Ajker Patrika

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করুণ সাক্ষী ময়নামতি ‘ওয়ার সিমেট্রি’

মো. আনোয়ারুল ইসলাম ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা)
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। ছবি: আজকের পত্রিকা
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। ছবি: আজকের পত্রিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাংলাদেশ সরাসরি অংশ না নিলেও কুমিল্লার ময়নামতিতে অবস্থিত ওয়ার সিমেট্রি (কবরস্থান) এই যুদ্ধের এক করুণ স্মৃতি বহন করছে। ১৯৪০-৪৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে সংঘটিত ভয়াবহ যুদ্ধে ৪৫ হাজার কমনওয়েলথ সেনা নিহত হন। তাঁদের স্মরণে বাংলাদেশের কুমিল্লাসহ মিয়ানমার ও আসামের বিভিন্ন স্থানে সমাধি তৈরি করা হয়। যার মধ্যে এটি অন্যতম। এখানে ১৩ দেশের ৭৩৭ যোদ্ধার সমাধি রয়েছে।

কুমিল্লা শহর থেকে আট কিলোমিটার পশ্চিমে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে চার একর জায়গাজুড়ে এই স্মৃতিসৌধটি অবস্থিত। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি এলাকা ও মনোরম পরিবেশে এটি দেশের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও প্রিয়। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

মালয়েশিয়ান উন্নয়ন সংস্থার কর্মী নূর নাদিয়া বিনতে নাজিব বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি নিদর্শন এখানে রয়েছে। একদিকে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোরম, অন্যদিকে যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন এখানে এসে হৃদয়বিদারক অনুভূতি জাগায়।’ একইভাবে আসাম থেকে আসা হিম কৃষ্ণ বলেন, ‘যুদ্ধের ইতিহাস পড়েছি, কিন্তু এখানে এসে সেই ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে অভিভূত।’

রাজশাহী থেকে আসা শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, ‘এখানে যুক্তরাজ্য, ভারত, আফ্রিকা, জাপানসহ নানা দেশের সৈনিকের সমাধি রয়েছে। যুদ্ধের পরিণতি এখানে এসে আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই গণকবর আমাদের শিক্ষা দেয়, দিনশেষে যুদ্ধের ফল কখনো ভালো হতে পারে না। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের যে দামামা বাজছে, সেটি দ্রুত বন্ধ করা উচিত।’

ওয়ার সিমেট্রির প্রবেশমুখে একটি তোরণ রয়েছে, যার ভেতরে কবরস্থানটির ইতিহাস ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় লেখা রয়েছে। প্রশস্ত পথের দুই পাশে সারি সারি কবর ফলক। প্রতিটি কবরের ফলকে যোদ্ধাদের নাম, পদবি, ধর্মীয় প্রতীকসহ মৃত্যুর তারিখ লেখা থাকে। সেখানকার কেন্দ্রে একটি বেদি রয়েছে, যার ওপর খ্রিষ্ট ধর্মের প্রতীক ক্রুশ শোভিত। সমাধিক্ষেত্রের চারপাশে সৌন্দর্যমণ্ডিত গাছগাছালি এবং কৃষ্ণচূড়া গাছের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে রয়েছে।

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। ছবি: আজকের পত্রিকা
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। ছবি: আজকের পত্রিকা

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে কমনওয়েলথ গ্রেভ ইয়ার্ড কমিশন। প্রতি বছর নভেম্বরের প্রথম দিকে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনাসভা হয়, যেখানে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হন। গার্ড অব অনার প্রদানের পর যুদ্ধাহত সৈন্যদের স্মৃতির উদ্দেশে ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়। প্রার্থনার সুরে পরিবেশে এক করুণ ভাব সৃষ্টি হয়, যা যুদ্ধের ভয়াবহতা ও এর পরিণতি সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়।

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে সমাহিত যোদ্ধাদের মধ্যে রয়েছে অবিভক্ত ভারতের ১৭৮, যুক্তরাজ্যের ৩৫৭, জাপানের ২৪, কানাডার ১২, অস্ট্রেলিয়ার ১২, নিউজিল্যান্ডের ৪, দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, বার্মার একজন করে সেনার কবর।

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি শুধু একটি সমাধি ক্ষেত্র নয়, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করুণ ইতিহাসের এক সাক্ষী। এখানে এসে কেউ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে না বরং যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানুষের ক্ষতি ও তা থেকে শান্তির গুরুত্ব সম্পর্কে গভীর ভাবনা গ্রহণ করে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত