Ajker Patrika

ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য, চুক্তি ও আইন কী বলে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮: ০১
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে ভারতে আশ্রিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের পর তাঁদের প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লিকে আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ সরকার বলেছে, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধুসুলভ আচরণ নয়।’

কিন্তু গত সোমবার রায় ঘোষণার পর ভারত যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সেটি ছিল বেশ কৌশলী এবং সেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো কথা নেই। সেই বিবৃতির ভাষা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে আটকে দিয়ে ভারত প্রচ্ছন্ন নেতিবাচক মনোভঙ্গি প্রকাশ করেছে। দিল্লির বিবৃতিতে বলা হয়, রায় ভারতের নজরে আছে এবং দেশটি ‘বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে’ সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে।

এদিকে রায়ের পর ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে গত দুই দিনে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা যা বলছেন, তাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারতের ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে দেখা দেবে—ভারত যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেয়, তাহলে বাংলাদেশের হাতে কী আছে?

২০১৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামি ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সুস্পষ্ট করা।

কোন অপরাধে প্রত্যর্পণ করা যায়

চুক্তি অনুযায়ী, যে অপরাধে ভারতে ও বাংলাদেশে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে, তা প্রত্যর্পণের যোগ্য। এর মধ্যে হত্যা, সন্ত্রাসবাদ, অপহরণ, সহিংস অপরাধ ছাড়াও আর্থিক ও রাজস্ব ক্ষেত্রের অপরাধও অন্তর্ভুক্ত। তদুপরি, সহায়তা করা, উসকানি দেওয়া বা সহযোগী হিসেবে অংশ নেওয়াও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত, অভিযুক্ত হয়ে পলাতক বা দণ্ডিত হয়ে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে—দুই রাষ্ট্রই তাকে ফেরত চাওয়ার আবেদন করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো বিচার সম্পন্ন করা বা পালিয়ে যাওয়া দণ্ড কার্যকর করা।

কখন প্রত্যর্পণ নাকচ করা যেতে পারে

চুক্তিতে এমন কিছু পরিস্থিতির উল্লেখ আছে, যেখানে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। চুক্তির ৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি অপরাধটি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তবে প্রত্যর্পণ নাকচ করা যেতে পারে।

তবে ৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণ, হত্যায় প্ররোচনা, সহিংসতা বা অস্ত্র-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক ধরা হবে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতনসহ গুরুতর অভিযোগ থাকায় এই ধারা প্রযোজ্য হওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারে, অভিযোগ এত ছোট যে তা প্রত্যর্পণের মতো কঠোর পদক্ষেপ যৌক্তিক নয়, অভিযোগের পর অনেক বেশি সময় পেরিয়ে যায় এবং ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বা খারাপ বিশ্বাসে অভিযোগ আনা হয়, তাহলেও প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।

এ ছাড়া শুধুই সামরিক প্রকৃতির অপরাধ হলে এবং সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ না হলেও প্রত্যর্পণ নাকচ করা সম্ভব।

ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন কী বলে

দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়াও ১৯৬২ সালের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রত্যর্পণ করে ভারত। আইনটি পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণ-সম্পর্কিত বিধি সংশোধনের পাশাপাশি দেশের আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

প্রত্যর্পণ চুক্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতি তুলে ধরা এই আইনের ২৯ ও ৩১ ধারায় কিছু শর্ত নির্ধারণ করা আছে, যেগুলোর অধীনে প্রত্যর্পণ অস্বীকার করা যেতে পারে। প্রধান শর্তগুলো হলো—

  • অপরাধটি রাজনৈতিক হলে বা ব্যক্তিকে রাজনৈতিক কারণে শাস্তি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
  • অনুরোধকারী দেশের আইন অনুযায়ী মামলার সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও প্রত্যর্পণ করা যাবে না।
  • শুধু হালকা অপরাধ বা প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধে বা ভারতের অনুমোদিত অপরাধের জন্য পলাতক ব্যক্তিকে বিচার করা হবে—অনুরোধকারী দেশকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • যদি পলাতক ব্যক্তি ইতিমধ্যে ভারতে মামলা-মোকদ্দমায় যুক্ত থাকে বা সাজা ভোগ করছে, তবে তার মামলা বা সাজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে হস্তান্তর করা যাবে না।

ভারতের আদালতের কী নজির

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, এই অধিকার ভারতের মাটিতে থাকা বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

আদালত একাধিক রায়ে বলেছেন, আইনগত সব সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া কাউকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে ব্যক্তি মৃত্যু, নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের মুখে পড়ে।

কাতিয়ার আব্বাস হাবিব আল-কুতাইফি বনাম ভারত সরকার (১৯৯৮) মামলায় ইরাকের দুই আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানো বন্ধ করা হয়। গুজরাট হাইকোর্ট বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নন-রিফাউলমেন্ট নীতি এবং ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ কারও জীবন বা স্বাধীনতা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, এমন দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ করে।

ভারত ১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ না হলেও এই নীতিকে আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইন হিসেবে বিবেচনা করে এবং তা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে (আইসিসিপিআর) প্রতিফলিত, যেটির সদস্য ভারত।

বাংলাদেশ কী করতে পারে

বাংলাদেশের আদালতের রায়কে ভারত পর্যালোচনা করলেও, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সরকার মুখ খোলেনি। শেষ পর্যন্ত ভারত যদি না পাঠায়, বাংলাদেশ কী করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পথগুলো হতে পারে—

আনুষ্ঠানিক নোট, বৈঠক, যৌথ কর্মপরিকল্পনা ইত্যাদির মাধ্যমে দিল্লির ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তবে ভারত-বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য, ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিবেচনায় এই চাপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা কিংবা আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিষয়টি উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। কিন্তু যেভাবে বিচার হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ—বিশেষত মৃত্যুদণ্ড—বাংলাদেশের বক্তব্যকে দুর্বল করতে পারে।

বাংলাদেশ চাইলে বিচার নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দূর করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বা নতুন বিচারকাঠামোর প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রত্যর্পণ বিরোধ সাধারণত আন্তর্জাতিক আদালতে তোলা যায়। কিন্তু ভারত যেহেতু শক্তিশালী আঞ্চলিক ক্ষমতা এবং বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা রয়েছে, তাই এটি বাস্তবে অসম্ভব বা অকার্যকর।

মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের ফেরত না পাওয়ার নজির

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই, সেসব দেশ কখনোই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ফেরত দেয় না। এই বাস্তবতা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারতের সিদ্ধান্ত অনুমান করতে সাহায্য করে।

২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আশরাফুজ্জামান ওরফে নায়েব আলী খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের ১২ বছর পার হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাঁদের ফেরত দেয়নি। চৌধুরী মুঈনুদ্দীন লন্ডনে বহাল তবিয়তে রয়েছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় মুসলিম সংগঠনের। আর আশরাফুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় নাগরিকত্বসহ বসবাস করছেন।

তৎকালীন রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী বলেছিলেন, মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ বলে এসব দেশ তাঁদের ফেরত দেয়নি।

এই তালিকায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম নূর চৌধুরী—বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম দণ্ডিত। ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি কানাডায় আত্মগোপনে আছেন এবং কানাডা মৃত্যুদণ্ড-বিরোধী নীতি অনুসরণ করে বলে তাঁকে এখনো ফেরত দেয়নি।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার খুনিদের মতোই বুদ্ধিজীবী হত্যার আসামিদেরও ফিরিয়ে আনা যায়নি। কারণ, ওই দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডবিরোধী।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...