Ajker Patrika

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ভর্তুকি দরকার: উপদেষ্টা ফরিদা আখতার

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। ছবি: আজকের পত্রিকা
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। ছবি: আজকের পত্রিকা

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ভর্তুকি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, ‘কৃষিতে আমরা ভর্তুকির কথা শুনি, কিন্তু প্রাণী ও মৎস্যে আমরা ভর্তুকি পাই না, এ খাতেও ভর্তুকি দরকার।’

আজ শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। দ্বিতীয় দিনের বিষয় ছিল ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ: পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণি ও মৎস্য খাত’। বিএজেএফ সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, মানুষ খাদ্য খায় বেঁচে থাকার জন্য, কিন্তু সেই খাদ্য কেন রোগের উৎস হচ্ছে। খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়। দেশের সামগ্রিক পুষ্টিচিত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। ধনী মানুষের আয় দিয়ে গরিব মানুষকে বিচার করবেন না।

ফরিদা আখতার বলেন, ‘কয়েক শতাংশ মানুষের ভোগক্ষমতার গড় তুলে ধরা হলে বাস্তবে গরিব মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিঘাটতি আড়াল হয়ে যায়। ফলে নীতিনির্ধারণে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক পুষ্টিচাহিদা অজানাই থেকে যায়। দেশীয় প্রাণিসম্পদ শুধু উৎপাদনশীলতার জন্য নয়, গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ সুবিধা, নারী কর্মসংস্থান ও কৃষির ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে শিল্প হিসেবে দেখা হলেও উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনো গ্রামীণ সাধারণ মানুষের হাতেই হচ্ছে।

পুষ্টিহীনতার প্রসঙ্গে ফরিদা আখতার বলেন, ‘‘‘জিরো হাঙ্গার’’ মানে শুধু পেট ভরে খাওয়া নয়, পুষ্টিমান নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা বছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার সংখ্যা ১৩৭টি বলি। কিন্তু এই গড় হিসাব ধনী–গরিবের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাসের বৈষম্যকে আড়াল করে দেয়। ফলে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত ভোগ্যচিত্র অদৃশ্য থেকে যায়।’

গ্রামীণ খাদ্যব্যবস্থার বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, উৎপাদনকারী জেলার মানুষও অনেক সময় নিজ এলাকার দেশীয় মাছ খেতে পারেন না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে দেশীয় মাছের স্বাদ অত্যন্ত ভালো হলেও অনেক সুনামগঞ্জবাসী এখন একোয়াকালচারের পাঙাশ খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বাস্তব তথ্য সাংবাদিকদের তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

মাংস খাত প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, শুধু গরুর মাংসই মাংসের একমাত্র উৎস নয়। মহিষ, ভেড়া, হাঁস-মুরগি, কোয়েলসহ সব ধরনের মাংস ও ডিমের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রেড মিটের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও মাথায় রাখতে হবে। প্রাকৃতিক উৎসে উৎপাদিত খাবারের পুষ্টিগুণ বেশি। কীটনাশকের ব্যবহার কমানো না গেলে খাদ্যই ভবিষ্যতে রোগের উৎসে পরিণত হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘দেশীয় জাতের মাছ, মাংস ও প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ, যেগুলো রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। পৃথিবীর অনেক দেশে যেসব প্রাণিসম্পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আমাদের দেশে টিকে আছে।’

স্বাগত বক্তব্যে বিএজেএফ সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন বলেন, ‘আমরা বিএজেএফ থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকার চাই। এর মধ্যে নদীর মাছ ফেরত আনা, অযাচিত বালাইনাশক ব্যবহার কমানো, চাষের মাছের গুণগত মান রক্ষা, খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখতে চাই।’

অনুষ্ঠানে সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা ও সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী। তিনি বলেন, মজুত জরিপ, জেলেদের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেইস, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার ফলে বাংলাদেশ সুনীল অর্থনীতির বাণিজ্যিক ও টেকসই বিকাশের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মেরিন স্পেশিয়াল প্ল্যানিং, টেকসই আহরণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সমুদ্রের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন—এই চার খাতে বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘নদীর মাছ কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা চাষের ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনার কৌশল বাস্তবায়ন করছি। নিরাপদ মাছ উৎপাদন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার বলেন, পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) এখন পর্যন্ত ৯৭টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে জেনেটিক উন্নয়ন, ফডার প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণার ফলে দেশের পুষ্টিচাহিদা পূরণের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।

ফিশ ফিড রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদিত ফিশ ফিড এখন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এই খাতকে টেকসই করতে ফিশ ফিডের জন্য বিশেষ এক্সপোর্ট প্রণোদনা নীতির প্রয়োজন রয়েছে।

ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে এসিআই অ্যাগ্রিবিজনেসেসের প্রেসিডেন্ট ও এসিআই লিমিটেডের গ্রুপ উপদেষ্টা ড. ফা হ আনসারী বলেন, কৃষি ভ্যালু চেইন শক্তিশালী হলে কৃষকের ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপ কমবে এবং খাদ্যপণ্যের দামের অস্থিরতাও নিয়ন্ত্রণে আসবে। গবেষণা থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা নীতির তাগিদ দিয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. কাজী ইমদাদুল হক বলেন, কৃষিকে টেকসই করতে উৎপাদনের পাশাপাশি ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করা এবং গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস ও মূল্যনীতির দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিএজেএফের চার দিনের এ সম্মেলনে কো-স্পন্সরশিপে রয়েছে আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এ ছাড়া সহযোগিতায় রয়েছে এসিআই অ্যাগ্রিবিজনেসেস; প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ; লাল তীর সিডস লিমিটেড; ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ ব্র্যাঞ্চ; বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; বন অধিদপ্তর; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; মৎস্য অধিদপ্তর এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...