Ajker Patrika

উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার: জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার: জরিপ

দেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে নানাভাবে ‘বৈষম্যের শিকার’ হচ্ছেন। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৫১ শতাংশ ছাত্রী ও ৪৯ শতাংশ ছাত্র। পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ শনিবার (৩০ আগস্ট) ‘বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ সমীক্ষার ফল তুলে ধরা হয়। আঁচল ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের টিম লিডার ফারজানা আক্তার লাবনী সমীক্ষার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন।

২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা স্নাতক পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মোট ১ হাজার ১৭৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইনে এই সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়।

অংশগ্রহণকারীদের ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ ছিলেন পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২২ শতাংশ, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ১ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ছিলেন।

সমীক্ষার তথ্য বলছে, বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৫৬ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের; আর ১৯ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ৫ শতাংশ মেডিকেল কলেজের। স্নাতকের শেষ দুই বছর অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন।

আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, জরিপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ১৭৩ জনের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ, পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। তাঁদের ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ছিলেন ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ছিল ২৩ থেকে ২৬ বছর বয়সের শিক্ষার্থী, যা ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৩০ বছরের বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। অনলাইনে পাঠানো প্রশ্নের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা এ জরিপে অংশ নিয়েছিলেন।

জরিপে যে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার বলে দাবি করছেন, তাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশ বলছেন, তাঁরা পরীক্ষায় ফলাফলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৩০ শতাংশের দাবি, তাঁরা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার ও ১৯ শতাংশ ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করছেন। শারীরিক অক্ষমতার জন্য প্রায় ৭ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ও জাতিগত পার্থক্যের কারণে ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছেন। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, যা মোট হিসাবের ৬০ শতাংশ। ১৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা ডরমিটরিতে এবং ৩৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইভেন্টে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় তাঁদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর। এর বাইরে লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার হলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষার্থী।

নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার দাবি করা ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

সমীক্ষার তথ্য-উপাত্ত বলছে, শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন সহপাঠীদের দ্বারা, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। শিক্ষক কর্তৃক এ ধরনের আচরণের শিকার হতে হয়েছেন ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দায়ী করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে।

জরিপের তথ্য বলছে, বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। এঁদের মাঝে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, এ ধরনের আচরণের প্রভাব তাঁদের ওপর গুরুতরভাবে পড়েছে, মোটামুটি প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন কোনো প্রভাব পড়েনি।

বৈষম্যের শিকার হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে ৭৫ শতাংশই জানান, তাঁরা কোনো ধরনের অভিযোগ দেননি।

জরিপের তথ্য বলছে, বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, যেমন—কাউন্সেলিং, থেরাপি ইত্যাদির শরণাপন্ন হয়েছেন। অবশিষ্ট ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো ধরনের সেবা গ্রহণ করেননি।

এসব সমীক্ষার ফলের ভিত্তিতে আঁচল ফাউন্ডেশন সাত প্রস্তাব তুলে ধরেছে। এগুলো হলো—মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ; ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করা; বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ; অভিযোগ সেল গঠন; শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক তৈরি; ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।

ভার্চুয়াল এ সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী হাবিবুর রহমান, পার্সপেক্টিভের নির্বাহী সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজসহ আরও অনেকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত