Ajker Patrika

কথার ভাষা, ভাষার কথা

ভাষা কি হারিয়ে যায়? যায় এবং দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাক্কলন করা হয়েছে যে পৃথিবীতে প্রতি ৪০ দিনে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আজকের বিশ্বের ৭ হাজার ১৬৪টি জীবন্ত ভাষার মধ্যে ৪৪ শতাংশ ভাষাই বিপন্ন, আবার সেগুলোর হারিয়ে যাওয়ারও ঝুঁকি আছে।

সেলিম জাহান 
কথার ভাষা, ভাষার কথা

কথা বলি কেন? না, বড় বড় তাত্ত্বিক বা পণ্ডিতি ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। আমি কথা বলি, কারণ কথা না বলে আমার চলে না। এই যাপিত জীবনে আমার বলার নানান বিষয় আছে, আবার জানারও নানান বিষয় আছে। অতএব, কথা আমাকে বলতেই হয়। কথার বাহন হচ্ছে ভাষা। আমি দুটো ভাষায় কথা বলতে পারি—বাংলা আর ইংরেজিতে। ‘শুভ সকাল’, কিংবা ‘কেমন আছো’ অথবা ‘ধন্যবাদ’—এমন গুটি কয়েক কথা হয়তো গোটা ছয়েক ভাষায় বলতে পারি, তবে সেসব ধর্তব্য নয়।

আমাদের ছোট কন্যা অবশ্য তিনটি ভাষায় কথা বলতে পারে—বাংলা, ইংরেজি ও স্প্যানিশ। বড় কন্যা বাংলা ও ইংরেজি ভিন্ন ছোটবেলায় দুর্দান্ত ফরাসি বলত। এখন অবশ্য সে ফরাসি ভাষাটি ভুলে-গুলে খেয়েছে। তবে ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’-এর মতো আমার দৌড়ও বাংলা ও ইংরেজি পর্যন্ত। শুনেছি ভ্যাটিকানের কার্ডিনাল মোজ্জাফেন্টি ৩৪টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আমাদের সৈয়দ মুজতবা আলীও জানতেন একাধিক ভাষা। ইদানীং সংবাদে দেখছি, ভারতের চেন্নাইয়ের মাহমুদ আকরাম ৪০০টি ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারেন এবং ৪৬টি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। কেমন করে যে এঁরা এত ভাষা মনে রাখতে পারতেন বা পারেন, ভেবে পাই না।

এই যে এত কথা বললাম, সে শুধু ‘কথার কথা’ বলে নয়। এর পেছনে কারণ আছে। মাস দেড়েক আগে ভাষার মাস শেষ হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে কথা আর ভাষাই তো ছিল একটি মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সুতরাং কথা বলার এই তো সময়। অধিকন্তু, এ বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী হলো। ভাষা-সম্মাননার ক্ষেত্রে এ এক বিরাট মাইলফলক এবং যেহেতু দুজন বাংলাদেশি—রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম দিবসটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুতরাং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বিষয়ে আমাদের একটি আলাদা গর্বের জায়গা আছে।

যদ্দুর জানা যায়, মানুষ একসময় শব্দ করত, কিন্তু কথা বলত না। সে শব্দ দিয়ে অবশ্য বহু কিছু বোঝানো যেত। আর কিছু কিছু শব্দ আছে, যার বোধগম্যতা অবশ্য সর্বজনীন। এই যেমন ব্যথা পেলে ‘উহ্’ শব্দটি, কিংবা দুঃখ পেলে কান্নার শব্দ, আনন্দে হাসির শব্দ। কিন্তু শব্দ দিয়ে তো আর সবকিছু বোঝানো যায় না, তাই উদ্ভব হলো ভাষার। আমি মনে করি, শব্দ থেকে ভাষায় উত্তরণ মানবসভ্যতার জন্য একটি বৈপ্লবিক ব্যাপার। ভাষার কারণে মনোভাব প্রকাশ যে শুধু সহজতর হলো তা-ই নয়, পুরো ব্যাপারটি একটি বিধিবদ্ধ কাঠামোর অধীনে চলে এল এবং ভাষার কারণে ক্রমান্বয়ে কথার সঙ্গে সঙ্গে লেখাও উদ্ভাবিত হলো। মানবসভ্যতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাসংখ্যারও প্রসার ঘটেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী আবিষ্কার করল তাদের নিজেদের ভাষা। অবশ্য এটাও বলা প্রয়োজন যে ভাষার ভিত্তিতেও মানবগোষ্ঠীর বিভাজন ঘটেছে এবং একই ভাষার কারণে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটেছে সামাজিক সংসক্তি। ভাষা দ্বারা নির্ণীত হয়েছে পৃথিবীর নানান জনগোষ্ঠীর আত্মসত্তার পরিচয়।

আজ পৃথিবীতে কতটি ভাষা আছে? মোটামুটি বলা চলে, পৃথিবীতে মোট ৭ হাজার ১৬৪টি ভাষায় কথাবার্তা চলে। এর মধ্যে এশিয়ায় আছে ২ হাজার ৩১০টি ভাষা, যা পৃথিবীর মোট ভাষার এক-তৃতীয়াংশ। খুব সম্ভবত এশিয়াতে লোকসংখ্যার আধিক্যের কারণে ভাষারও আধিক্য বিরাজমান। আফ্রিকাতে আছে ২ হাজার ১৬৯টি ভাষা, পৃথিবীর মোট ভাষার ৩০ শতাংশ। ইউরোপে আছে মাত্র ২৯৪টি ভাষা। আশ্চর্যজনকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভাষা আছে ১ হাজার ৩২১টি, লোকসংখ্যার নিরিখে এটাকে যৌক্তিক বলা যাবে না। যেহেতু পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি বহুসংখ্যক ছোট ছোট একক দ্বীপে বিভক্ত, সুতরাং সেই সব দ্বীপের জনগোষ্ঠী, যতই ছোট হোক না কেন, নিজেদের জন্য এক একটি ভাষা আবিষ্কার করেছে। ফলে জনসংখ্যায় ছোট হলেও ভাষাসংখ্যায় তাদের কমতি নেই।

কোন দেশে কয়টা ভাষা আছে? বললে বিশ্বাস হবে না যে পাপুয়া নিউগিনিতে ৮৪১টি ভাষা আছে। অথচ দেশটির লোকসংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ। মোটামুটিভাবে বলা চলে, ঢাকা শহরের অর্ধেক। পাপুয়া নিউগিনির পরে ইন্দোনেশিয়ায় ভাষার সংখ্যা ৭২১টি, নাইজেরিয়ায় ৫৩৮টি, ভারতে ৪৫৯টি ও চীনে ৩০৮টি। দুটো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি একবার বেড়াতে ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের প্রত্যন্ত একটি অঞ্চলে গিয়েছিলাম। সেখানে মাত্র ৬ জনের একটি জনপদের দেখা পেয়েছিলাম। সে জনপদের শুধু ওই ৬ জনই ভাষাটা বলতে পারে। তেমনিভাবে দুটো যমজ বাচ্চা ছেলের দেখা পেয়েছিলাম, যারা ভাইয়ে-ভাইয়ে একটা ভাষা আবিষ্কার করে নিয়েছিল, যা শুধু তারা দুজনই ব্যবহার করত। অন্য সবার সঙ্গে বাংলা বা ইংরেজি ব্যবহার করলেও পারস্পরিক কথাবার্তায় তারা নিজস্ব ভাষায় কথাবার্তা বলত। পরিণত বয়সেও তারা এ অভ্যাসটি ছাড়েনি বলে জনশ্রুতি আছে।

