Ajker Patrika

হাসিনা পরিক্রমা: প্রভাবশালী রাজনীতিক যেভাবে মৃত্যুদণ্ডের ফেরারি আসামি

রয়টার্স
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

গত বছর ছাত্র আন্দোলনে প্রাণঘাতী দমন–পীড়নের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী এই ব্যক্তির রাজনৈতিক পথচলাও শুরু হয়েছিল রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়েই।

১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানে তাঁর বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর হঠাৎ করেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সামনে আসেন। শুরুর দিকে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলেও পরের দীর্ঘ শাসনকাল গণতন্ত্র হরণের জন্য নিন্দিত হয়েছে। বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, বাকস্বাধীনতা সংকোচন ও ভিন্নমত দমনের একের পর অভিযোগে তার সেই সংগ্রাম চাপা পড়ে গেছে।

ছাত্র আন্দোলনের মুখে গতবছর আগস্টে পদত্যাগ করে দেশে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ১৫ মাস পর আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। হত্যার দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডও দিল।

গণতন্ত্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে এক কাতারে লড়েছিলেন

ক্ষমতায় চরম সমালোচিত হলেও ১৭ কোটি মানুষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো এবং তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণের জন্য কৃতিত্ব পেয়ে আসছিলেন হাসিনা। মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মহল থেকেও তিনি প্রশংসিত হন।

কিন্তু সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের সূত্র ধরে তাঁর পতন হলো, যে আন্দোলনটি দ্রুতই তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল। পঞ্চমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাত্র সাত মাসের মধ্যেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

ভারতে নির্বাসন থেকে হাসিনা মানবতাবিরোধী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এই রায় ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক ও নিরপেক্ষ আদালতে বিচার হলে আমি অভিযোগকারীদের সামনে দাঁড়াতে ভয় পাই না।’ রাষ্ট্রনিযুক্ত তাঁর আইনজীবীও আদালতে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

জাতিসংঘের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে সর্বোচ্চ ১,৪০০ মানুষ নিহত হতে পারে এবং সরকারি নির্দেশেই বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা ও দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে—এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে।

১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিষ্ঠিত এবং হাসিনার আমলে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই এবার তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নাটকীয় মোড় এনে দিল। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের সময় ইউরোপে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি, সেই থেকেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু।

১৯৪৭ সালে গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া হাসিনা শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন্নেছার পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তাঁর বাবার যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পঁচাত্তরের অভ্যুত্থানের পর ভারতে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থেকে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন হাসিনা। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে হটাতে কট্টর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার সঙ্গে মিলে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। তবে এ মিলন বেশিদিন টেকেনি। ‘বেগমদের দ্বন্দ্ব’ নামে পরিচিত দুই নেত্রীর তিক্ত লড়াই পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ রাজনীতিকে বিভক্ত করে দেয়।

১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন হাসিনা। পাঁচ বছর পর বিরতি দিয়ে ২০০৯ সালে ফের ক্ষমতায় ফিরে টানা চার মেয়াদ দেশ চালান।

অভিযোগ, পতন ও নির্বাসন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী শাসনের অভিযোগ বাড়তে থাকে। বিরোধী নেতা ও কর্মীদের গণগ্রেপ্তার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা— এসবই তাঁর শাসনের ‘অন্ধকার দিক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, দেশটিতে কার্যত একদলীয় শাসন কায়েম হয়। তবে হাসিনার দাবি ছিল—স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থেই শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দী হন। তাঁর দল অভিযোগ করে, হাসিনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব মামলা করেছেন। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। উভয় নেত্রী একে অপরকে গণতন্ত্রকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করতেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের একসময়ের দ্রুতগতির অর্থনীতি গতি হারায়। ফলে গত বছর বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নিতে হয়।

গত বছরের আগস্টে অভ্যুত্থানের মুখে সেনা হেলিকপ্টারে বোনকে নিয়ে দেশ ছাড়ার পর হাসিনার পতন চূড়ান্ত হয়। এরপর উল্লসিত বিক্ষোভকারীরা কোনো বাধা ছাড়াই তাঁর বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করে আসবাবপত্র, টেলিভিশনসহ নানা সামগ্রী লুটে নিয়ে যায়।

এরপর থেকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তিনি হাসিনার সমালোচনার লক্ষ্য ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে এবং হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিতও হয়েছিলেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে যে জাতীয় নির্বাচনের কথা রয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না—এমন ঘোষণা দিয়েছেন ইউনূস।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...