Ajker Patrika

আল্লাহর প্রতি ইমান ও মুমিনের মৃত্যুর প্রস্তুতি

কাউসার লাবীব
আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ১৩: ৪১
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি ইমান। ইমান হলো এমন বিশ্বাস, যা মুসলমানদের জীবন পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি এবং পরকালীন নাজাতের পূর্বশর্ত। ইমানের মাধ্যমেই একজন মানুষ জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য—মৃত্যু এবং তার পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়।

আল্লাহর প্রতি ইমানের মর্মকথা

আল্লাহর প্রতি ইমান হলো এই মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে তিনিই অনাদি ও অনন্তকাল ধরে আছেন এবং থাকবেন। তিনিই বিশ্বজগতের স্রষ্টা, মালিক, প্রতিপালক ও শাসন পরিচালনাকারী, যাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি যাবতীয় ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত এবং সদগুণাবলির অধিকারী।

আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি ইমান কোনো অলীক ধারণা নয়; এর পক্ষে অসংখ্য দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ এবং এর নিখুঁত পরিচালনা পদ্ধতি তাঁর অস্তিত্বের এক বড় প্রমাণ। যেহেতু স্রষ্টা ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্বে আসা সম্ভব নয়, তাই এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও পরিচালনার পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক রয়েছেন—এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট।

খাঁটি ইমান হলো হৃদয়ের প্রশান্তি ও মুক্তির আলোকবর্তিকা। আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ছাড়া আত্মার প্রশান্তি অর্জন অসম্ভব। এই ইমানের অন্তর্ভুক্ত হলো—এক. আল্লাহই সবকিছুর প্রতিপালক, মালিক ও স্রষ্টা। দুই. নামাজ, রোজা, চাওয়া-পাওয়া, আশা-ভরসাসহ সকল ইবাদতের একক হকদার কেবল তিনিই। তিন. ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবী-রাসুল, পরকাল ও তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।

মানুষের অনিবার্য গন্তব্য: মৃত্যু

জীবন হলো একটা নির্দিষ্ট সময়ের সমষ্টি। প্রতিনিয়ত আমাদের হায়াতের দিনগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আলোর গতিতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছি। দুনিয়ার রং-রসে মেতে মৃত্যুকে হয়তো ভুলে থাকা যায়, কিন্তু মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচা যায় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বলে দাও, নিশ্চয়ই যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের কাছে উপস্থিত হবে। অতঃপর তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে সেই সত্তার কাছে, যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু সম্পর্কে অবগত। অতঃপর তিনি তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন।’ (সুরা জুমুআ: ৮)

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং এর সময় নির্ধারিত। যখন নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও বিলম্ব বা ত্বরান্বিত করা যাবে না। আমরা দুনিয়ার সবকিছুর জন্যই প্রস্তুতি নিই—চাকরি, বিয়ে, ক্যারিয়ার—কিন্তু প্রস্তুতির ক্ষেত্রে উদাসীন থাকি কেবল মৃত্যুর জন্য! অথচ একজন বুদ্ধিমান মুমিনের উচিত মৃত্যু আসার আগেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘যখন সন্ধ্যা উপনীত হয়, তখন সকালের জন্য অপেক্ষা কোরো না। আর সকাল উপনীত হলে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষায় থেকো না। তোমার সুস্থতা থেকে কিছু সময় তোমার অসুস্থতার জন্য বরাদ্দ রাখো এবং সময় থাকতে মৃত্যুর জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪১৬)

মৃত্যুর প্রস্তুতি ও করণীয়

একজন মুমিনের উচিত মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা। এর ফলে দুনিয়ার প্রতি আসক্তি দূর হয়, ইমান বৃদ্ধি পায় এবং পরকালের জন্য পাথেয় খুঁজতে সাহায্য করে। এ ছাড়া মৃত্যুর প্রস্তুতির জন্য করণীয় হলো—

১. খাঁটি তাওবা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা: নিয়মিত খাঁটি তাওবা করা এবং আল্লাহ ও বান্দার হক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা। যত ছোটই হোক না কেন, সব রকমের গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করা।

২. ফরজ ইবাদত আদায়: সময়মতো ও মনোযোগের সঙ্গে নামাজ আদায় করা। কিয়ামতের দিন প্রথম যে বিষয়ে হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো নামাজ। হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল রিজিক গ্রহণ নিশ্চিত করা।

৩. মানুষের হক আদায়: জুলুম বা অন্যের অধিকার নষ্ট করে ইন্তেকাল না করার জন্য জীবদ্দশায় মানুষের পাওনা থাকলে তা আদায় করা বা আদায়ের ব্যবস্থা রাখা।

৪. নেক আমলে জীবন সাজানো: বেশি বেশি নেক আমল করা ও ইবাদতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সুস্থ ও জীবিতাবস্থায় দান-সদকা করা (যা মৃত্যুর পরও সওয়াব বয়ে আনবে)।

৫. অসিয়ত লিখে রাখা: নিজের সম্পদের সুষম বণ্টন, ঋণ পরিশোধ এবং পরিপূর্ণ সুন্নত পদ্ধতিতে দাফনের জন্য অসিয়ত লিখে রাখা।

৬. আল্লাহর রহমতের আশা: মৃত্যুকালীন অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা এবং আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ পোষণ করা। বিপদে বা কষ্টে কোনো অবস্থাতেই মৃত্যু কামনা না করা।

৭. ইমানের ওপর অটল থাকার দোয়া: ইমানের ওপর অটল থাকতে নির্জনে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা। সুরা আলে ইমরানে বর্ণিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা যেতে পারে—‘রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা-দা ইজ হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব।’ অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি যখন আমাদের সৎপথ দেখিয়েছ, এরপর আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দিয়ো না। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের দান করো রহমত। নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা।’

মৃত্যু অনিবার্য এবং তার সময় শুধু আল্লাহই জানেন। মুমিনের উচিত হলো দুনিয়ার সফলতার চেষ্টা করা, তবে কখনোই তা আখিরাতকে নষ্ট করে নয়। আল্লাহর স্মরণে হৃদয়ের বিগলিত হওয়া মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আল্লাহ যেন আমাদের প্রত্যেককে সুন্দর মৃত্যু নসিব করেন এবং বলেন, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো তোমার প্রতিপালকের দিকে—তুমি সন্তুষ্ট, তিনিও সন্তুষ্ট। প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ (সুরা ফজর: ২৭-৩০)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...