Ajker Patrika

কবে অভিধান থেকে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি উঠে যাবে

মামুনুর রশীদ
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮: ৫৬
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় এ রকম ব্যত্যয় আছে কি না জানি না। আমাদের দেশেরই গারো সম্প্রদায়ের ভাষায় ‘ধর্ষণ’ বলে কোনো শব্দ নেই। ভাষাটিতে নতুন করে এমন কোনো শব্দ তৈরি হয়নি—এই জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবের পর থেকেই—সেটি হাজার বছর হতে পারে, আবার শত বছরও হতে পারে। ওই ভাষায় ‘ধর্ষণ’ শব্দটি কেন থাকল না? তার মানে ওদের সমাজে এই শব্দটির প্রয়োজন নেই বা কখনোই প্রয়োজনের উদ্ভব হয়নি।

একবার এক গার্মেন্টস কারখানায় একটি গারো মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। আমরা শহীদ মিনারে তার প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছিলাম। গারোরা বাংলার সাহায্য নিয়ে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি উচ্চারণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু উচ্চারণই করতে পারছিল না। কারণ, তাদের ভাষায় শব্দটি নেই। বাংলা ভাষায় এই শব্দটি কত আগে ঢুকেছে, আমার তা জানা নেই। ভাষা বিজ্ঞানীরা হয়তো ভালো বলতে পারবেন। তবে আমরা এই শব্দের সঙ্গে খুবই পরিচিত। ১৯৪৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মহান নেত্রী ইলা মিত্রকে পুলিশ হেফাজতে তখনকার পুলিশের উপমহাপরিদর্শক যিনি পরবর্তীকালে পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রীও হয়েছেন, সেই দোহার নির্দেশে নিষ্ঠুরভাবে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছিল। তারপর দিনাজপুরে পুলিশের দ্বারা ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করা হয়েছিল আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী তো লাখ লাখ নারীকে ধর্ষণের শিরোপা মাথায় নিয়েছিল। তাঁদের বীরাঙ্গনা বলা হলেও তাঁদের সামাজিক স্বীকৃতি মেলেনি, বরং একধরনের অপরাধ যেন তাঁরা বয়ে বেড়াচ্ছেন! সেসব মর্মান্তিক ঘটনার আমরা প্রতিনিয়ত সাক্ষী।

এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এই বিশেষ ধরনের নির্যাতন কোনো নতুন ঘটনা নয়। এমনকি ধর্মীয় বিদ্যাপীঠগুলো এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত নয়। ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের কাহিনি আমরা সবাই জানি, এখনো সেই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। মাঝে মাঝে খবরের কাগজে সমকামীদের পুরুষ শিশু ধর্ষণের ঘটনাও আমাদের কাছে সুবিদিত। এইসব নিয়ে আমরা প্রেসক্লাবে, শহীদ মিনারে, মহিলা পরিষদে নানান ধরনের সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছি। ফলাফল যে খুব সুবিধার হয়েছে, তা-ও নয়।

একবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসে এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা শুনে আমি তার আত্মীয়-পরিজন এবং ধর্ষণের শিকার মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। এ নিয়ে পত্রিকাতে আমি লিখেছিলামও। ওই ওয়ার্ডের যিনি মেট্রন, তিনি আমাকে চা খাইয়ে নানান কথা শুনিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি কথা তিনি বলেছিলেন খুবই বেদবাক্যের মতো। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে লিখে দিতে পারি এর কোনো বিচার হবে না। এটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে তারা নানাভাবে প্রভাবশালী, দেখবেন সবাই বিভিন্ন অছিলায় আইনের ফাঁক দিয়ে ছাড়া পেয়ে যাবে।’ বিচারের পরিণতি সে রকমই একটা হয়েছিল।

এক সেমিনারে প্রখ্যাত আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছিলেন, বর্বর দেশে আইনও বর্বর হয়। যেমন আমাদের দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু ধর্ষণ প্রমাণ করতে হয় যিনি ধর্ষণের শিকার তাঁকেই। সেটি প্রমাণ করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া কোনো দুর্বল পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো বিচারক প্রচুর প্রমাণ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের রায় দিতে চান না। কাজেই বিচারপ্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত এই মামলা লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে যায়, নানা ধরনের সামাজিক চাপ ও রাজনৈতিক চাপের কারণে আসামিরা একসময় মুক্ত হয়ে যায়। আর তার সঙ্গে অর্থের দাপট তো আছেই। যথারীতি বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটা ভয়ংকর চিত্র সংবাদমাধ্যমে এসেছে। একটি বাস ৩০-৩৫ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। এর মধ্যে ছিনতাইকারী ডাকাত দল বাসে উঠে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করে এবং ধর্ষণ করে। এই ঘটনার শিকার নারীর কাছ থেকে ডাকাত দল ২৫ হাজার টাকাও নিয়ে যায়। যদিও তিনি ধর্ষণের কথা স্বীকার করেননি। কিন্তু অন্য যাত্রীরা এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন। ধর্ষণের কথা এ দেশের কোনো নারীই স্বীকার করতে চান না। কারণটা সহজেই অনুমান করতে পারি আমরা। আর যেভাবে নারীদের বয়ান নেওয়া হয়, সেই ভঙ্গিটিও খুব অমানবিক এবং অশ্লীল।

