Ajker Patrika

ভোটে পরাজয় টের পেয়ে গিনি বিসাউয়ের প্রেসিডেন্টই কি ঘটালেন সামরিক অভ্যুত্থান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ২৩: ০৭
মেজর জেনারেল হর্তা ইনতা-আক। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে
মেজর জেনারেল হর্তা ইনতা-আক। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

নির্বাচনের তিন দিন পর গত বুধবার গিনি বিসাউয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তবে পরিস্থিতি ছিল শান্ত। ২৫ লাখ জনসংখ্যার পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ফলাফলের অপেক্ষায় ছিল। বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রের গণনা শেষ হওয়ায় দেশজুড়ে ধারণা তৈরি হয়েছিল—বিরোধী প্রার্থী ফার্নান্দো দিয়াস এগিয়ে আছেন আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এম্বালো সম্ভবত পরাজিত হতে যাচ্ছেন।

তবে দুপুর হতে হতে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে আচমকা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ ও মানুষের চিৎকার শোনা যায়। আধা ঘণ্টা ধরে চলা এই গোলাগুলিতে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথম দিকে গুজব ছড়ায়—এম্বালো হেরে গিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোয় সেনারা তাঁকে আটক করেছে। তবে ২ ঘণ্টা পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন টিজিবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডের মুখপাত্র ডেনিশ এনকানহা ঘোষণা করেন—‘জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার’ স্বার্থে তাঁরা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছেন।

সেনাবাহিনী অভিযোগ করে, দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের একটি অংশ এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে সক্রিয় থাকা আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সদস্যরা ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। সেনাবাহিনী আরও জানায়, নির্বাচনীপ্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট এম্বালোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডিডব্লিউ দীর্ঘ সময় ধরে প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ও প্রাসাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরে তারা ফোনে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় প্রেসিডেন্টের স্ত্রী সুজি বারবোসার সঙ্গে। তিনি লিসবন থেকে ডিডব্লিউর সঙ্গে কথা বলেন। বারবোসা জানান, তাঁর স্বামী প্রেসিডেন্ট এম্বালো ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোটচে কান্দেকে সেনারা আটক করে বিসাউয়ের প্রধান সেনাঘাঁটিতে নিয়ে গেছে। তিনি এটিকে স্পষ্টভাবে ‘একটি সামরিক অভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করেন।

তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করেছেন বহুদলীয় সিভিল সোসাইটি নেটওয়ার্ক ফ্রান্তে পপুলারের সমন্বয়ক আরমান্দো লোনা। ডিডব্লিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি সামরিক অভ্যুত্থান নয়; বরং প্রেসিডেন্ট এম্বালো নিজেই এটি সাজিয়েছেন বিদেশি মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য, যাতে নির্বাচন বাতিলের অজুহাত সৃষ্টি করা যায়।

আরমান্দো লোনার দাবি, ফার্নান্দো দিয়াস প্রায় প্রতিটি জেলায় জয়ী হয়েছেন। তাই এম্বালোর উদ্দেশ্য ছিল—নির্বাচন কমিশনকে ফল প্রকাশ থেকে বিরত রাখা।

এদিকে বিরোধীদলীয় প্রার্থী ফার্নান্দো দিয়াস আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক বার্তায় তিনি জনগণকে রাস্তায় নেমে ফল প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন করার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, তিনিই বর্তমানে দেশের বৈধ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে দেশের সর্বাধিক পরিচিত বিরোধী নেতা ডোমিঙ্গোস সিমোয়েস পেরেইরাকেও সেনারা গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। তিনি দিয়াসকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন।

ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট এম্বালোর বর্তমান অবস্থা

এম্বালো কয়েক দিন ধরেই জনসমক্ষে আসছিলেন না। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁকে একটি বিশেষ বিমানে সেনেগালে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সেনেগালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

এর আগে দেশটির সেনাবাহিনী মেজর জেনারেল হর্তা ইনতা-আকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে। জানা গেছে, ইনতা ছিলেন এম্বালোর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান। বিরোধী শিবির মনে করছে, এটি প্রমাণ করে বর্তমান সামরিক জান্তা আসলে এম্বালোর ঘনিষ্ঠজনদেরই একটি গোষ্ঠী।

পিএআইজিসি দলের এমপি ডিওনিসিও পেরেইরা জানান, তাঁদের দলের বহু সদস্যকে সেনারা আটক করেছে। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁরা আত্মগোপনে নাকি গ্রেপ্তার হয়েছেন—তা নিশ্চিত নয়।

সামরিক নেতৃত্বের এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, জান্তা সরকার এক বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকবে। এ সময়ে তারা সাংবিধানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে এবং দেশে ‘শৃঙ্খলা’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।

১৯৭৪ সালে পর্তুগাল থেকে স্বাধীনতা লাভের পর গিনি বিসাউয়ে বহু সফল ও ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস রয়েছে। গত পাঁচ বছরে এটি পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় নবম অভ্যুত্থানের ঘটনা। এই অবস্থায় দেশটির রাজনীতিতে ‘স্বাভাবিক পরিবেশ’ ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...