Ajker Patrika

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট: সেচে বিধিনিষেধ, চাপে কৃষি

  • নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর
  • তিন জেলার ৪৯১১ মৌজায় খাওয়ার পানি ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় নিষেধাজ্ঞা
  • জেলাগুলো হচ্ছে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ
  • সংকট মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে জোর
  • পানিসাশ্রয়ী ফসলের আবাদ বাড়ানোর তাগিদ
 রিমন রহমান, রাজশাহী
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৭: ২৮
ছবি: আজকের পত্রিকা
ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪ হাজার ৯১১ মৌজায় এখন খাবারের পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা নিষিদ্ধ। সেচ কিংবা শিল্পকারখানার জন্য আর গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা যাবে না। পানিসংকটের বাস্তবতায় ৬ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করে সরকার। এতে হতাশ স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে কৃষকদের সরবরাহ করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। গত মঙ্গলবার সরকারের এ-সংক্রান্ত গেজেট তাদের হাতে পৌঁছায়। এতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরাও অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। বিএমডিএর সেচ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ জিল্লুল বারী জানান, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এভাবে কৃষিকাজ বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এখন এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিষয়। তারা বসে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’

গেজেটে ২৫ উপজেলার ২১৫ ইউনিয়নের বিশাল এলাকাকে আগামী ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা অতি উচ্চ, ৮৮৪টি উচ্চ এবং ১ হাজার ২৪০টি মধ্যম-সংকটাপন্ন। রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, নওগাঁর পোরশা ও সাপাহারের বহু ইউনিয়ন এই সতর্কতার আওতায় পড়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৫-৯০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল ২৬ ফুট নিচে। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় ২০১০ সালে তা নেমে যায় ৫০ ফুটে, ২০২১ সালে ৬০ ফুটে। এখন অনেক জায়গায় পানি পেতে খুঁড়তে হচ্ছে ১১৩ ফুটেরও বেশি। অবিরাম সেচ আর শিল্পের কারণে বরেন্দ্রভূমি যেন অগ্রসর হচ্ছে মরুকরণের পথে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি গেজেটে খাবারের পানি সংগ্রহ ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজনে নতুন করে নলকূপ স্থাপন এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পুরোনো নলকূপ দিয়েও সেচ বা শিল্পের জন্য পানি তোলা যাবে না। ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করা যাবে না।

বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক মো. তরিকুল আলম বলেন, ‘আমরা গেজেট দেখেছি। এর অর্থ হচ্ছে, গভীর নলকূপ দিয়ে এখন থেকে শুধু খাবারের পানি তোলা যাবে, কৃষিতে এ পানি ব্যবহার করা যাবে না। আমরা মাঠপর্যায় থেকে তথ্য নিচ্ছি, এসব এলাকায় গভীর নলকূপের সংখ্যা কত, কী পরিমাণ জমি আছে এবং ফসলের উৎপাদন কেমন হয়। এগুলো নিয়ে উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হবে। তারপরই বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।’

গোদাগাড়ীর চৈতন্যপুরের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘কৃষিকাজ বন্ধ করে বসে থাকা কোনো সমাধান নয়। এটি সম্ভবও নয়।

সমস্যা সমাধানের বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির যে গঠন, তাতে খুব সহজেই ভূ-উপরিস্থ পানির আধার তৈরি করা যাবে। নীতিনির্ধারকদের সে পথেই হাঁটতে হবে।’

৬ নভেম্বরের গেজেটে খাল-বিল-পুকুর ইজারা নিরুৎসাহিত করে অধিক পানি লাগে এমন ফসলের চাষও সীমিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। জনগণের ব্যবহারযোগ্য খাস জলাশয় ও জলমহাল ইজারা দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে। জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না, কোনো জলাধারের সমগ্র পানি আহরণ করে নিঃশেষ করা যাবে না।

সংকট মোকাবিলায় গেজেটে বেশ কিছু সরকারি সংস্থার কিছু কার্যক্রমও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এতে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন শিল্পে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চল এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়া জনপদ। এখানকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হুমকিতে আছে, এটা আরও হুমকিতে পড়ল পানিসংকটের কারণে। এখান থেকে উত্তরণে সরকারকেই পথ বের করতে হবে।’

বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, ‘শুধু খাবারের পানি তোলা যাবে। এতে দেখা যাবে বাড়িতে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে সেচের পানি দেওয়া হবে। এ অবস্থায় সংকট মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানি নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। এ জন্য পদ্মার পানি বরেন্দ্র অঞ্চলে ঢোকাতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো সরকারি পুকুর, খাল-বিল ইজারা দেওয়া যাবে না। এগুলোর পানি কৃষিকাজের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি পানি কম লাগে বা বৃষ্টির পানিতেই চাষাবাদ সম্ভব, এমন ফসলের চাষাবাদের দিকে যেতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...