Ajker Patrika

অতীতের সবকিছু কি ভোলা যায়

সেঁজুতি মুমু
দীর্ঘ ২৪ বছরের নিপীড়ন ভোলা কি এত সহজ? ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ২৪ বছরের নিপীড়ন ভোলা কি এত সহজ? ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (এফ) সভাপতি এবং দেশটির সাবেক মন্ত্রী মাওলানা ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘পাকিস্তান সব সময় বাংলাদেশের কল্যাণ, উন্নতি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা কামনা করে। বাংলাদেশকে তারা ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে মনে করে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ভাই ভাই, অতীতের সবকিছু তারা ভুলে গেছে। অতীতের সবকিছু আমরা ভুলে গেছি!’ এই কথাটা শুনে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বিখ্যাত ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল।

‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে—এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?’

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ভাই ভাই—এই কথাটা অবধি আমার কোনো আপত্তি ছিল না। প্রশ্ন হলো, অতীতের সব ভুলে ভাই ভাই কীভাবে হওয়া সম্ভব? আমি অতীতের সব ভোলার কথাকে মোটেও সমর্থন করছি না। তবে বিশ্বযুদ্ধের পরও বিশ্বের যেসব দেশ শত্রু ছিল, তারা এখন বন্ধু। বন্ধু হতে দোষ নেই, তবে অতীত ভোলা যাবে না। ১৯৪৭-৭১ সাল অবধি দীর্ঘ ২৪ বছরের নিপীড়ন ভোলা এত সহজ? লাখ লাখ শহীদের রক্ত, লাখ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, সেই অতীত ভুলে যাওয়া সম্ভব? তিনি কীভাবে বলতে পারলেন কথাটি।

বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বিরোধ নেই। চিরকাল কোনো দেশ শত্রু থাকতে পারে না। নিজের দেশের স্বার্থে পুরোনো শত্রুর সঙ্গে বন্ধুতা করাই শ্রেয়। শত্রুতা খালি ধ্বংস বয়ে আনে। তবে তার মানে এই নয় যে অতীত ভুলে যাব। এক কোটি বাস্তুহারা শরণার্থীর কান্না ভুলে যাওয়া অসম্ভব। আমরা জেন-জি প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের রক্তের প্রতিটা কণায় মিশে আছে। কারণ, আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানি—মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টারি ও সিনেমা দেখে এবং মা-বাবা, দাদা-দাদির কাছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর গল্প শুনে। শুধু জেন-জি প্রজন্ম কেন, আগামী দিনের অনাগত প্রজন্মও ভুলবে না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। কোনো বিকৃত ইতিহাস নয়, বরং আমাদের রক্তের ইতিহাস। তা ভুলে যাওয়া অসম্ভব। আমি নিশ্চিত, পাকিস্তানে যদি এই রকম হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটত, তবে তিনি এই কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না।

আমি বারবার একই কথা বলব, বাংলাদেশ-পাকিস্তান বন্ধু হতেই পারে, কিন্তু অতীত ভুলে নয়। বর্তমানে দুই দেশের স্বার্থে বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক চুক্তি করবে। একে অন্যের সাহায্য করবে, বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরের মধ্যে সম্পদ, শিক্ষা বিনিময় করবে, একত্রে গবেষণা করবে, পরস্পর পরস্পরের দেশে সফর করবে। এই তো হবে একই মহাদেশে অবস্থিত দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক। কিন্তু তাই বলে অতীত ভোলা অসম্ভব।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সব আলাদা। তবে তা দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে বাধা হবে না। বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। একে অপরের শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি থেকে অনেক কিছু শিখবে। একে অপরের ভালো দিকগুলো নেবে। কিন্তু তাই বলে যে অতীত ভুলে যাব, তা সম্ভব নয়। আমাদের ভাইয়ের রক্ত, আমাদের মা-বোনের সম্ভ্রম, বাস্তুহারা পরিবারের আর্তনাদ আজ ৫৪ বছর পর কেন, হাজার বছরেও ভোলা অসম্ভব। যেভাবে আজও মানুষ ভোলেনি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, ভোলেনি হাজার বছর আগের সহিংস যুদ্ধগুলোর ইতিহাস। তেমনি বাংলাদেশিরা কোনো দিনও ভুলতে পারবে না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

মাওলানা ফজলুর রহমানের উদ্দেশে বলতে চাই, নিজের প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস আমরা কোনো দিন ভুলব না। কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হবে বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে, কিন্তু ১৯৪৭-৭১-এর পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য সম্ভব নয়। সেই প্রজন্ম চলে গেছে, অনেকে বেঁচে আছে হয়তো। কিন্তু আমাদের বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ নেই। আসুন, আমরা একসঙ্গে গবেষণা করব, বাণিজ্যিক চুক্তি করব, কিন্তু দুঃখিত, আমাদের অতীত ভোলা সম্ভব নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...