জনসংখ্যার দিক থেকে যদি দেখি, তাহলে এ বিশ্বে ১৫০ কোটি ইংরেজিতে, চীনা ভাষায় ১১০ কোটি, হিন্দিতে ৬০ কোটি, স্প্যানিশে ৫৬ কোটি, আরবিতে ৩৩ কোটি, ফরাসিতে ৩১ কোটি ও রুশ ভাষায় ২৬ কোটি লোক কথা বলে। হিন্দি বাদে বাকি ছয়টি ভাষাই জাতিসংঘের সরকারি ভাষা। বিশ্বের ১৮৬টি দেশে কথা বলতে ও লিখতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। ভাষার ক্ষেত্রে এটাও মনে রাখা দরকার যে, সব ভাষাতেই একটি প্রমিত সংস্করণ আছে এবং সেই সঙ্গে আছে আঞ্চলিক টান। তাই বিবিসির ইংরেজি যেমন আছে, তেমনি আছে ককনি ইংরেজি। প্যারিসের ফরাসি কিংবা মন্ট্রিয়লের ফরাসি কিন্তু এক নয়। মরক্কো ও সোমালিয়ার আরবির মধ্যেও উচ্চারণে পার্থক্য আছে। তফাত আছে চট্টগ্রামের বাংলার সঙ্গে কুষ্টিয়ার বাংলার।

আজকাল তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে তো আমাদের কথা আর লেখার অন্যতম মাধ্যম অন্তর্জাল (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম)। সেখানকার কথা, লেখা আর তথ্য চালাচালির প্রায় অর্ধেক (৪৯ শতাংশ) হয় ইংরেজিতে, ৬ শতাংশ স্প্যানিশ, ৬ শতাংশ জার্মানে, ৫ শতাংশ জাপানি আর ৪ শতাংশ যথাক্রমে ফরাসি, চীনা আর রুশ ভাষায়। আরবি, বাংলা, হিন্দি ভাষার ব্যবহার সেখানে নিতান্ত কম। সুতরাং তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবভিত্তিক তথ্য বিনিময়ে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য বেশি।

ভাষা কি হারিয়ে যায়? যায় এবং দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাক্কলন করা হয়েছে যে পৃথিবীতে প্রতি ৪০ দিনে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আজকের বিশ্বের ৭ হাজার ১৬৪টি জীবন্ত ভাষার মধ্যে ৪৪ শতাংশ ভাষাই বিপন্ন, আবার সেগুলোর হারিয়ে যাওয়ারও ঝুঁকি আছে। আফ্রিকার ৪২৮টি ভাষা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ২২২টি ভাষা হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ শিশুরা আর সে ভাষাগুলো শিখবে না এবং ব্যবহার করবে না। আগামী ১০০ বছরে বর্তমান পৃথিবীর ৯০ ভাগ ভাষাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।

বাংলার কী অবস্থা? পৃথিবীতে ভাষা-কথনের ক্ষেত্রে বাংলার স্থান সপ্তম। আমাদের আগে আছে যথাক্রমে ইংরেজি, চীনা, হিন্দি, স্প্যানিশ, আরবি ও ফরাসি। বিশ্বের প্রায় ২৮ কোটি লোক বাংলায় কথা বলে। আমাদের দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষের প্রথম ভাষা হচ্ছে বাংলা। এ দেশের নানা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ভাষায় ২ শতাংশ লোক কথা বলে। আমাদের দেশের ৯২ শতাংশ মানুষের কোনো দ্বিতীয় ভাষা নেই।

কথার ভাষা এবং ভাষার কথার এই হচ্ছে চালচিত্র। তবে বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা তার কাছে বড় পবিত্র। কারণ, সবকিছুর ওপরে কথা ও ভাষা মানুষকে কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা দেয়, যা মানুষের মৌলিক একটি অধিকার। তাই মাতৃভাষার চর্চা দেশপ্রেমের চর্চার মতোই হওয়া উচিত।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত