Ajker Patrika

আপিল করতে দেশে ফিরে কারাগারে যেতে হবে হাসিনাকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ২৩: ০৪
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। ছবি: বাসস
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। ছবি: বাসস

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় আজ সোমবার ঘোষণা হতে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম, যার রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ঘোষণা করা হবে।

রায় ঘোষণার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করার কথা রয়েছে। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এই মামলার প্রধান আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক এবং তাঁরা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

আপিলের সুযোগ নেই

গতকাল রোববার ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম নিশ্চিত করেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের সাজা হলে তাঁরা আপিল করতে পারবেন না, কারণ তাঁরা পলাতক। ট্রাইব্যুনাল আইনে বলা আছে, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। তবে আপিলের সুযোগ নিতে হলে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে, অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হতে হবে।

নারী হিসেবে বিশেষ সুবিধা নয়

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে (সিআরপিসি) জামিনের ক্ষেত্রে নারী, অসুস্থ, কিশোর বা শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও, রায় প্রদানের ক্ষেত্রে নারীকে সাধারণ আইনেও আলাদা কোনো সুবিধা দেওয়া হয় না। ট্রাইব্যুনাল আইনেও এর কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই। অতএব, আসামি নারী বা পুরুষ যা-ই হোন না কেন, তার অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করেই শাস্তি প্রদান করা হবে।

মাস্টারমাইন্ডের দাবি, সাক্ষাৎকারের বক্তব্য আমলে নয়

মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন) একাধিকবার দাবি করেছে, শেখ হাসিনা ছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধের মাস্টারমাইন্ড (পরিকল্পনাকারী), হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার (সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা)।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, ট্রাইব্যুনালে হাজির না হয়ে তিনি যেসব কথা বলছেন, তা আইনের দৃষ্টিতে কোনো বক্তব্য নয়। তিনি হাজির হয়ে তাঁর বক্তব্য পেশ করতে পারেন। প্রসিকিউটর আরও উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার ভয়েস রেকর্ড উন্মুক্ত আদালতে বাজিয়ে শোনানো হয়েছে, যেখানে কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি নিজ মুখে ‘মারণাস্ত্র ব্যবহারের’ আদেশটা দিয়েছেন বলে শোনা গেছে।

ভারতের মাটিতে বসে গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার বিষয়টিকে প্রসিকিউশন সম্পূর্ণভাবে সরকারের ও কূটনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখছে এবং তাঁর বক্তব্যকে আমলে নিচ্ছে না।

রাজসাক্ষীর জবানবন্দি

মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন নিজের দোষ স্বীকার করে ‘রাজসাক্ষী’ বা ‘অ্যাপ্রুভার’ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানান, গত বছরের ১৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সরাসরি ‘লেথাল উইপন’ (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহারের নির্দেশ পেয়েছিলেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে নিরীহ, নিরস্ত্র দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয় এবং ৩০ হাজার মানুষকে আহত করা হয়েছিল।

মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ, ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউশন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শহীদ পরিবার ও আহত আন্দোলনকারীদের মধ্যে হস্তান্তরের আবেদন জানানো হয়েছে।

শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে, যা প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার দাবি করেছে:

১. উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান;

২. প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ;

৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা;

৪. রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছয়জনকে গুলি করে হত্যা;

৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা।

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার জানান, ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল যে আদেশ দিন না কেন, প্রসিকিউশন সেটা মেনে নেবে। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষে রায়ের অংশবিশেষ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে শাস্তি দিলে ইন্টারপোলে তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি ‘কনভিকশন ওয়ারেন্টের’ আবেদন করা হবে বলেও তিনি জানান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...