Ajker Patrika

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের ইশতেহার ঘোষণা, ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে শনিবার ইশতেহার পড়ে শোনান ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের। ছবি: আজকের পত্রিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে শনিবার ইশতেহার পড়ে শোনান ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের। ছবি: আজকের পত্রিকা

একাডেমিক ক্যালেন্ডারে নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিশ্চিত, জাতীয় রাজনীতির মহড়া ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির অবসান ঘটানোসহ আটটি প্রস্তাবনায় বেশ কয়েকটি দফা দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছে নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ সমর্থিত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল।

আজ শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আব্দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) প্রার্থী আশরেফা খাতুন এই ইশতেহার পড়ে শোনান।

প্রারম্ভিক বক্তব্য ও ইশতেহারের প্রথম অংশ পাঠ করেন ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের।

ইশতেহারের প্রথমাংশে তিনি বলেন, ‘একাডেমিক ক্যালেন্ডারে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় রাজনীতির মহড়া, অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে জীবন, কর্ম, জ্ঞান, দক্ষতা ও সেবাভিত্তিক নাগরিক তৈরি করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হবে। হল ও একাডেমিক অঙ্গনে দলীয় রাজনৈতিক কাঠামো বন্ধ করা হবে।

‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, নিপীড়ন ও জুলুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। ’৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ভূমিকার গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে অক্ষুণ্ন রাখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে। স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদবিরোধী ধারা বজায় রাখা হবে।’

দ্বিতীয় প্রস্তাবনায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আব্দুল কাদের বলেন, ‘৭৩-এর অধ্যাদেশের স্বায়ত্তশাসনকে অর্থবহ করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কার করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র অবসানের লক্ষ্যে ভিসি, প্রোভিসি, প্রভোস্টসহ প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগের স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ওয়ান স্টপ সলিউশন নামে একটি অ্যাপস বানানো হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রার ভবনের দৌরাত্ম্য ও সিন্ডিকেট বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক সেবা গ্রহণ করবে। রে মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষার রেজাল্ট, অ্যাডমিট কার্ড উত্তোলন, বেতন পরিশোধ করা যাবে। এভাবে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অধিকাংশ কাজ পেপারলেস করা হবে।

‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (যেমন—মডেল/ব্ল্যাকবোর্ড/গুগল ক্লাসরুম) পরিধি বৃদ্ধি করব। এর মাধ্যমে শিক্ষকেরা স্টুডেন্টদের ডিরেকশন দিতে পারবেন, শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের থেকে কোর্স-সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা থেকে শুরু করে রেফারেন্স বই-আর্টিকেল অনুসন্ধান, অ্যাসাইনমেন্ট জমা ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবে। কোর্স-সংক্রান্ত প্রশ্ন করতে পারবে। আধুনিক ক্লাসরুম ও পাঠদানের জন্য ক্লাসে ডিজিটাল উপকরণ নিশ্চিত করা হবে। ল্যাব ফ্যাসিলিটির আধুনিকায়ন করা হবে। আবাসিক হলের ল্যাবগুলোকে সচল রাখব। সেমিস্টার-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষার্থীরাও যেন শিক্ষকদের পাঠদানের মানের মূল্যায়ন করতে পারে।

‘১০তলা বিশিষ্ট একটা স্বতন্ত্র স্টাডি স্পেস নির্মাণ করা হবে, যেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে চাকরির প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা করা যাবে, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উচ্চগতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধাও থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিতে শিক্ষকদের নিয়োগদান প্রক্রিয়া যুগোপযোগী করা হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। শিক্ষকদের ডেমো ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা হবে।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্রেডিট ট্রান্সফার করে বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে ভর্তি হতে পারে, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চুক্তি করা হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে MOU-এর মাধ্যমে যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম, এক্সচেক প্রোগ্রাম ও স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হবে।

‘ডিপার্টমেন্টের ও রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের রিসার্চের আউটপুট রেগুলার প্রকাশ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করানো এবং আন্তর্জাতিক সেমিনারে শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র প্রকাশে কাজ করব। অনুষদভিত্তিক সম্পূর্ণ পূর্ণকালীন পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা হবে। দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কোলাবোরেশন বৃদ্ধিতে কাজ করব। ই-বুক ও আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নালে সুলভ একসেস নিশ্চিত করব।

‘ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব রাস্তা ও হলের সম্মুখভাগ আলো ও সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসা হবে। ফ্যাসিবাদী আমলে দলীয় রাজনীতির প্রভাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে কথিত ম্যানার শেখানোর নামে গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যে নির্যাতন ও ট্রমার শিকার হতে হয়েছে, সেসব ট্রমা হিলিংয়ের জন্য প্রতিটি গেস্টরুমের নাম পরিবর্তন করে এফএনএফ সেন্টার ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি নামকরণ করা হবে। গেস্টরুম বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রেফারেন্স ওয়ার্ড থাকবে না। এ ছাড়া রাষ্ট্র কর্তৃক বেদখল হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ একর জমি আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করব।’

স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ারে ওয়ান কার্ড অল সার্ভিস, ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান সিট, স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত, মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন, ট্রমা সেন্টার চালু এবং সব শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ নিশ্চিত করার কথাও জানান ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের।

দ্বিতীয় ভাগের প্রস্তাবনা পাঠ করেন জিএস প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার।

প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, ‘দাড়ি-টুপি, বোরকা-হিজাবসহ পোশাক ও আঞ্চলিক কেন্দ্রিক মোরাল পলিসিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, জাতিসত্তা ও মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অপরায়ন ও বৈষম্য বন্ধ করা হবে। স্টারলিংকের মাধ্যমে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে উচ্চগতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সেবার আওতায় নিয়ে আসা হবে এবং সব একাডেমিক বিল্ডিং ও হলকে এডুরোমের মাধ্যমে ফ্রি ও ফাস্ট ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসব।’

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার ও স্কিল ডেভেলপমেন্টের কথাও জানান তিনি।

কালচারাল ও স্পোর্টস এবং নারী—এই শেষ দুটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন এজিএস পদপ্রার্থী আশরেফা খাতুন।

প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, ‘মিউজিয়াম এবং কালচারাল সেন্টার তৈরি করা হবে। ১৮টি হলের টিভি রুমকে আধুনিক করে একটা সেন্ট্রাল সিনেপ্লেক্সে করা হবে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও টিএসসিভিত্তিক ক্লাবগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের অধীনে থাকবে না।

‘নারী হলগুলোতে স্পোর্টস ফ্যাসিলিটিজ বৃদ্ধি, টিএসসি, সেন্ট্রাল মসজিদসহ অন্যান্য জায়গায় মেয়েদের নামাজের স্থান প্রসারিত করা, অনাবাসিক মেয়েদের আবাসিক হলে প্রবেশাধিকার দেওয়া, নারীদের সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা করতে বিশেষ সাইবার সিকিউরিটি সেল গঠন, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করাসহ আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য লিগ্যাল সাপোর্ট সার্ভিস চালু করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত