Ajker Patrika

আসামে ভোটার তালিকা সংশোধনে আতঙ্ক

প্রবীর প্রামাণিক
আসামে নাগরিকত্বের প্রশ্ন শুধু আইনি নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিকও। ছবি: সংগৃহীত
আসামে নাগরিকত্বের প্রশ্ন শুধু আইনি নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিকও। ছবি: সংগৃহীত

ঘোষণাটি এসেছিল খুবই নীরবে—সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় ছাপা হয়েছিল, যা সাধারণত মানুষের নজরেই পড়ে না। সেই খবরে বলা হয়েছিল, ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) জানায়, ২০২৬ সালের রাজ্য নির্বাচনের আগে আসাম বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া হাতে নিচ্ছে। এটি পূর্ণাঙ্গ নতুন তালিকা প্রণয়ন নয় বরং একটি সংশোধন—দরজায় দরজায় গিয়ে যাচাই-বাছাই, ত্রুটি সংশোধন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে খসড়া তালিকা এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।

তখন কর্তৃপক্ষ বলেছিল এটি একেবারেই নিয়মিত, টেকনিক্যাল কাজ। কিন্তু আসামে, যেখানে নাগরিকত্বের প্রশ্ন শুধু আইনি নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিক এবং অনেকের কাছে অস্তিত্ব-সংকটের বিষয়—এই ঘোষণা যেন পুরো আকাশে এক অদৃশ্য কম্পন তৈরি করল।

আসামের এলাকাগুলোতে, শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে বদলে যাওয়া নদীবলয়ের দ্বীপগুলোতে খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই চোখে পড়েছে স্পষ্ট উদ্বেগ। এই বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে বসবাসকারী বহু বাংলাভাষী মুসলিমের কাছে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়াটি নিছক প্রশাসনিক আপডেট নয়; বরং ধীর, কিন্তু নিরলস চাপ সৃষ্টির নতুন এক পর্ব।

ইসিআই যে প্রক্রিয়া বেছে নিয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে সহজ: বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও) পূর্ণ করা রেজিস্টার নিয়ে বাড়ি-বাড়ি ঘুরবেন, তথ্য মিলিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করবেন। যাঁদের নাম ইতিমধ্যেই ‘ডি-ভোটার’ (সন্দেহভাজন ভোটার) হিসেবে চিহ্নিত, তাঁদের নাম খসড়া তালিকায় বহাল থাকবে, তাঁদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে বিতর্কিত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। কাগজে-কলমে এগুলো সবই মানক পদ্ধতির মতো। কিন্তু আসামে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়; এগুলো গভীরভাবে রাজনৈতিক। এই রাজনীতিই ব্যক্তিগত জীবনে তীব্রভাবে প্রভাব ফেলে।

সম্পূর্ণ পুনঃ তালিকা এড়িয়ে সংশোধনে যাওয়াকে অনেকে দ্বিমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। ইসিআই, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এনআরসির অভিজ্ঞতার পর, নতুন করে বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক থাকতে চাইছে—এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক সময়ে অনুমোদন দিয়েছে, যখন রাজ্যজুড়ে ‘জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ নিয়ে উত্তাপ তুঙ্গে, যা ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার।

‘বিএলওর একটি সাধারণ নক পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের মতো মনে হয়,’ ধুবরির এক অধিকারকর্মীর কথায়। ‘কারণ, এই আবহে আমাদের সবকিছুই সন্দেহের চোখে দেখা হয়।’ বারপেটা, গোলপাড়া, ধুবরি, বঙাইগাঁও ও দক্ষিণ সালমারার বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য এই ভীতি একেবারেই বাস্তব।

নদীবলয়ের বার্ষিক বন্যা শুধু ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দেয় না; ব্যক্তিগত ইতিহাসও ধুয়ে নিয়ে যায়। স্কুল সার্টিফিকেট, রেশন কার্ড, জমির কাগজ, ভোটার আইডি—যে নথিগুলো প্রমাণ করে ১৯৭১ সালের আগে বসতি—সেগুলোই জলধারার সবচেয়ে সহজ শিকার। ‘ঘর তো বানানো যায়,’ বলেন বাগবারের এক কৃষক। ‘কিন্তু ১৯৭১ সালের আগের কাগজপত্র কীভাবে আবার তৈরি করব?’ বিএলও যখন পূর্বলিখিত তালিকা নিয়ে আসে, তখন একটা ভুল, একটা অনুপস্থিত কাগজ—হতে পারে বাদ যাওয়ার কারণ।

গত তিন বছরে আসাম বহু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে সরকারি বা বনভূমি দখলমুক্ত করার নাম করে। তবে এর প্রধান শিকার হয়েছে বাংলা-উৎপত্তির মুসলিমরা। হঠাৎ বুলডোজার এসে গ্রাম গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যে পরিবারগুলো প্রজন্ম ধরে সেখানে বাস করত, তারা উচ্ছেদ হয়ে পড়েছে।

এখন এই বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে যাচ্ছে বিএলও—তাদের সেই ঠিকানার প্রমাণ চাইতে, যা বাস্তবে আর নেই। সমাজের চোখে ঘটনাক্রমটি স্পষ্ট ও কৌশলগত: ‘আমাদের জমি থেকে সরিয়ে দেন, তারপর বলেন প্রমাণ দেখাও আমরা এখানে ছিলাম,’ বলেন সিপাঝাড়ের এক স্কুলশিক্ষক, এখন আত্মীয়ের আঙিনায় আশ্রিত। ‘আমরা আর কী বুঝব?’

মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত ‘জনসংখ্যাগত আক্রমণ’, ‘ভূমি দখল’, ‘জনসংখ্যা দখল’ নিয়ে বক্তব্য এখন রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রে। যখন একজন মুখ্যমন্ত্রী পুরো একটি সম্প্রদায়কে বারবার হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন সাধারণ প্রশাসনিক কাজও বঞ্চনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বারপেটার এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর কথায়—‘রাষ্ট্র যখন তোমাকে অনুপ্রবেশকারী বলে, তখন ভোটার তালিকা সংশোধন আর নিরীহ প্রক্রিয়া থাকে না—এটা যেন তোমার অস্তিত্বের ওপর রায়।’ এই কারণেই ‘জাতিগত নিধন’ শব্দটি উঠে আসছে—হঠাৎ সহিংসতা নয়; বরং ধীর, কাগজপত্রের ভেতর দিয়ে চালানো এক নিঃশব্দ বিলোপ। যাকে বলা যায় আমলাতান্ত্রিক মুছে ফেলা।

ভীতি যত বাড়ছে, তত সংগঠিত হচ্ছে রাজনীতি। আসামের প্রধান মুসলিমভিত্তিক দল এআইইউডিএফ, যার নেতৃত্বে আছেন ধুবরির সাবেক সাংসদ ও ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন আজমল—তারা তিনটি স্তরে লড়াই শুরু করেছে।

এআইইউডিএফ বড় পরিসরের মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আইনজীবীদের দল এখন থেকেই সাক্ষ্য, হলফনামা ও পুরোনো কেস ফাইল সংগ্রহ করছে। দলটি মনে করছে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নাম বাদ পড়বে, যেগুলোকে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হবে।

‘আমরা আগেই প্রস্তুতি নিচ্ছি’—বলেন দলের এক সিনিয়র আইনি উপদেষ্টা। ‘প্রথম দিন থেকেই নজরদারি থাকবে।’

আদালত এক যুদ্ধক্ষেত্র; জনপদ আরেকটি। দলীয় কর্মীরা প্রতিটি বুথ চিহ্নিত করে দেখছেন কোন পরিবারগুলোর কাগজপত্র অসম্পূর্ণ। তাঁরা ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ, হলফনামা তৈরি, পুরোনো স্ক্রিপ্ট নোটারি—সবকিছুতে সহায়তা করছেন। এমনকি স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে—বিএলও এলে তাঁরা সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বারপেটা রোডের একজন সংগঠকের ভাষায়: বিএলও যে দরজায় কড়া নাড়াবে, সেখানে একজন সাক্ষী থাকবে।

ক্ষমতাসীন দলের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রক্ষা’—এই তর্কের পাল্টা হিসেবে এআইইউডিএফ গল্প বলছে যে কারা প্রকৃতপক্ষে হুমকির মুখে: বুড়ো কৃষক, চাকরিজীবী, বিধবা, স্কুলশিক্ষক, এমনকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরাও। তাঁদের প্রোফাইল নথিবদ্ধ করে মিডিয়া প্রচারণার প্রস্তুতি চলছে।

আজমল বিলাসিপাড়ার এক সভায় বলেছেন: ‘দেশকে দেখান কারা ঝুঁকিতে। এরা অনুপ্রবেশকারী নয়; এরা আসামের নিজস্ব মানুষ।’ এ ছাড়া ছাত্রসংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধী দলের সঙ্গে জোট গড়ার চেষ্টাও চলছে—যাতে বিষয়টি গণতান্ত্রিক অধিকারের বৃহত্তর লড়াই হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

আগামী মাসগুলো ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এবং মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষতার পরীক্ষা দিতে হবে। বিচারব্যবস্থা নির্ধারণ করবে—বেশি মাত্রায় নাম বাদ পড়লে তা সংবিধানের পরীক্ষায় টিকবে কি না। আর রাজনৈতিক দলগুলো লড়বে মূল প্রশ্নটি নিয়ে: আসামে কাকে প্রকৃতপক্ষে ‘নাগরিক’ বলা হবে? এখনই একটি বিষয় পরিষ্কার, বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া আসামের নাগরিকত্বের ভঙ্গুরতাকে উন্মোচন করেছে—যেখানে একটি কাগজই নির্ধারণ করে আপনার রাজনৈতিক কণ্ঠ থাকবে কি না, অথবা আপনি চুপচাপ ইতিহাস থেকে মুছে যাবেন।

নথি আর পরিচয়ের মাঝের এই টানাপোড়েনে আসাম প্রস্তুত হচ্ছে এক সংঘাতের জন্য, যা শুধু ২০২৬-এর নির্বাচনের ফল নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘অধিকার’ ও ‘অস্তিত্ব’-এর সংজ্ঞা বদলে দেবে।

প্রবীর প্রামাণিক, লেখক-সাংবাদিক, কলকাতা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...