রাত-বিরাতে নাইট কোচে যাতায়াত আমি নিজেও বহুবার করেছি। সৌভাগ্যবশত এ রকম পরিস্থিতির কখনো সম্মুখীন হইনি। তবে একবার খুলনা থেকে আসার সময় আমাদের সামনের গাড়িতে ডাকাতি হচ্ছিল। কিন্তু প্রচুর গাড়ি জমে যাওয়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা খুব দ্রুত নয়, একটু বিলম্বে আসার পরেও আমরা সেই যাত্রায় রক্ষা পাই। তবে সরকার হাইওয়ে পুলিশ বাহিনী তৈরি করে এই অবস্থার মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে বটে। কিন্তু বর্তমানে সেই ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক।

সেদিন এক বক্তা বলছিলেন, আমাদের সমাজটা অনেক বড় কিন্তু সেই তুলনায় রাষ্ট্রটি ছোট। কথাটি আমার মনে লেগেছে কিন্তু বক্তা এত দ্রুত সভাস্থল ত্যাগ করলেন যে আমি এটার কোনো ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ পাইনি। তবে অনুমান করি রাষ্ট্র মানে তার প্রশাসনের ব্যাপ্তি এবং তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করার সীমানাটি খুবই ক্ষুদ্র। আমাদের রাষ্ট্রের বয়স এখন ৫৪ বছর। অনেক ধরনের আন্দোলন, উত্থান-পতন, অনেক আলোচনা-সমালোচনা, স্বৈরাচার, গণতন্ত্র এসব অতিক্রম করে আমরা চলেছি। কিন্তু সামাজিক যে নিরাপত্তা সেটি আমাদের অধরাই থেকে গেছে। আমার মনে পড়ে, ষাটের দশকে বা আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দিনের পর দিন হরতাল হতো। এই শহরে কার্যত কোনো পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। আমরা যাঁরা রাতকে অগ্রাহ্য করে সেইসব যৌবনদীপ্ত মানুষেরা সারা শহর চষে বেড়িয়েছি, কিন্তু কোথাও ছিনতাই বা ডাকাতি দেখিনি।

এবার অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি শুরু হয়ে গেল। মহল্লাবাসীরা তাদের এলাকায় নিজেরাই রাত জেগে প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এই নাগরিক প্রতিরোধের ফলে অনেক জায়গাতেই ডাকাত দল পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সেই সময়ে পুলিশ-র‍্যাব সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থাও তৈরি হয়নি। তখনই আমার মনে হয়েছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ওই নাইট কোচে যদি যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারতেন, তাহলে হয়তো ভিন্ন কিছু হতে পারত। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি তাদের সাহসী হতে দেয়নি।

আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে ডাকাতি হতে দেখেছি। আবার এটাও দেখেছি আমাদের গ্রামের শিক্ষক লতিফ স্যার একটা চোঙা নিয়ে চিৎকার করে বলতেন ডাকাত পড়েছে, গ্রামবাসীরা জাগো, ডাকাতদের প্রতিহত করো। সঙ্গে সঙ্গে লাঠিসোঁটা নিয়ে শত শত মানুষ মাঠে নেমে এসেছে। তখন বিদ্যুতের আলো ছিল না, মশাল, হারিকেন, কুপিবাতি, যার যা ছিল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। ফলে ডাকাত দল পিছু হটতে বাধ্য হয়। যদিও ডাকাত দলের সঙ্গে বন্দুক থাকত। এই যে সামাজিক শক্তি, এই শক্তি কোথায় গেল? এই সামাজিক শক্তিটাকে রাজনৈতিক দলগুলো কখনো উদ্বুদ্ধ বা অনুপ্রাণিত করেনি। তারা সব সময় চেয়েছে সমগ্র সমাজের দায়িত্ব তারা নিয়ন্ত্রণ করবে। বরং তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে এগুলোকে ব্যবহার করেছে। যার ফলে সামাজিক শক্তির একটা বড় ধরনের অধঃপতন ঘটেছে এবং যেসব ‘কু’ অনুষঙ্গ আমাদের সমাজে ঢুকে পড়েছে, সেগুলো দিন দিন মারাত্মক হয়ে উঠছে।

আমাদের যে প্রাচীন মূল্যবোধগুলো ছিল, সেগুলোকে আমরা গলা টিপে হত্যা করেছি। অথচ আমাদের শিক্ষা নেওয়ার একটা জায়গা আছে। গারোদের মতো অন্যান্য বিশেষ জাতিসত্তার সমাজে শুধু ‘ধর্ষণ’ নয়, ‘শোষণ’ শব্দটাও নেই। আমরা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। আমাদেরই উচিত ছিল মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদি কিছু সার্বিকভাবে শেখানোর। কিন্তু সেটা আমরা পারিনি। আজকে ভাষা আন্দোলনের মাসের শেষ দিকে মনে পড়ছে আমাদের অভিধান থেকে আমরা কি ‘ধর্ষণ’ শব্দটি বাদ দিতে পারি? শোষণকে আমরা প্রতিরোধ করতে পারব না। কারণ শোষণ শুধু জাতীয় নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। যাঁরা বাংলা ভাষার অভিধান নির্মাণ করেন, যাঁরা এই দেশ শাসন করেন, আমাদের সমাজের যাঁরা প্রধান ব্যক্তি, তাঁরা এই বিষয়টায় গুরুত্ব দেন যেন ‘ধর্ষণ’ শব্দটা আমাদের অভিধানে না থাকে। তাতেই মুক্তি আমাদের সমাজের।

লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত