Ajker Patrika

হাইকোর্টকে উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের দিতে যাচ্ছে সরকার: রুহিন হোসেন প্রিন্স

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন’ ব্যানারে ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দিব না’ শীর্ষক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন’ ব্যানারে ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দিব না’ শীর্ষক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

আন্দোলন ও হাইকোর্টের বক্তব্য উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে ইউনূস সরকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

আজ সন্ধ্যায় ‘বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন’ ব্যানারে ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দিব না’ শীর্ষক প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এ সময় সামনে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানিয়ে সিপিবির সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সরকার এর মধ্যে দাবি না (বন্দর চুক্তি বাতিলের দাবি) মানলে আগামী ৪ ডিসেম্বর যমুনার অভিমুখে আমাদের বিক্ষোভ সমাবেশ করা হবে।’ দাবি আদায় না করা পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না বলে জানানো হয় ওই সমাবেশ থেকে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আদালতে একটা মামলা ছিল (বন্দর নিয়ে), সেইখানে আমাদের মাননীয় বিচারপতিরা ওনারা মৌখিকভাবে বলেছেন, নিষ্পত্তি হওয়ার আগে আর কিছু করা যাবে না। অথচ আমাদের আন্দোলন ও হাইকোর্টের বক্তব্য উপেক্ষা করে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ওই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়ার জন্য ইউনূস সরকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছে। বন্দরের ব্যাপারে লিজ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নাই।’

এখতিয়ার বহির্ভূত ও বেআইনিভাবে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়ার প্রচেষ্টা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অভিযোগ করে প্রিন্স বলেন, ‘২০০৬ সালে নোবেল পাওয়ার পরে ড. ইউনূস দেশে ফিরেই চট্টগ্রাম বন্দর উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। আজ ১৯ বছর পরে এসে তিনি বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করছে। জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদারি করতেই বন্দর ইজারার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আমরা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ববিরোধী আমাদের জাতীয় সম্পদকে ওই বিদেশিদের হাতে দেব না। সরকার চুক্তি থেকে সরে না আসলে হরতাল, অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করে দাবি আদায় করা হবে।’

ইন্টেরিম সরকারের উপদেষ্টার বাইরে আরও দুজন ব্যক্তি লুতফে সিদ্দিকী ও আশেক চৌধুরী এই বিষয়ে জড়িত বলে উল্লেখ করে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘২৫ থেকে ২৭ তারিখের মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়, আইন শাখা ও আমাদের এনআরবি এইখানে চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষকে নিয়ে বন্দর ডিপিকে দেওয়া হবে কি না, তা পর্যালোচনার জন্য তিন-চার দিনের একটি সভা করতে চায়। এই বন্দর যে ডিপিকে দেওয়া হবে—এইটা পর্যালোচনার জন্য। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আমেরিকার নৌবাহিনীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।’

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে, দরকার হলে ভালো মেশিনারি বা এক্সপার্ট এনে আমাদের নিজস্ব মালিকানায় বন্দর চালানো উচিত।’

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, ‘চট্টগ্রামের লালদিয়া চর ৩৩ বছর এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য ডেনমার্কের কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিল এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের ফুসফুস। এটি কোনোভাবেই বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।’

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন’ ব্যানারে ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দিব না’ শীর্ষক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন’ ব্যানারে ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দিব না’ শীর্ষক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, ‘বন্দর ইজারা দেওয়ার চুক্তির শর্ত গোপন রাখা হয়েছে, যা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে যে নিশ্চয়ই চুক্তির ধারায় কোনো দেশবিরোধী কিছু থাকতে পারে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বাস্থ্য রক্ষা করার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাদের মূল্য দিতে হবে এবং সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।’ অবিলম্বে জনগণকে অবগত না করে যে চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়েছে—তা থেকে সরে আসারও আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু অংশ ইজারা দেওয়া হচ্ছে একটি ডেনমার্কের কোম্পানির কাছে, যার সাথে আমেরিকার যোগ সাজেশ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সকল আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই সংঘটিত হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। দেশের সরকারের নিজস্ব বিনিয়োগে সেই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে এটি আরও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সামর্থ্য রয়েছে। এই লাভজনক প্রতিষ্ঠানটিকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।’

বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হলে আমেরিকা সেখানে ঘাঁটি গাড়বে বলে মন্তব্য করে রঞ্জন দে বলেন, বিদেশি কোম্পানির কাছে বন্দর তুলে দেওয়া হলে সেখানকার শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন ও জীবিকা হুমকির মধ্যে পড়বে এবং তাঁরা ছাঁটাইয়ের শিকার হবেন। বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হলে আমেরিকা সেখানে ঘাঁটি গাড়বে এবং অন্য বিদেশিরাও সেখানে ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. এম এ সাঈদ বলেন, ‘দেশের সকল জাতীয় ও কৌশলগত সম্পদের মালিক দেশের জনগণ। দেশের জনগণকে অন্ধকারে রেখে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সরকারের নেই। সরকার যে অজুহাতে বন্দর ইজারা দিতে চায়, সেটি যুক্তিযুক্ত নয়। দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বন্দর পরিচালনা করতে হবে। আগামী দিনে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আমরা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করব।’

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির কার্যকরী সভাপতি আনোয়ার হোসেন রেজা, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নান্নু, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন, বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াত এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ—বিসিএলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান।

সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. শাহীন রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. এস এম ফজলুর রহমান, বাংলাদেশ ছাত্রলী— বিসিএলের সভাপতি গৌতম শীলসহ প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মশাল মিছিলটি প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে পুরানা পল্টন মোড়, জিরো পয়েন্ট ঘুরে পুনরায় পুরানা পল্টন মোড়ে এসে শেষ হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...