অনলাইন ডেস্ক
বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমানকে প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের একটি তালিকা দেখিয়েছেন মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শোয়ে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। ২০১৮-২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ছয় দফায় এই প্রাথমিক তালিকা সরবরাহ করেছিল। আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই চলছে।
সরকার বলছে, এটিই প্রথম এমন এক নিশ্চিত তালিকা, যা রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘদিনের সমাধানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। মিয়ানমার আরও নিশ্চিত করেছে, মূল তালিকায় থাকা অবশিষ্ট ৫ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে।
এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত ৩০ দফা ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি সই হয়েছিল। নেপিডোতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে এ চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়। প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে বলে জানায় মিয়ানমার।
কিন্তু ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের আবাস ও জায়গাজমি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। বরং তাদের জন্য আলাদা আশ্রয়শিবির নির্মাণের কথা হয়। ফলে হাতে গোনা কয়েকজন রোহিঙ্গাকে নেওয়া গেলেও নানামুখী আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত চুক্তি ভেস্তে যায়।
গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের অধিকাংশ এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার অনেকখানিই দুর্বল। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়টি এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নেই। খোদ সরকারি কর্মকর্তারাও এই জটিলতার কথা স্বীকার করছেন।
আরাকান এলাকায় এখন পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি, মিয়ানমার সরকার এবং চীন। সেখানে বিশেষ করে খনিজ সম্পদে চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হবে কি না। এটি বুঝতে বৌদ্ধ বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সমান নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এটি বরাবরই তীব্র বিতর্কের বিষয় ছিল। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও তৎপরতা এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।
আরাকান আর্মি মূলত জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা রাখাইনে স্বায়ত্তশাসন বা ‘কনফেডারেট স্ট্যাটাস’–এর জন্য লড়াই করছে। আর রোহিঙ্গারা প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক বেশ জটিল এবং প্রায়শই উত্তেজনাপূর্ণ।
রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে মংডু এবং বুথিডং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর রয়েছে। এসব এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা বসবাস করে। ফলে এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আরাকান আর্মির অবস্থান এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং উত্তেজনা
ঐতিহাসিকভাবে আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গারা কখনো মিত্র ছিল না। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইনে গণহত্যামূলক অভিযান শুরু করে। এতে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই সময়ের আগে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতামূলক একটা সম্পর্ক ছিল। সামরিক জান্তার নিপীড়নের সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগ থাকলেও ন্যূনতম একটা সম্পর্ক তাদের ছিল।
১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকার তাদের ‘বাঙালি’ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। বৌদ্ধ-মুসলিম ঐতিহাসিক বিভেদের কারণে নাগরিকত্ব আইনের পর আরাকান আর্মির প্রতি রোহিঙ্গাদের অবিশ্বাস প্রবল হয়। এমনকি কিছু রোহিঙ্গা ২০১৭ সালের নৃশংসতায় আরাকান আর্মির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে, যদিও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় না।
এ ছাড়া আরাকান আর্মিও জান্তা সরকারের বয়ানেরই প্রতিধ্বনি করেছিল ওই সময়। যেমন ২০১৬ সালের একটি বিজ্ঞপ্তিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ‘নৃশংস বাঙালি মুসলিম সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করে তারা। এই বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের রাখাইনের স্থানীয় হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর অবস্থান
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরাকান আর্মির ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে মিলে অপারেশন ১০২৭–এ অংশগ্রহণের (অক্টোবর ২০২৩–এ শুরু) পর থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের বাসিন্দাদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান নরম করে। সম্ভবত আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং স্থানীয় সমর্থন অর্জনের কৌশল হিসেবেই তারা বয়ান পরিবর্তন করে।
আরাকান আর্মির নেতা মেজর জেনারেল ত্বান ম্রাত নাইং দাবি করেন, তাঁরা ‘রাখাইন রাজ্যের সব বাসিন্দার মানব ও নাগরিক অধিকার’ স্বীকার করেন। ২০২২ সালে এশিয়া টাইমসকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলেছিলেন তিনি। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এই অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করেছে আরাকান আর্মি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে আরাকান আর্মি নাম পরিবর্তন করে। ‘আরাকান আর্মি’ থেকে রাখাইন নাম ‘আরাখা আর্মি’ ধারণ ও প্রচার করে তারা। এটিকে রোহিঙ্গাসহ রাখাইনের সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার অভিপ্রায় হিসেবে ধরা যেতে পারে।
আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২১ সালে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এর উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্য সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। কারণ, ২০২২ সালের একটি সাক্ষাৎকারে ত্বান ম্রাত নাইং ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বেশির ভাগ আরাকানি (রাখাইন) এই শব্দটি প্রত্যাখ্যান করে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এই অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলে মত দেন তিনি।
আরাকান আর্মি পরে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে জান্তার জারি করা বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের বিবৃতির নিন্দা জানায় আরাকান আর্মি। তারা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি দেয়। এতে ধারণা করা যায়, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে গ্রহণ করলেও তাদের স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক পরিচয় স্বীকার করতে বা সমান মর্যাদা দিতে রাজি হবে না, যদি না রোহিঙ্গারা শুধু ‘রাখাইন জনগোষ্ঠী’ হিসেবে নিজেদের আত্মীকরণে রাজি হয়।
বিভ্রান্তিমূলক তৎপরতা
আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। একদিকে, তারা কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে স্পষ্ট শত্রুতামূলক মনোভাব এড়িয়ে চলে। এখন তারা জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনোনিবেশ করেছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ বা আরসা) মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অস্বীকার করে।
২০২০ সালে আরাকান আর্মির চিকিৎসা দল কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে সহায়তা করেছিল। কিছু রোহিঙ্গা নেতা, যেমন ২০২১ সালে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লার লার মিয়া আরাকান আর্মির শাসন সম্পর্কে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন।
অন্যদিকে, আরাকান আর্মির নির্যাতনের কিছু বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন এই সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে বুথিডংয়ে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পোড়ানো এবং নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘ সাক্ষীদের বিবরণে পদ্ধতিগত অগ্নিসংযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের প্রমাণ নথিভুক্ত করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে মংডুতে একটি ড্রোন হামলায় পলায়নরত বেশ কয়েক রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর জন্য আরাকান আর্মিকে দায়ী করে। যদিও আরাকান আর্মি এ বিষয়ে জান্তাকে দায়ী করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ফর্টিফাই রাইটস একইভাবে আরাকান আর্মির যুদ্ধাপরাধের প্রমাণাদি নথিভুক্ত করেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং নির্যাতন। ফলে আরাকান আর্মি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাতে পারে, সে আস্থা দুর্বল হয়েছে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ শুরু করেছে। বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু আরাকান আর্মি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। উল্টো তারা রোহিঙ্গাদের কামানের গোলা বহনকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
এদিকে আরসা এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মতো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে মৈত্রী করেছে। তারা আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। যেমন ২০২৪ সালের এপ্রিলে বুথিডংয়ে রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মি মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছে।
এতে করে জাতিগত বিভেদ আরও গভীর হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছর আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা যুবকদের জোর করে নিয়োগের পর জবাব দিয়েছে। এমনকি আরাকান আর্মি এক্সে পোস্ট করে তারা সেটি জানিয়েছে। এতে পারস্পরিক বিশ্বাস আরও ক্ষুণ্ন হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের গ্রহণের সম্ভাবনা
এরপরও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রহণের সম্ভাবনা একেবারেই নেই বলা যাবে না। তবে আরাকান আর্মির রোহিঙ্গাদের ‘গ্রহণ’ করতে সম্মতি হওয়া কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
১. রাজনৈতিক বাস্তববাদ: রাখাইন নিয়ন্ত্রণে রেখে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গাসহ একটি বহুজাতিগত জনসংখ্যাকে শাসন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে, ফলে রাখাইনের স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখার ইউএলএর প্রশাসনিক প্রচেষ্টা অর্জনের জন্য শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক সিএসআইএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল।
২. আন্তর্জাতিক চাপ: আরাকান আর্মি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি চায়। বিদেশি বিনিয়োগের সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাসে (যেমন চীনের কিয়াউকফিউ বন্দর) সেটি স্পষ্ট। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, ২০২৪ সালে আইসিসি এবং ২৮টি রোহিঙ্গা সংগঠনের নিন্দা তাদের সেই স্বীকৃতি লাভের প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশ থেকে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ফেরত নিলে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তবে তারা শুধু রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা এবং অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু নাগরিক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ অধিকার দিয়ে ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি কখনো দেয়নি।
৩. জাতিগত পরিচয় এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি: আরাকান আর্মির ‘আরাকান স্বপ্ন’ রাখাইন সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেয়। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহারে তাদের অনীহা ও ‘বাঙালি’ বা ‘মুসলিম বাসিন্দা’ শব্দ ব্যবহারে আগ্রহ এবং ত্বান ম্রাত নাইংয়ের বক্তব্য নির্দেশ করে যে তারা প্রশাসনে রোহিঙ্গাদের সমান অংশীদারত্বের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক অধীনতা দাবি করতে পারে। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা ও অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি নয়। এর মাধ্যমে তাদের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্বের প্রতি সীমিত সহনশীলতা প্রকাশ পায়।
৪. বর্তমান মনোভাব: চলতি বছরের প্রথম দিকে এক্সে রাখাইন সংঘাতসংক্রান্ত পোস্টগুলো পরস্পর বিরোধী। কেউ কেউ আরাকান আর্মিকে ইসলামোফোবিয়া এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত করেছে। আবার কেউ বাংলাদেশের সহযোগিতা পাওয়া নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির দ্বন্দ্ব মিটমাট করার কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এমনকি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ চুক্তির কথাও শোনা গেছে। এগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিত্রই উঠে এসেছে।
মোদ্দাকথা হলো, আরাকান আর্মির ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি বা তাদের জাতীয়তাবাদী অবস্থানে পরিবর্তন ছাড়া রোহিঙ্গাদের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে সমান অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসিত রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। অবশ্য আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অধীন বাসিন্দা হিসেবে মেনে নিতে পারে, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন বজায় রাখতে সীমিত অধিকার দিতেও রাজি হতে পারে। রাখাইনে প্রশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরাকান আর্মির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বক্তব্য-বিবৃতির ভঙ্গি তেমনটাই ইঙ্গিত দেয়।
তবে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং শর্তহীনভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা—এসবে স্পষ্ট যে আরাকান আর্মি শাসিত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হবে শর্তাধীন। এর মধ্যে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় বর্জন অন্যতম।
আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড—সামরিক আধিপত্যের সঙ্গে শাসনের ভারসাম্য—শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তারা এই বিভেদের মনোভাব থেকে সরবে, নাকি বর্জনের নীতিতে অবিচল থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি যেটিকে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয়, বাংলাদেশ, জাতিসংঘ বা আরও আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপে তাদের বাধ্য করা ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজেদের বসতভিটায় ফেরার সৌভাগ্য হবে না!
লিখেছেন: জাহাঙ্গীর আলম, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, আজকের পত্রিকা
বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমানকে প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের একটি তালিকা দেখিয়েছেন মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শোয়ে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। ২০১৮-২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ছয় দফায় এই প্রাথমিক তালিকা সরবরাহ করেছিল। আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই চলছে।
সরকার বলছে, এটিই প্রথম এমন এক নিশ্চিত তালিকা, যা রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘদিনের সমাধানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। মিয়ানমার আরও নিশ্চিত করেছে, মূল তালিকায় থাকা অবশিষ্ট ৫ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে।
এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত ৩০ দফা ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি সই হয়েছিল। নেপিডোতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে এ চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়। প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে বলে জানায় মিয়ানমার।
কিন্তু ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের আবাস ও জায়গাজমি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। বরং তাদের জন্য আলাদা আশ্রয়শিবির নির্মাণের কথা হয়। ফলে হাতে গোনা কয়েকজন রোহিঙ্গাকে নেওয়া গেলেও নানামুখী আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত চুক্তি ভেস্তে যায়।
গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের অধিকাংশ এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার অনেকখানিই দুর্বল। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়টি এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নেই। খোদ সরকারি কর্মকর্তারাও এই জটিলতার কথা স্বীকার করছেন।
আরাকান এলাকায় এখন পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি, মিয়ানমার সরকার এবং চীন। সেখানে বিশেষ করে খনিজ সম্পদে চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হবে কি না। এটি বুঝতে বৌদ্ধ বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সমান নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এটি বরাবরই তীব্র বিতর্কের বিষয় ছিল। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও তৎপরতা এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।
আরাকান আর্মি মূলত জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা রাখাইনে স্বায়ত্তশাসন বা ‘কনফেডারেট স্ট্যাটাস’–এর জন্য লড়াই করছে। আর রোহিঙ্গারা প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক বেশ জটিল এবং প্রায়শই উত্তেজনাপূর্ণ।
রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে মংডু এবং বুথিডং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর রয়েছে। এসব এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা বসবাস করে। ফলে এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আরাকান আর্মির অবস্থান এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং উত্তেজনা
ঐতিহাসিকভাবে আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গারা কখনো মিত্র ছিল না। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইনে গণহত্যামূলক অভিযান শুরু করে। এতে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই সময়ের আগে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতামূলক একটা সম্পর্ক ছিল। সামরিক জান্তার নিপীড়নের সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগ থাকলেও ন্যূনতম একটা সম্পর্ক তাদের ছিল।
১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকার তাদের ‘বাঙালি’ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। বৌদ্ধ-মুসলিম ঐতিহাসিক বিভেদের কারণে নাগরিকত্ব আইনের পর আরাকান আর্মির প্রতি রোহিঙ্গাদের অবিশ্বাস প্রবল হয়। এমনকি কিছু রোহিঙ্গা ২০১৭ সালের নৃশংসতায় আরাকান আর্মির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে, যদিও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় না।
এ ছাড়া আরাকান আর্মিও জান্তা সরকারের বয়ানেরই প্রতিধ্বনি করেছিল ওই সময়। যেমন ২০১৬ সালের একটি বিজ্ঞপ্তিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ‘নৃশংস বাঙালি মুসলিম সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করে তারা। এই বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের রাখাইনের স্থানীয় হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর অবস্থান
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরাকান আর্মির ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে মিলে অপারেশন ১০২৭–এ অংশগ্রহণের (অক্টোবর ২০২৩–এ শুরু) পর থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের বাসিন্দাদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান নরম করে। সম্ভবত আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং স্থানীয় সমর্থন অর্জনের কৌশল হিসেবেই তারা বয়ান পরিবর্তন করে।
আরাকান আর্মির নেতা মেজর জেনারেল ত্বান ম্রাত নাইং দাবি করেন, তাঁরা ‘রাখাইন রাজ্যের সব বাসিন্দার মানব ও নাগরিক অধিকার’ স্বীকার করেন। ২০২২ সালে এশিয়া টাইমসকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলেছিলেন তিনি। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এই অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করেছে আরাকান আর্মি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে আরাকান আর্মি নাম পরিবর্তন করে। ‘আরাকান আর্মি’ থেকে রাখাইন নাম ‘আরাখা আর্মি’ ধারণ ও প্রচার করে তারা। এটিকে রোহিঙ্গাসহ রাখাইনের সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার অভিপ্রায় হিসেবে ধরা যেতে পারে।
আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২১ সালে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এর উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্য সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। কারণ, ২০২২ সালের একটি সাক্ষাৎকারে ত্বান ম্রাত নাইং ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বেশির ভাগ আরাকানি (রাখাইন) এই শব্দটি প্রত্যাখ্যান করে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এই অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলে মত দেন তিনি।
আরাকান আর্মি পরে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে জান্তার জারি করা বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের বিবৃতির নিন্দা জানায় আরাকান আর্মি। তারা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি দেয়। এতে ধারণা করা যায়, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে গ্রহণ করলেও তাদের স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক পরিচয় স্বীকার করতে বা সমান মর্যাদা দিতে রাজি হবে না, যদি না রোহিঙ্গারা শুধু ‘রাখাইন জনগোষ্ঠী’ হিসেবে নিজেদের আত্মীকরণে রাজি হয়।
বিভ্রান্তিমূলক তৎপরতা
আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। একদিকে, তারা কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে স্পষ্ট শত্রুতামূলক মনোভাব এড়িয়ে চলে। এখন তারা জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনোনিবেশ করেছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ বা আরসা) মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অস্বীকার করে।
২০২০ সালে আরাকান আর্মির চিকিৎসা দল কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে সহায়তা করেছিল। কিছু রোহিঙ্গা নেতা, যেমন ২০২১ সালে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লার লার মিয়া আরাকান আর্মির শাসন সম্পর্কে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন।
অন্যদিকে, আরাকান আর্মির নির্যাতনের কিছু বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন এই সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে বুথিডংয়ে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পোড়ানো এবং নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘ সাক্ষীদের বিবরণে পদ্ধতিগত অগ্নিসংযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের প্রমাণ নথিভুক্ত করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে মংডুতে একটি ড্রোন হামলায় পলায়নরত বেশ কয়েক রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর জন্য আরাকান আর্মিকে দায়ী করে। যদিও আরাকান আর্মি এ বিষয়ে জান্তাকে দায়ী করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ফর্টিফাই রাইটস একইভাবে আরাকান আর্মির যুদ্ধাপরাধের প্রমাণাদি নথিভুক্ত করেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং নির্যাতন। ফলে আরাকান আর্মি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাতে পারে, সে আস্থা দুর্বল হয়েছে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ শুরু করেছে। বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু আরাকান আর্মি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। উল্টো তারা রোহিঙ্গাদের কামানের গোলা বহনকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
এদিকে আরসা এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মতো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে মৈত্রী করেছে। তারা আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। যেমন ২০২৪ সালের এপ্রিলে বুথিডংয়ে রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মি মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছে।
এতে করে জাতিগত বিভেদ আরও গভীর হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছর আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা যুবকদের জোর করে নিয়োগের পর জবাব দিয়েছে। এমনকি আরাকান আর্মি এক্সে পোস্ট করে তারা সেটি জানিয়েছে। এতে পারস্পরিক বিশ্বাস আরও ক্ষুণ্ন হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের গ্রহণের সম্ভাবনা
এরপরও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রহণের সম্ভাবনা একেবারেই নেই বলা যাবে না। তবে আরাকান আর্মির রোহিঙ্গাদের ‘গ্রহণ’ করতে সম্মতি হওয়া কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
১. রাজনৈতিক বাস্তববাদ: রাখাইন নিয়ন্ত্রণে রেখে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গাসহ একটি বহুজাতিগত জনসংখ্যাকে শাসন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে, ফলে রাখাইনের স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখার ইউএলএর প্রশাসনিক প্রচেষ্টা অর্জনের জন্য শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক সিএসআইএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল।
২. আন্তর্জাতিক চাপ: আরাকান আর্মি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি চায়। বিদেশি বিনিয়োগের সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাসে (যেমন চীনের কিয়াউকফিউ বন্দর) সেটি স্পষ্ট। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, ২০২৪ সালে আইসিসি এবং ২৮টি রোহিঙ্গা সংগঠনের নিন্দা তাদের সেই স্বীকৃতি লাভের প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশ থেকে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ফেরত নিলে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তবে তারা শুধু রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা এবং অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু নাগরিক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ অধিকার দিয়ে ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি কখনো দেয়নি।
৩. জাতিগত পরিচয় এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি: আরাকান আর্মির ‘আরাকান স্বপ্ন’ রাখাইন সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেয়। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহারে তাদের অনীহা ও ‘বাঙালি’ বা ‘মুসলিম বাসিন্দা’ শব্দ ব্যবহারে আগ্রহ এবং ত্বান ম্রাত নাইংয়ের বক্তব্য নির্দেশ করে যে তারা প্রশাসনে রোহিঙ্গাদের সমান অংশীদারত্বের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক অধীনতা দাবি করতে পারে। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা ও অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি নয়। এর মাধ্যমে তাদের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্বের প্রতি সীমিত সহনশীলতা প্রকাশ পায়।
৪. বর্তমান মনোভাব: চলতি বছরের প্রথম দিকে এক্সে রাখাইন সংঘাতসংক্রান্ত পোস্টগুলো পরস্পর বিরোধী। কেউ কেউ আরাকান আর্মিকে ইসলামোফোবিয়া এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত করেছে। আবার কেউ বাংলাদেশের সহযোগিতা পাওয়া নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির দ্বন্দ্ব মিটমাট করার কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এমনকি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ চুক্তির কথাও শোনা গেছে। এগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিত্রই উঠে এসেছে।
মোদ্দাকথা হলো, আরাকান আর্মির ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি বা তাদের জাতীয়তাবাদী অবস্থানে পরিবর্তন ছাড়া রোহিঙ্গাদের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে সমান অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসিত রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। অবশ্য আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের তাদের শাসনের অধীন বাসিন্দা হিসেবে মেনে নিতে পারে, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন বজায় রাখতে সীমিত অধিকার দিতেও রাজি হতে পারে। রাখাইনে প্রশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরাকান আর্মির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বক্তব্য-বিবৃতির ভঙ্গি তেমনটাই ইঙ্গিত দেয়।
তবে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং শর্তহীনভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা—এসবে স্পষ্ট যে আরাকান আর্মি শাসিত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হবে শর্তাধীন। এর মধ্যে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় বর্জন অন্যতম।
আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড—সামরিক আধিপত্যের সঙ্গে শাসনের ভারসাম্য—শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তারা এই বিভেদের মনোভাব থেকে সরবে, নাকি বর্জনের নীতিতে অবিচল থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি যেটিকে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয়, বাংলাদেশ, জাতিসংঘ বা আরও আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপে তাদের বাধ্য করা ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজেদের বসতভিটায় ফেরার সৌভাগ্য হবে না!
লিখেছেন: জাহাঙ্গীর আলম, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, আজকের পত্রিকা
মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের অধিকাংশ এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। বলতে গেলে মিয়ানমারের অধিকাংশ এলাকাই এখন বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার অনেকখানিই দুর্বল। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়টি এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নয়। খোদ সরকারি কর্মকর্তারাও এই...
২০ ঘণ্টা আগেযুক্তরাষ্ট্রের এবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যযুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তাবাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।
২ দিন আগে‘পারস্পরিক শুল্ক’ নামে ট্রাম্পের শুল্কনীতি আসলে কতটা বৈজ্ঞানিক? দৃশ্যত জটিল সূত্র ব্যবহার করে শুল্ক নির্ধারণের দাবি করলেও, বাস্তবে তা একেবারেই সরলীকৃত ও বিভ্রান্তিকর। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক ১৪.১ শতাংশ হলেও ট্রাম্প দাবি করছেন ৭৪ শতাংশ। কীভাবে?
২ দিন আগেমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী আমদানি পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। দিনটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘মুক্তির দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও সমৃদ্ধ করবে। তবে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এর ফলে পণ্যের দাম বাড়তে পারে...
৩ দিন আগে