Ajker Patrika

স্মরণ: স্রোতের বিপরীতে সারাহ মুর

ফিচার ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

উনিশ শতকে যে নারীরা দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে সরব ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম সারাহ মুর গ্রিমকে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন বক্তা ও নারীদের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তাঁকে ‘মাদার অব উইমেন্স সাফারেজ মুভমেন্ট’ বা নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের জননী বলে মনে করা হয়।

১৭৯২ সালের ২৬ নভেম্বর দক্ষিণ ক্যারোলাইনার চার্লসটনে জন্মেছিলেন মুর। সেখানকার ধনী দাস মালিক পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সাউথ ক্যারোলাইনার আইনে দাসদের লেখাপড়া করা নিষিদ্ধ হলেও সারাহ তাঁর পরিবারের দাসদের গোপনে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করতেন। তিনি ও তাঁর ছোট বোন অ্যাঞ্জেলিনা গ্রিমকে দুজনেই দাসপ্রথা বিলোপবাদী দলগুলোতে যোগ দিয়ে এর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে কথা বলতে শুরু করেন।

১৮৩৬ সালের দিকে তাঁরা বই প্রকাশ করা শুরু করেন। ১৮৩৮ সালে সারাহ তাঁর বিখ্যাত লেখা ‘লেটার্স অন দ্য ইকুয়ালিটি অব দ্য সেক্সেস অ্যান্ড কন্ডিশন অব উইমেন’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি সমাজে নারীদের অধীনস্থ অবস্থাকে দাসপ্রথার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নারী অধিকার এবং আফ্রিকান আমেরিকানদের উন্নত জীবনের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

জেএনএনপিএফের মতবিনিময় সভা

‘সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কাঠামোর বৈষম্য নারীদের এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে’

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বৈষম্যবিরোধী স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা হলেও প্রশাসন থেকে সমাজ—সব স্তরেই বৈষম্য রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি বলেন, খাদ্য, জমি ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নেই বললেই চলে। সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কাঠামোর বৈষম্য নারীদের এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ (জেএনএনপিএফ) ফোরামের আয়োজনে ‘জেএনএনপিএফ: ১৯ বছরের অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও বার্ষিক সাধারণ সভা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় এনজিও ফোরামের সেন্ট্রাল ট্রেনিং সেন্টারে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

২৫টি জেলার ২৬টি সংস্থার সমন্বয়ে জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম গঠিত হয়েছে। এর আগে জেএনএনপিএফের সভাপতি মমতাজ আরা বেগমের সভাপতিত্বে ও একশনএইডের এলআরপির সমন্বয়ক নুরুন নাহারের পরিচালনায় জেএনএনপিএফের ১৯ বছরের কার্যাবলি নিয়ে কথা বলেন কনসালট্যান্ট কাশফিয়া ফিরোজ।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেএনএনপিএফের সভাপতি মমতাজ আরা বেগম, একশনএইডের ডেপুটি ম্যানেজার মৌসুমি বিশ্বাস, নারীপক্ষের সদস্য রিনা রায়।

স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে শামসুল হুদা আরও বলেন, এটি প্রান্তিক মানুষ ও নারীর জন্য কার্যকর না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। সংবিধানে রাষ্ট্র জনগণের উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।

তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ যে রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা করেছিল, ৫৫ বছর পরও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হলেও নিহত মানুষদের ভুলে গেলে চলবে না। নারীর অধিকার রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রথম কমিশনে নারী কমিশন না থাকা এবং পরে ঐকমত্য কমিশনের প্রভাবে নারী কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাঁর অভিযোগ, নারী কমিশনের কাজ যেন কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

সভায় জেএনএনপিএফের সভাপতি মমতাজ আরা বেগম বলেন, নারীর প্রতি নির্যাতন অতীতেও ছিল, এখনো আছে। একজন নির্যাতনকারী হঠাৎ তৈরি হয় না—পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশই তাকে গড়ে তোলে। তিনি বলেন, নারীরা আজও রাতে বের হতে ভয় পান; সমাজে এমন নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে আইনপ্রণেতা থেকে বিচার বিভাগ—সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। তাঁর মতে, নিজের বিবেককে শাণিত না করলে কোনো পরিবর্তনই সম্ভব নয়।

নারীপক্ষের সদস্য রিনা রায় বলেন, ৪২৩টি সুপারিশের মধ্যে ৩টিতে আপত্তি দেওয়া হয়। এই ৩টিকে যারা আপত্তি জানিয়েছে, তাদেরকেও বাদ দিতে হবে। প্রান্তিক নারীরা একে অপরকে সম্মান দেয় না। স্বার্থ যেখানে আছে, সেখানে সবাই যায়। নিজের স্বামী সম্পত্তি নিতে চাইলেও সমস্যা হতে পারে। তাই নারীর যুদ্ধ করতে হবে।

নারীদের পাঁচ ঘণ্টা কাজের ব্যাপারে রিনা রায় বলেন, কর্মঘণ্টা কমানোর ব্যাপারে আমরা একমত নই। পরিবার ও সমাজকে নারীকে দাঁড় করানোর জন্য কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় বিষয়ে যে বিষয়গুলো আঘাত করে, সেটা যারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজ করে, তাদের জানাতে হবে। সংসদে নারীর আসন নিয়ে তিনি বলেন, এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে আলাদা নির্বাচন করতে হবে, কিন্তু এটা কেউ মানে না। রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশের বেশি দিতে চাচ্ছে না।

একশনএইডের ডেপুটি ম্যানেজার মৌসুমি বিশ্বাস বলেন, নারীর সম্পত্তির অধিকারকে রাষ্ট্র প্রায় অকার্যকর করে রেখেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আইন থাকলেও প্রয়োগ না হওয়ায় নারীরা তাদের অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

‘নারীর সাফল্য অনেক পুরুষকে শঙ্কিত করে, এই শঙ্কাই সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে’

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ’ উপলক্ষে ১৬ দিনের কর্মসূচিতে এমজেএফ আয়োজিত এক সংলাপে বক্তারা। ছবি: আজকের পত্রিকা
‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ’ উপলক্ষে ১৬ দিনের কর্মসূচিতে এমজেএফ আয়োজিত এক সংলাপে বক্তারা। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঘরে ও বাইরে সর্বত্র নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। নারীরা কোথাও নিরাপদ বোধ করছেন না। নারীর সাফল্য অনেক পুরুষকে শঙ্কিত করে, এই শঙ্কা সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আজ বুধবার (২৪ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ’ উপলক্ষে ১৬ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত এক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নারীরা এখন কোথাও আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক নিরাপত্তা অনুভব করছেন না। পরিবারের মধ্যেও অনেক সময় তাঁরা নিরাপত্তা বোধ করছেন না, এসব বলে কোনো লাভ হচ্ছে না। এই হতাশা দূর করতে হলে কেবল আইন বা নীতিমালা নয়, সামাজিক শক্তিকেও তৃণমূল থেকে সক্রিয় করতে হবে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ‘বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে মেয়েদের নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। রাজনৈতিক দলগুলো কেন আলাদা ‘‘নারী শাখা’’ রাখবে? নারীরা তো মূলধারার রাজনীতিতেই সমানভাবে কাজ করতে পারবে—এটি স্বীকার করার মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি। তরুণ-তরুণী উভয়ের মাঝেই একটি পশ্চাৎপদতার ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে। এটি ভেঙে নতুন সচেতনতা, সমতা ও সম্মানের ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে হবে।’

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি জানান, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবরে সহিংসতায় নারীমৃত্যুর ঘটনা ৫০৩টি এবং শিশুদের ওপর ৯০৫টি যৌন সহিংসতার ঘটনা সম্পর্কে জানা গেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ৭৮ শতাংশের বেশি নারী ডিজিটাল সহিংসতার শিকার, বিশেষত ফেসবুকে। শাহীন আনাম আবেদন জানান, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতাকে জরুরি ও জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা দরকার।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগের ভূতপূর্ব পরিচালক সেলিম জাহান বলেন, নারীর সাফল্য অনেক পুরুষকে শঙ্কিত করে। আর এ শঙ্কাই সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। নারীর অর্জন যেন সহিংসতার কারণ না হয়, এটা সমাজকে নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষ সমতার কথা উঠলেই এখনো অনেকে আঁতকে ওঠেন। এমনকি কর্মঘণ্টা কমানোর মতো যুক্তি তুলে নারীর সামনে অদৃশ্য বাধা তৈরি করা হয়। নারীর অধিকার ও সমতার পথ রুদ্ধ হলে সমাজ কখনো উন্নত হতে পারে না।

সংলাপে আরও অংশ নেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ; বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংগলি; ইউএন উইমেন, বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং; কানাডিয়ান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট-জেন্ডার ইকুয়ালিটি) স্টেফানি সেন্ট-লরেন্ট ব্রাসার্ড, সুইডেন দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ও ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশনের প্রধান ইভা স্মেডবার্গ, ব্রিটিশ হাইকমিশন ঢাকার ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডসন প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

রীমার ‘আয়নাবিবির গহনা’

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ১২: ৩০
রীমার ‘আয়নাবিবির গহনা’

রীমা খাতুনের জন্ম রাজশাহীতে। সেখান থেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সম্পন্ন করেছেন অনার্স-মাস্টার্স। স্বপ্ন ছিল চাকরি করার। গয়না নিয়ে কাজ করার বা এর প্রশিক্ষক হওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না। তবু শিক্ষকতা থেকে শুরু হওয়া পথচলা তাঁকে নিয়ে এল এক ভিন্ন জগতে। সেখানে এখন তিনি ‘আয়নাবিবির গহনা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও প্রশিক্ষক।

অপ্রত্যাশিত এক শুরু এনজিওতে শিক্ষকতা

২০১৬ সালে নাগরিক উদ্যোগ নামে একটি এনজিওতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন রীমা। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা লেখাপড়া করত। একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানে শিশুদের নাচের প্রস্তুতি চলাকালে তিনি বুঝতে পারেন, তাদের নাচের পোশাক থাকলেও মানানসই গয়নার বাজেট নেই। সেই শিশুদের জন্যই রীমা প্রথমবারের মতো গয়না তৈরি করেন। শৈশবে রাজশাহীতে বড় আপুদের দেখে টুকটাক গয়না বানানোর অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পুঁতি, সুই ও সুতা জোগাড় করে ১৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য পুঁতির গয়না সেট তৈরি করে ফেলেন। শিশুদের এই পারফরম্যান্স এনজিওর প্রধানের মন ছুঁয়ে যায়। এরপর তিনি রীমাকে শুধু গয়নার উপকরণই কিনে দিলেন না, বরং শিশুদের গয়না তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুরোধও করলেন।

২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নাগরিক উদ্যোগে চাকরির পাশাপাশি শুরু হয় রীমার গয়না তৈরির কাজ।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও অনলাইন যাত্রা

২০২০ সালে রীমা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে শিক্ষক হিসেবে নতুন চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়টাতে করোনা মহামারির কারণে সবাই ঘরবন্দী। তৎকালীন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আবুল হোসেন একদিন রীমাকে ডেকে নারীদের জন্য একটি ফ্রি অনলাইন ট্রেনিং চালু করার কথা বলেন। উদ্দেশ্য ছিল, নারীদের ঘরে বসে শেখানো ও আয়ের পথ তৈরি করে দেওয়া। তাঁর উদ্যোগে সেখানে শুরু হয় সেট প্রোগ্রাম ফর উইমেন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে গয়না, ক্রিস্টাল ও গ্রাফিকস—তিনটি ট্রেডে ফ্রি ট্রেনিং শুরু হয়।

করোনার সময়ে ফ্রি ট্রেনিংয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক নারী রেজিস্ট্রেশন করে। ইস্টিমইয়ার্ডের মাধ্যমে শুরু হয় অনলাইন ক্লাস। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ফল হিসেবে ২০২১ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক বছরের জন্য নারীদের ফ্রি কোর্স ও অনুদানের ব্যবস্থা করে। এই সময় প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি আরও বেড়ে যায় এবং হাজার হাজার নারী প্রশিক্ষণের জন্য যোগাযোগ করতে শুরু করে। রীমা সেখানে লুমবিডিং, রেজিন, গামছা গয়নাসহ দেশি সব ধরনের গয়না কৌশল সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তির পর ২০২৩ সালে তাঁরা আবারও জয়িতা ফাউন্ডেশন থেকে এক বছরের জন্য একটি প্রকল্প পান।

‘আয়নাবিবির গহনা’ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরির প্ল্যাটফর্ম

একসময় রীমা তাঁর শিক্ষার্থীদের কাজের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আয়নাবিবির গহনা নামে একটি ফেসবুক পেজ খোলেন। আয়না যেমন মানুষের সৌন্দর্য দেখায়, তেমনি তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে নিজেদের গুণ ও সম্ভাবনাকে প্রকাশ করবে, এটিই ছিল এই নামকরণের মূল ভাবনা। ২০২১ সাল থেকে তিনি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অফলাইনেও প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেন। প্রশিক্ষণের সময় তিনি বুঝতে শুরু করেন, নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও তাদের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন তাঁর স্কুলজীবনের বান্ধবী। তাঁর সহযোগিতায় রীমা শিক্ষার্থীদের তৈরি গয়না পাইকারি দামে কিনে নিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানের উদ্যোক্তারা তাঁদের মেলা, অনুষ্ঠান বা ক্রেতা সম্মেলনের জন্য রীমা খাতুনের কাছ থেকে পাইকারি দামে গয়না নিতে শুরু করেন। বিশেষত লুমবিডিং গয়না বা তাঁতের গয়না।

একঝাঁক নারীর কর্মসংস্থান

রীমা অনলাইন ও অফলাইনে বাংলাদেশ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, সুইডেনসহ আরও কয়েকটি দেশের ৫ হাজারের বেশি নারীকে গয়না তৈরি শেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন শতাধিক নারী। এই নারীরা তাঁকে গয়না সরবরাহ করেন। তাঁদের বেশির ভাগই গৃহিণী বা অবসরপ্রাপ্ত নারী, যাঁরা নিজেদের সময় ও সুযোগমতো কাজ করেন। রীমা শুধু লুমবিডিং গয়না কিনে নেন।

রীমা খাতুন বিশ্বাস করেন, নারীদের হাতের কাজ শেখা এবং টাকা আয় করা জরুরি। তাঁর এই কাজের মূল অনুপ্রেরণা তাঁর নানি ফজিলাতুন্নেছা। তিনি সব সময় রীমাকে গয়না নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন। রীমা ইতিমধ্যে কেয়ার, কুমিল্লা ইউএনও পরিষদসহ দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্যোক্তা সংগঠন, টেলিভিশনের দূরশিক্ষণমূলক অনুষ্ঠানে এবং মাদ্রাসার নারী শিক্ষার্থীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখন তিনি ছায়াতল বাংলাদেশ, অপরাজয় বাংলাদেশ এবং সেট প্রোগ্রাম ফর উইমেনে গয়না তৈরির ট্রেনার হিসেবে কর্মরত।

প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

রীমা খাতুন তাঁর শিক্ষার্থীদের তৈরি করা গয়না ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে প্রকৃত উদ্যোক্তা কম। যাঁরা নিজেদের উদ্যোক্তা বলে পরিচয় দেন, তাঁদের অনেকেরই নিজস্ব পণ্য নেই। তাঁরা অন্যের পণ্য প্রদর্শন করেন এবং এই কারণে প্রকৃত উদ্যোক্তারা আড়ালে থেকে যান। ভবিষ্যতে রীমার একটি কারখানা দেওয়ার ইচ্ছা আছে। এ ছাড়া তিনি হোলসেল বা পাইকারি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে চান।

শিক্ষকতা থেকে গয়না প্রশিক্ষক ও উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা করেছেন রীমা। এই যাত্রায় ফুটে উঠেছে একজন নারীর নিজস্ব শক্তি আবিষ্কারের দারুণ এক গল্প।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ স্বামীর হয়ে তালাক দিতে পারেন না

ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন
শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ স্বামীর হয়ে তালাক দিতে পারেন না

প্রশ্ন: আমার বিয়ের বয়স প্রায় ৭ বছর। ৫ বছরের একটি মেয়ে আছে। তার জন্মের পর থেকে আমার স্বামী আমাদের খোঁজখবর নিত না, ভরণপোষণ দিত না। সে লুকিয়ে বিদেশ থেকে দেশে যাতায়াত করত। আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে যেত না। এসব কারণে বাধ্য হয়ে আমি কোর্টে মামলা করি।

কোর্টে মামলা চলাকালে স্বামী আমার সঙ্গে সংসার করা এবং আমাদের ভরণপোষণ দেওয়ার কথা বলে আপস করে জামিনে বের হয়ে বিদেশে চলে যায়। আমি মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকি এবং মামলা স্থগিত রাখি। এখন সে বিদেশ থেকে কোনো যোগাযোগ করছে না, ভরণপোষণও দিচ্ছে না। এক আইনজীবী আমাকে জানিয়েছেন, আমার শ্বশুর কোর্টে গিয়েছিলেন ডিভোর্সের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু আমার কাছে কোনো নোটিশ আসেনি এখনো। শুনেছি, আমার অনুপস্থিতিতে তালাক বিষয়ে কোর্ট নতুন করে শুনানি করেছেন।

আমার প্রশ্ন, তারা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আমার ও আমার স্বামীর উপস্থিতি ছাড়া মামলার কাগজপত্রে থাকা আমার স্বাক্ষর জাল করে আমার শ্বশুর কি আমাদের বিবাহবিচ্ছেদ করাতে পারেন?

উত্তর: আপনার বিষয়টি সত্যিই খুব সংবেদনশীল ও কষ্টদায়ক। প্রথমত, আপনার উপস্থিতিতে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব কি না। বাংলাদেশের আইনে এটা তিনভাবে হতে পারে।

১. স্বামীর পক্ষ থেকে একতরফা তালাক

বাংলাদেশে স্বামী নিজেই তালাক দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তালাকনামা অবশ্যই লিখিত করতে হবে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা অথবা সিটি করপোরেশনে নোটিশ পাঠাতে হবে, ওই অফিস থেকে আপনার নামে রেজিস্ট্রি ডাক বা নোটিশ যাবে। আপনি নোটিশ না পাওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ স্বামীর হয়ে তালাক দিতে পারেন না। এটি পুরোপুরি অবৈধ।

২. আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের রায়

এ ক্ষেত্রে, মামলার বাদী থাকেন স্বামী বা স্ত্রী। আপনাকে নোটিশ দিতে হবে, আপনি আদালতে হাজির না হলে আদালত ‘একতরফা রায়’ দিতে পারেন। কিন্তু আপনার নামে সই জাল করে মামলা করা সম্পূর্ণ অপরাধ—আইনে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আপনি নোটিশ না পেলে আদালত আপনাকে অনুপস্থিত দেখিয়ে রায় দিতে পারেন না। অর্থাৎ, আপনার উপস্থিতি ছাড়া আদালতের ডিভোর্স তখনই সম্ভব, যখন আপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আপনি তা গ্রহণ করেছেন।

৩. আপনার পক্ষ থেকে তালাক: আপনি নিজে আবেদন না করলে এটি সম্ভব নয়।

আপনি জানতে চেয়েছেন, আপনার অনুপস্থিতিতে হওয়া শুনানিতে আদালত আপনার তালাক কার্যকর করবেন কি না। এর উত্তর হচ্ছে, শুধু এক দিন অনুপস্থিত থাকলে ডিভোর্স হয়ে যায় না। আদালত সাধারণত পুনরায় সমন বা নোটিশ পাঠান অথবা অনুপস্থিত থাকলে আরেকবার সময় দেন অথবা বারবার অনুপস্থিত থাকলে একতরফা রায় দিতে পারেন। কিন্তু তবু আপনাকে নোটিশ পাঠানো ছাড়া আদালত কোনো রায় দিতে পারেন না।

এখন অবিলম্বে আপনার মামলার নথি যাচাই করা উচিত। আপনার উকিলকে বলুন, আদালত থেকে মামলার অর্ডার শিট সংগ্রহ করে দিতে এবং গত শুনানিতে আসলে কী হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে। এতে আপনি নিশ্চিত হবেন, আদালত আদৌ কোনো রায় দিয়েছেন কি না। আপনার শ্বশুর জাল কাগজ জমা দিয়ে থাকলে আপনি স্বাক্ষর জাল করার অপরাধে ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। আদালতে পিটিশন দিয়ে জানাতে পারেন, এটা আপনার স্বাক্ষর নয় অথবা মামলাটি বাতিল করাতে পারেন।

স্বামী তালাক দিয়ে থাকলেও প্রথমে নিশ্চিত হোন। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় গিয়ে জিজ্ঞেস করুন আপনার নামে কোনো নোটিশ এসেছে কি না। নোটিশ না এলে এখনো তালাক কার্যকর হয়নি।

আপনার অধিকার

আপনার স্বামী দায়িত্ব না নিলে ভরণপোষণের মামলা চালিয়ে যেতে পারবেন, সন্তানের সব অধিকার আপনার কাছে থাকবে।

পরামর্শ দিয়েছেন

ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত