Ajker Patrika

চীনের প্রাচীরের দুদিক থেকে যাত্রা করেছিলেন যুগল, মাঝখানে দেখা হলেও প্রেম গেল ভেঙে

অনলাইন ডেস্ক
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১: ২৭
দেখা হওয়ার পর প্রাচীরের ওপর দুজন। ছবি: সিএনএন
দেখা হওয়ার পর প্রাচীরের ওপর দুজন। ছবি: সিএনএন

প্রায় ৩ হাজার মাইল দীর্ঘ চীনের মহাপ্রাচীর তার ২ হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে বহু ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো সার্বিয়ান শিল্পী মারিনা আব্রামোভিচ এবং জার্মান শিল্পী উলের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। এই প্রেমিক যুগল মহাপ্রাচীরের দুই প্রান্ত থেকে একে অপরের দিকে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। পারফরমেন্স আর্টের জগতে তাঁদের দুজনের এই যাত্রাটি ‘দ্য গ্রেট ওয়াল ওয়াক’ নামে পরিচিত।

সিএনএন জানিয়েছে, মারিনা তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন পূর্ব প্রান্ত থেকে, যেখানে গ্রেট ওয়াল সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। যেন একটি ড্রাগন সমুদ্রের পানি পান করছে। আর উলে তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন গোবি মরুভূমি কাছে পশ্চিম প্রান্ত থেকে।

প্রেমিক যুগল ভেবেছিলেন, প্রাচীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে কোনো একদিন তাঁরা প্রাচীরের মাঝামাঝি স্থানে গিয়ে মিলিত হবেন এবং তাঁরা বিয়ে করবেন। কিন্তু বিশেষ এই অভিযানের জন্য চীনা কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেতেই তাঁদের আট বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পর্কটাই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে রোমান্টিক যুগল হিসেবে খ্যাতি থাকার পরও তাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিহিংসা এবং একটি ব্যর্থ ত্রিমুখী সম্পর্কে ডুবে যান।

সম্পর্ক ভেঙে গেলেও অভিযানের বিষয়ে অনড় ছিলেন দুজনই। অবশেষে ১৯৮৮ সালের মার্চে তারা হাঁটার যাত্রা শুরু করেছিলেন। মারিনা বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নতুন পরিস্থিতিকে মেনে নিতে হবে। মানে আমাদের বিচ্ছেদ এবং আমরা বিদায় জানাব।’

অবশেষে হয়েছিল তা-ই। প্রাচীরের মাঝামাঝিতে দেখা হওয়ার পর একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তাঁরা। মারিনার মতে, ‘বড় ভালোবাসার’ মধ্যে ভালোবাসা, ঘৃণা, হতাশা এবং ক্ষমা—সবকিছুরই জায়গা রয়েছে।

এদিকে ৩৬ বছর আগের সেই যাত্রার সময় তোলা সহস্রাধিক ছবি নিয়ে সম্প্রতি সাংহাইয়ের মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামে একটি প্রদর্শনী করেছেন বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী সার্বিয়ান শিল্পী মারিনা আব্রামোভিচ। এই ছবিগুলো মূলত চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত—প্রস্তুতি এবং যাত্রার শুরু, স্থানীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ওয়াল ধরে হাঁটা এবং উলের সঙ্গে মিলিত হওয়া।

এই ছবি প্রদর্শনীর বিষয়ে কিউরেটর শাই বাইটেল বলেন, ‘এটি শিল্প এবং শিল্প ইতিহাস গবেষণার জন্য একটি দুর্লভ সম্পদ।’

মারিনার যাত্রায় দেখা যায়, গ্রেট ওয়ালের বুনো এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য—পর্বতমালা, ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্য এবং নানা ধরনের ভূখণ্ড। এই যাত্রার নিঃসঙ্গতা তাঁকে আত্মচিন্তা এবং উপলব্ধির সুযোগ দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি একা নারী, কোনো স্বামী বা সন্তান ছাড়াই, স্থানীয় ভাষা না জেনেও সেখানে হাঁটছিলাম। সবাই ভাবত, আমি এখানে কী করছি?’

প্রাচীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতিকে উপভোগ করছেন মারিনা। ছবি: সিএনএন
প্রাচীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতিকে উপভোগ করছেন মারিনা। ছবি: সিএনএন

স্থানীয়দের কাছে চীনের মহাপ্রাচীর সামরিক ইতিহাসের চেয়ে আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে বেশি। স্থানীয়রা এটিকে ড্রাগন এবং মিল্কি ওয়ের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখেন।

মারিনা আবিষ্কার করেন, এই প্রাচীরের মাটির খনিজ উপাদানের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী গল্পগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি, আমি যে মাটিতে হাঁটছি, তা সরাসরি ওই পুরোনো গল্পের সঙ্গে জড়িত। কালো ড্রাগন বলতে হেমাটাইট, আর লাল ড্রাগন বলতে মাটির খনিজ। প্রতিটি স্থানের মাটি থেকে ভিন্ন শক্তি অনুভব করতাম।’

যা হোক, তিন মাস ধরে হাঁটার পর মহাপ্রাচীরের শেনমু অঞ্চলে মিলিত হন মারিনা এবং উলে। তাঁরা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন এবং বিদায় জানান। কিন্তু এর আগে মারিনা জানতে পারেন, উলে তাঁর যাত্রার সময় চীনা দোভাষীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং ওই নারীকে গর্ভবতীও করেছেন।

বিখ্যাত সেই ঘটনার ২২ বছর পর ২০১০ সালে অবশ্য আরও একবার দেখা হয়ে যায় মারিনা এবং উলের। সেবার নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে মারিনার এক প্রদর্শনীতে উপস্থিত হন উলে। দুজনের এই মুহূর্তটি ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল।

বিচ্ছেদের ২২ বছর পর ২০১০ সালে দেখাও হয়েছিল দুজনের। ছবি: সিএনএন
বিচ্ছেদের ২২ বছর পর ২০১০ সালে দেখাও হয়েছিল দুজনের। ছবি: সিএনএন

২০২০ সালে উলের মৃত্যু হয়। তাঁকে স্মরণ করে মারিনা বলেন, ‘তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। তবে তাঁকে খুব মনে পড়ে। যদি তিনি আজ এখানে থাকতেন, এটি আরও বিশেষ হয়ে উঠত।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত