিয়া আক্রান্ত ২৯ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ শিশু মারা গেছে, যাদের বয়স ৫ বছরের কম। দায়িত্বরত এক নার্স আজকের পত্রিকাকে বলেন, করোনার এই সময়ে শিশুদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের হার বেড়েছে অনেক বেশি। যারা আসছেন বেশির ভাগই ঢাকার বাইরের।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতির (বিপিএ) অধ্যাপক মনজুর হোসেনের মতে, করোনায় নিউমোনিয়া টিকা কার্যক্রম কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে, এই টিকা কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। শিশুর পুষ্টির উন্নীতকরণ কাজ করতে হবে। শিশুদের দুধমাপ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপগুলো নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০২৫ সালের মধ্যে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার হাজারে ৩ জনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার। তবে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই হাসপাতালে নিতে হবে। এতে করে মৃত্যুর হার অনেকাংশেই কমে আসবে। মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে শিশুকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। ছয় মাস পর খাওয়াতে হবে পুষ্টিকর খাবার। এ ছাড়া পরিবেশ দূষণ রোগে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত