Ajker Patrika

ভূমিকম্পের ক্ষতি রোধে জাতীয় উদ্যোগ জরুরি

ড. মুনাজ আহমেদ নূর
ভূমিকম্পের ক্ষতি রোধে জাতীয় উদ্যোগ জরুরি

নরসিংদীতে ২১ নভেম্বর সংঘটিত ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প দেশের ভূমিকম্পজনিত গভীর ঝুঁকির বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পনটি ছিল দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ভূকম্পন। ভবন কেঁপে ওঠায় হাজারো মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় বের হয়ে আসে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুর খবর আসে, অনেকে আহত হয় মূলত দুর্বল স্থাপনার ভাঙা অংশের নিচে চাপা পড়ে। মাত্রায় মাঝারি হলেও এই ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দিল অস্বস্তিকর সত্যটি—সক্রিয় টেকটোনিক ফল্টলাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ অনেক বড় ভূমিকম্পের মুখোমুখি হতে পারে যেকোনো সময়। বহু তরুণের জন্য এটি ছিল ভূমিকম্পের সঙ্গে প্রথম সরাসরি পরিচয়, যা সরকারকে বিষয়টিকে ‘গুরুতর সতর্কবার্তা’ হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য করেছে। ইতিহাস, বিজ্ঞান ও আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এখন একই কথা বলছে—প্রস্তুতির জন্য সময় আর খুব বেশি নেই।

বিশ্বে যেসব দেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকে, তারা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক দেখিয়েছে, কঠোরভাবে প্রয়োগযোগ্য আধুনিক বিল্ডিং কোড প্রাণ বাঁচায়। তুরস্ক ১৯৯৮ সালে কোড শক্ত করার পর ২০২৩ সালের ভূমিকম্পে নতুন ভবনগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক ভালোভাবে টিকে গিয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় দুর্বল ইটের ভবন ও ‘সফট-স্টোরি’ স্থাপনার বাধ্যতামূলক রেট্রোফিটিং (পূর্বে নির্মিত বিল্ডিং বা কাঠামোয় নতুন কিছু সংযোগ করে, একে আরও শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া) মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। এ কারণে ভবন এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে কম্পনের সময় বাঁকতে পারে, কিন্তু ভেঙে না পড়ে। আর নিয়ম শুধু কাগজে নয়, প্রয়োগে নিশ্চিত করতে হবে।

জাপান এ ক্ষেত্রে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ১৯৯৫ সালের কোবে ভূমিকম্পের পর দেশটি ব্যাপক আইন সংস্কার এনে রেট্রোফিটিংকে বাধ্যতামূলক ও উৎসাহপ্রদায়ক করেছে। আজ দেশটির ৮০ শতাংশের বেশি ঘরবাড়ি ভূমিকম্প-সহনশীল। সারা দেশে স্কুল, হাসপাতাল, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রেট্রোফিটিং হওয়ায় ২০২৪ সালের উত্তর জাপানের ভূমিকম্পে প্রাণহানি সীমিত রাখতে পারা সম্ভব হয়েছে। স্টিল ব্রেসিং, গ্রাউন্ড ফ্লোর শক্তিশালীকরণ, কলামে ফাইবার র‍্যাপ—এ ধরনের রেট্রোফিটিং এখন কার্যকর ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী।

উন্নত প্রকৌশলব্যবস্থা ঝুঁকি কমানোর অতিরিক্ত স্তর তৈরি করতে পারে। জাপানে হাজারো ভবনে ব্যবহৃত বেস আইসোলেশন ও টিউনড মাস ড্যাম্পার প্রযুক্তি বড় ভূমিকম্পেও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সচল রাখতে সহায়তা করেছে। অটোমেটিক গ্যাস শাট-অফ ভালভের মতো সহজ উদ্ভাবনও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর। আর টোকিওতে এগুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। জাপান প্রতিবছর জাতীয় মহড়া চালায়, যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলো স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং জনসচেতনতা বাড়ায়। মোবাইল ও টিভির মাধ্যমে আগে থেকে সতর্কবার্তা দিলে ঝুঁকি কমাবে। যেটা জাপান, মেক্সিকো ও ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রচলিত। বাংলাদেশে এখনো এমন ব্যবস্থা নেই, কিন্তু এ মডেলগুলো গ্রহণ করা সম্ভব। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলে—প্রতিরোধে ব্যয় দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতির তুলনায় বহুগুণ কম।

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে শক্তিশালী করার ব্যয়। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে এ ধরনের ব্যাপক রেট্রোফিটিং করা চ্যালেঞ্জ হলেও, তা যেকোনো উপায়ে কার্যকর করার পথ খোঁজা জরুরি। কেবল ঢাকা শহরেই বড় একটি ভূমিকম্প প্রায় ৬৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করতে পারে, যা প্রতিরোধমূলক ব্যয়ের বহুগুণ। তা সত্ত্বেও বাজেট-সংকট ও গৃহমালিকদের অনীহায় সেটা করা হচ্ছে না।

বহুমাত্রিক অর্থায়ন কৌশল জরুরি। সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—হাসপাতাল, স্কুল, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, বিদ্যুৎ-গ্যাস নেটওয়ার্ক—যেগুলো সংকটে সচল থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিশ্ব উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থা ও অন্য দেশের সহযোগিতা নিয়েও উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা। বৈশ্বিক এক তথ্য থেকে জানা যায়, রেজিলিয়েন্সে (আগের অবস্থায় ফিরে আসা) বিনিয়োগ করা প্রতি ১ ডলার ভবিষ্যৎ ক্ষতি থেকে ৪ ডলার বাঁচায়। বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে সম্পত্তি কর রিবেট, ইউটিলিটি ডিসকাউন্ট, শূন্য-সুদের রেট্রোফিটিং ঋণ ও জাতীয় ভূমিকম্প রেজিলিয়েন্স তহবিল গঠন করা যেতে পারে। ব্যাংকগুলো স্বল্পসুদের ঋণ দিতে পারে, আর তুরস্কের ‘ড্যাস্ক’ মডেল অনুসরণ করে ভূমিকম্প বিমা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

নতুন কিছু নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থায়ন সরাসরি ভূমিকম্প-নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ব্যাংকগুলো যেন ঋণ দেওয়ার আগে সার্টিফায়েড স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বাধ্যতামূলক করে। মানদণ্ড ছাড়িয়ে গেলে দ্রুত অনুমোদন বা অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া দেওয়া যেতে পারে। নিয়ম ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি, এমনকি ভবন ভেঙে ফেলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ দুর্যোগ বন্ড বা আঞ্চলিক বিমা পুলে যুক্ত হতে পারে। বড় নগর প্রকল্পে সামান্য ‘রেজিলিয়েন্স সারচার্জ’ আরোপ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রেট্রোফিটিংয়ে অর্থ জোগানো সম্ভব। সরকার, উন্নয়ন-সহযোগী, বেসরকারি খাত ও জনগণের সমন্বয়েই নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

তবে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও দ্রুত প্রযুক্তি ব্যবহার করা। রাজউক, বুয়েট ও সামরিক প্রকৌশল দলগুলোকে ফাটল ধরা ভবন, বিশেষত পুরান ঢাকা পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত খালি করতে হবে। নাগরিকদের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাঠাতে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ডে সব তথ্য জমা হয়। আফটারশক সতর্কতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তা পরীক্ষা ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধও জরুরি। ড্রোন, রিমোট সেন্সিং ও এআই ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব। গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে ভূমিকম্পে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, জরুরি কিটে কী থাকবে—এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোডকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে সব পৌরসভায়, যার জন্য প্রয়োজন বিল্ডিং সেফটি সেল, প্রশিক্ষিত পরিদর্শক ও কাঠামো প্রকৌশলী। তুরস্ক ও ভারতের মডেল দেখে রাবার বিয়ারিং, ফাইবার-রিইনফোর্সড পলিমার, ইঞ্জিনিয়ার্ড বাঁশ এবং গ্রাউন্ড ফ্লোর শক্তিশালীকরণের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তির পাইলটিং করা যায়। জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকে আধুনিক সরঞ্জাম, নিয়মিত মহড়া ও ডিজিটাল সমন্বয় ব্যবস্থা দিতে হবে। স্কুল কারিকুলাম, কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও প্রশিক্ষিত রাজমিস্ত্রি নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক এলাকায় কম খরচে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। নীতি সংস্কার, স্ট্রাকচারাল ফিটনেস সার্টিফিকেট ও রেট্রোফিটিং ঋণব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।

দীর্ঘ মেয়াদে (৫ বছরের বেশি) নগর-পরিকল্পনাকে ভূমিকম্প-সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। সব নতুন ভবনকে ভূমিকম্প-নিরাপদ ডিজাইনে নির্মাণ করতে হবে এবং পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে রেট্রোফিট বা সরিয়ে ফেলতে হবে। ডিজিটাল পারমিটিং সিস্টেম ও এআইভিত্তিক কমপ্লায়েন্স চেকের মাধ্যমে শুধুই কোডসম্মত নকশা অনুমোদন দেওয়া উচিত। শহর পরিকল্পনায় ভূমিকম্প-ঝুঁকির মানচিত্র, প্রশস্ত রাস্তা, উন্মুক্ত স্থান ও টেকসই অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সফলতা নির্ভর করবে ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি, স্থানীয় গবেষণা সহায়তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও শহরব্যাপী ডিজিটাল ঝুঁকিম্যাপ যুক্ত হলে প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে।

নরসিংদীর ভূমিকম্প মাত্রায় মাঝারি হলেও বাংলাদেশ ভূমিকম্প-ঝুঁকি থেকে নিরাপদ—এমন ভুল ধারণাকে সম্পূর্ণ দূর করেছে। প্রশ্ন এখন আর ‘কবে হবে’ নয়, বরং ‘যখন হবে তখন আমরা কতটা প্রস্তুত?’ এখন প্রয়োজন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ—নিয়ম প্রয়োগ, প্রস্তুতি বৃদ্ধি, ত্রাণ-প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে সফল মডেল অনুসরণ। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, কমিউনিটি প্রশিক্ষণ ও বুদ্ধিমান নগর-পরিকল্পনার ভূমিকা অবহেলা করা যাবে না। যেভাবে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশ্বমানের সক্ষমতা অর্জন করেছে, ঠিক সেভাবেই ভূমিকম্প প্রস্তুতিতেও ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক সমাধানের সমন্বয় ঘটাতে হবে। আজকের উদ্যোগ ও টেকসই বিনিয়োগই বাংলাদেশকে ঝুঁকির চক্র থেকে বের করে একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...