Ajker Patrika

ডিজনির রাজকুমারীরা: রূপকথার হাত ধরে প্রজন্মের শিক্ষা

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
ডিজনির তৈরি করা শুশুতোষ ৎ গল্পের চরিত্রগুলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে ভীষণভাবে। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।
ডিজনির তৈরি করা শুশুতোষ ৎ গল্পের চরিত্রগুলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে ভীষণভাবে। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশুদের চলচ্চিত্র জগতে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে ডিজনি। ব্যাঙ রাজকুমার কিংবা ঘুমিয়ে থাকা রাজকুমারীকে জাগাতে আসবে অচিন দেশের রাজকুমার—শিশুতোষ এসব গল্পের রঙিন দৃশ্যকল্প তৈরি করে সব বয়সী মানুষের মন কেড়েছে ডিজনি। এই জাদুকরি দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডিজনির রাজকুমারীরা। এই চরিত্রগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশু, বিশেষত মেয়েশিশুদের কাছে আদর্শ, সৌন্দর্য এবং জীবনগল্পের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর মুক্তি পায় অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘ফ্রোজেন’। এর সাফল্যের পর রাজকুমারীদের এই ধারা পায় এক নতুন মাত্রা।

ছোটবেলা থেকে শিশুরা বইয়ের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় এই রাজকুমারীদের জীবনযাত্রা, রূপ আর সাহসিকতার গল্প পড়ে ও দেখে বড় হয়। এই চরিত্রগুলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে ভীষণভাবে। গল্পগুলোর বক্তব্যেও এসেছে খানিক বদল। কীভাবে তাদের গল্প বলার ধরন বদলেছে, সেগুলো শিশুদের কী বার্তা দিচ্ছে—এগুলো এখন ভাবার বিষয়। এই গল্পগুলো কেবল বিনোদন নয়, এগুলো আমাদের সমাজের নারী-পুরুষের আচরণ ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে শিশুদের প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে দেয়।

ক্ল্যাসিক যুগের রাজকুমারী

ডিজনি রাজকুমারীদের বিবর্তনের সূচনা হয় ক্ল্যাসিক যুগ বা গোল্ডেন এরা দিয়ে। এই যুগের চরিত্রগুলো তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করত। ১৯৩৭ থেকে ১৯৫৯—এই বাইশ বছরে যে রাজকুমারীরা শিশুদের সামনে এসেছিল, তারা মূলত কোমলতা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ১৯৩৭ সালের ‘স্নো হোয়াইট’, ১৯৫০ সালের ‘সিনড্রেলা’ এবং ১৯৫৯ সালের ‘স্লিপিং বিউটি’র অরোরা ছিল মূলত নরম আর কোমলমতি। তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল সুদর্শন, ধনী রাজকুমারের জন্য অপেক্ষা করা এবং বিয়ে করে সুখে থাকা। সিনড্রেলার গান ‘আ ড্রিম ইজ আ উইশ ইওর হার্ট মেকস’ এবং অরোরার ‘ওয়ান্স আপন আ ড্রিম’ সেই স্বপ্ন ও অপেক্ষার ধারণাকেই তুলে ধরে। তারা চিরায়ত, বাধ্য এবং সুরক্ষিত গৃহবধূর গতানুগতিক ছাঁচকে তুলে ধরত, যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ছিল প্রত্যাশিত। ‘স্নো হোয়াইট’ সাতজন পুরুষের জন্য ঘর পরিষ্কার করত। সিনড্রেলা নিজের সৎমা এবং তার মেয়েদের জন্য আস্ত এক প্রাসাদ পরিষ্কার করত।

স্নো হোয়াইট সাতজন পুরুষের জন্য ঘর পরিষ্কার করত। ছবি: হলিউড রিপোর্টার
স্নো হোয়াইট সাতজন পুরুষের জন্য ঘর পরিষ্কার করত। ছবি: হলিউড রিপোর্টার

সে সময়ের গল্পগুলোর আরেকটি হলো, রাজকুমারীদের বাহ্যিক সৌন্দর্য সবার ওপরে স্থান দেওয়া। সিনড্রেলা বা অরোরার মতো চরিত্রকে বাঁচানোর জন্য সত্যিকারের ভালোবাসার চুম্বন প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি তাদের অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তোলে। এই রাজকুমারীরা ছিল ইউরোপকেন্দ্রিক সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। তাদের ছিল ফ্যাকাশে ত্বক, সোনালি চুল ও নীল চোখ। তাদের কোমরের মাপ ছিল অবাস্তব প্রকৃতির সরু। সেই যুগে শিশুদের শেখানো হয়েছে, একজন নারীর প্রধান গুণ হলো দয়া, সৌন্দর্য, সরলতা এবং অবশ্যই একজন পুরুষের শক্তির প্রতি আস্থা রাখা।

রেনেসাঁ যুগে আত্ম-আবিষ্কার ও ভিন্নতার উত্থান

দীর্ঘ বিরতির পর, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ডিজনির রেনেসাঁ যুগ। সেই সময় ডিজনি রাজকুমারীদের চরিত্রে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন এনেছিল। এই যুগের অ্যারিয়েল, বেল, জেসমিন, পোকাহন্টাস কিংবা মুলান ছিল অনেক বেশি সাহসী, কৌতূহলী ও স্বাধীনচেতা। তারা কেবল স্বপ্ন দেখে বসে না থেকে নিজেরাই তা অর্জনের পথে এগিয়েছে। তারা দেখিয়েছে বুদ্ধিমত্তা ও বিদ্রোহের চিত্র। বেল তুলে ধরেছিল বুদ্ধিমত্তা ও বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, যা তাকে সমাজের আর দশজন মানুষ থেকে আলাদা করেছিল। জেসমিন ও অ্যারিয়েল সমাজের প্রত্যাশিত গণ্ডি ভেঙে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজতে চেয়েছিল।

২০০৯ সাল থেকে পর্দায় আসা রাজকুমারীরা শিশুদের কোনো পুরুষের সাহায্যে নয়, বরং বিপদ থেকে নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে শিখিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
২০০৯ সাল থেকে পর্দায় আসা রাজকুমারীরা শিশুদের কোনো পুরুষের সাহায্যে নয়, বরং বিপদ থেকে নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে শিখিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

সে যুগের ডিজনির চরিত্রগুলো যুদ্ধ ও নেতৃত্ব নিয়েও নতুন ভাবনা প্রকাশ করেছিল। মুলান সম্পূর্ণভাবে চিরাচরিত রাজকুমারীর ধারণা ভেঙে দেয়। সে নিজের বাবার সম্মান রক্ষার্থে পুরুষের ছদ্মবেশে যুদ্ধে যায় এবং দেশকে রক্ষা করে। মুলানই প্রথম রাজকুমারী, যার গল্পে রোমান্সের চেয়ে নিজের অর্জন ও নেতৃত্ব মুখ্য ছিল। এই যুগে এসে বর্ণগত বৈচিত্র্য শুরু হয়। আরব সংস্কৃতির জেসমিন, আদিবাসী আমেরিকান পোকাহন্টাস এবং চীনের মুলান ছিল প্রথম অশ্বেতাঙ্গ রাজকুমারীর গল্প। এটি শিশুদের মধ্যে ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বের প্রাথমিক ধারণা দেয়।

এই সময়ের রাজকুমারীরা শিশুদের শেখায়, নারীর নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য আর কণ্ঠস্বর থাকতে পারে। তাদের জীবনে প্রেম একটি পার্শ্বচরিত্র মাত্র। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আত্ম-আবিষ্কার। তবে অবাস্তব শারীরিক গঠন সে যুগের চরিত্রগুলোর মধ্যেও দৃশ্যমান ছিল।

স্বাবলম্বিতা ও বাস্তবতার গল্পে পুনরুত্থান এবং নতুন যুগ

২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত চলছে ডিজনির পুনরুত্থান বা রিভাইভাল যুগ। এটি শুরু হয় ‘দ্য প্রিন্সেস অ্যান্ড দ্য ফ্রগ’-এর তিয়ানা দিয়ে। এটি ডিজনির রাজকুমারীদের বিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ। এই যুগের তিয়ানা, রাপুনজেল, মেরিডা, এলসা, আনা আর মোয়ানা মিলে রাজকুমারীর সংজ্ঞা আমূল বদলে দেয়। তারা গুরুত্ব দিত জীবনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে কঠোর পরিশ্রমের প্রতি। তিয়ানা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাজকুমারী, যে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের রেস্তোরাঁর স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে। কোনো পুরুষের সাহায্যে নয়, বরং নিজের চেষ্টায় সফল হতে চায় সে।

এই যুগে ফ্রোজেনের মতো চরিত্রগুলো শিখিয়েছে পরিবার ও বন্ধুত্বের গুরুত্ব। ডিজনির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফ্রোজেন দেখিয়েছে, সত্যিকারের ভালোবাসা কেবল রোমান্টিক নয়, এটি দুই বোনের মধ্যকার গভীর সম্পর্কও হতে পারে। এলসা ও আনা প্রমাণ করেছে, নারী নিজেই নিজের রক্ষাকর্তা।

এই নতুন যুগের রাজকুমারীদের মধ্যে প্রেমের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। মেরিডা, এলসা ও মোয়ানার গল্পে কোনো রোমান্টিক আকর্ষণ বা রাজকুমার নেই। মোয়ানার গল্পে পুরুষ চরিত্র মাউই একজন সহায়ক বন্ধু চরিত্র। এটি ডিজনির জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা দেখিয়েছে, পৃথিবী বাঁচাতে একজন নারীর বিয়ে বা রোমান্স বাধ্যতামূলক নয়।

মোয়ানার গল্পে পুরুষ চরিত্র মাউই একটি সহায়ক বন্ধু চরিত্র। ছবি: সংগৃহীত
মোয়ানার গল্পে পুরুষ চরিত্র মাউই একটি সহায়ক বন্ধু চরিত্র। ছবি: সংগৃহীত

এই নতুন যুগে রাজকুমারীদের শারীরিক শক্তি ও বাস্তবসম্মত রূপের মধ্যেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। মোয়ানা এক দ্বীপপ্রধানের কন্যা এবং ভবিষ্যৎ নেত্রী। ফলে স্বাভাবিকভাবে তার হাত-পা হয়েছে শক্তিশালী এবং শারীরিক গঠনে দেখা গেছে পেশিবহুল। এর সহপরিচালক জন মাসকার বলেছিলেন, তাঁরা এমন একজন অ্যাকশন অ্যাডভেঞ্চার নায়িকা চেয়েছেন, যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে সমুদ্রজুড়ে একটি নৌকা চালাতে পারে। একে অবাস্তব চিকন কোমরের ধারণা থেকে সরে আসার একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। মোয়ানা তৈরি করার সময় ডিজনি ঐতিহাসিক বিষয়গুলো বজায় রাখতে সাংস্কৃতিক পরামর্শদাতা দল নিয়োগ করে, যা চরিত্রের চিত্রায়ণে সংবেদনশীলতা এনেছে।

এই নতুন যুগের রাজকুমারীরা শিশুদের শিখিয়েছে সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের পরিবার বা মানুষের জন্য লড়াই করার মানসিকতা। তারা জানিয়েছে, এগুলোই একজন রাজকুমারীর প্রধান গুণ। আর সুখী সমাপ্তি মানেই সব সময় বিয়ে নয়। আত্ম-উপলব্ধি ও লক্ষ্যের পথে সফলতাই আসল পাওয়া।

ডিজনি রাজকুমারীদের এই দীর্ঘ বিবর্তন আমাদের সমাজের নারীদের ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি। যদিও লাইভ-অ্যাকশন রিমেকগুলোতে এখনো মাঝে মাঝে পুরোনো ও অবাস্তব শারীরিক গঠনের চিত্রায়ণ ফিরে আসে। তবু মূলধারার অ্যানিমেটেড চরিত্রগুলো এখন শিশুদের আরও বেশি শক্তিশালী, স্বাবলম্বী ও সমাজসচেতন নারী হিসেবে গড়ে ওঠার বার্তা দিচ্ছে। ডিজনির এই যাত্রায় শিশুরা শুধু রূপকথাই শুনছে না, তারা শিখছে, তাদের ভেতরের শক্তিই তাদের আসল মুকুট।

সূত্র: এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি, দ্য স্ট্যানফোর্ড ডেইলি, মিডিয়াম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...