Ajker Patrika

শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ স্বামীর হয়ে তালাক দিতে পারেন না

ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন
শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ স্বামীর হয়ে তালাক দিতে পারেন না

প্রশ্ন: আমার বিয়ের বয়স প্রায় ৭ বছর। ৫ বছরের একটি মেয়ে আছে। তার জন্মের পর থেকে আমার স্বামী আমাদের খোঁজখবর নিত না, ভরণপোষণ দিত না। সে লুকিয়ে বিদেশ থেকে দেশে যাতায়াত করত। আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে যেত না। এসব কারণে বাধ্য হয়ে আমি কোর্টে মামলা করি।

কোর্টে মামলা চলাকালে স্বামী আমার সঙ্গে সংসার করা এবং আমাদের ভরণপোষণ দেওয়ার কথা বলে আপস করে জামিনে বের হয়ে বিদেশে চলে যায়। আমি মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকি এবং মামলা স্থগিত রাখি। এখন সে বিদেশ থেকে কোনো যোগাযোগ করছে না, ভরণপোষণও দিচ্ছে না। এক আইনজীবী আমাকে জানিয়েছেন, আমার শ্বশুর কোর্টে গিয়েছিলেন ডিভোর্সের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু আমার কাছে কোনো নোটিশ আসেনি এখনো। শুনেছি, আমার অনুপস্থিতিতে তালাক বিষয়ে কোর্ট নতুন করে শুনানি করেছেন।

আমার প্রশ্ন, তারা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আমার ও আমার স্বামীর উপস্থিতি ছাড়া মামলার কাগজপত্রে থাকা আমার স্বাক্ষর জাল করে আমার শ্বশুর কি আমাদের বিবাহবিচ্ছেদ করাতে পারেন?

উত্তর: আপনার বিষয়টি সত্যিই খুব সংবেদনশীল ও কষ্টদায়ক। প্রথমত, আপনার উপস্থিতিতে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব কি না। বাংলাদেশের আইনে এটা তিনভাবে হতে পারে।

১. স্বামীর পক্ষ থেকে একতরফা তালাক

বাংলাদেশে স্বামী নিজেই তালাক দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তালাকনামা অবশ্যই লিখিত করতে হবে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা অথবা সিটি করপোরেশনে নোটিশ পাঠাতে হবে, ওই অফিস থেকে আপনার নামে রেজিস্ট্রি ডাক বা নোটিশ যাবে। আপনি নোটিশ না পাওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ স্বামীর হয়ে তালাক দিতে পারেন না। এটি পুরোপুরি অবৈধ।

২. আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের রায়

এ ক্ষেত্রে, মামলার বাদী থাকেন স্বামী বা স্ত্রী। আপনাকে নোটিশ দিতে হবে, আপনি আদালতে হাজির না হলে আদালত ‘একতরফা রায়’ দিতে পারেন। কিন্তু আপনার নামে সই জাল করে মামলা করা সম্পূর্ণ অপরাধ—আইনে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আপনি নোটিশ না পেলে আদালত আপনাকে অনুপস্থিত দেখিয়ে রায় দিতে পারেন না। অর্থাৎ, আপনার উপস্থিতি ছাড়া আদালতের ডিভোর্স তখনই সম্ভব, যখন আপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আপনি তা গ্রহণ করেছেন।

৩. আপনার পক্ষ থেকে তালাক: আপনি নিজে আবেদন না করলে এটি সম্ভব নয়।

আপনি জানতে চেয়েছেন, আপনার অনুপস্থিতিতে হওয়া শুনানিতে আদালত আপনার তালাক কার্যকর করবেন কি না। এর উত্তর হচ্ছে, শুধু এক দিন অনুপস্থিত থাকলে ডিভোর্স হয়ে যায় না। আদালত সাধারণত পুনরায় সমন বা নোটিশ পাঠান অথবা অনুপস্থিত থাকলে আরেকবার সময় দেন অথবা বারবার অনুপস্থিত থাকলে একতরফা রায় দিতে পারেন। কিন্তু তবু আপনাকে নোটিশ পাঠানো ছাড়া আদালত কোনো রায় দিতে পারেন না।

এখন অবিলম্বে আপনার মামলার নথি যাচাই করা উচিত। আপনার উকিলকে বলুন, আদালত থেকে মামলার অর্ডার শিট সংগ্রহ করে দিতে এবং গত শুনানিতে আসলে কী হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে। এতে আপনি নিশ্চিত হবেন, আদালত আদৌ কোনো রায় দিয়েছেন কি না। আপনার শ্বশুর জাল কাগজ জমা দিয়ে থাকলে আপনি স্বাক্ষর জাল করার অপরাধে ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। আদালতে পিটিশন দিয়ে জানাতে পারেন, এটা আপনার স্বাক্ষর নয় অথবা মামলাটি বাতিল করাতে পারেন।

স্বামী তালাক দিয়ে থাকলেও প্রথমে নিশ্চিত হোন। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় গিয়ে জিজ্ঞেস করুন আপনার নামে কোনো নোটিশ এসেছে কি না। নোটিশ না এলে এখনো তালাক কার্যকর হয়নি।

আপনার অধিকার

আপনার স্বামী দায়িত্ব না নিলে ভরণপোষণের মামলা চালিয়ে যেতে পারবেন, সন্তানের সব অধিকার আপনার কাছে থাকবে।

পরামর্শ দিয়েছেন

ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...