Ajker Patrika

তানজানিয়ায় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়ন, গণহত্যার প্রমাণ পেল সিএনএন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ছবিটি ভিডিও থেকে নেওয়া
ছবিটি ভিডিও থেকে নেওয়া

তানজানিয়ায় বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেশজুড়ে যে ভয়াবহ দমন–পীড়ন শুরু হয়েছে, তা নিয়ে সিএনএনের তদন্তে উঠে এসেছে চমকে ওঠার মতো তথ্য। এই তদন্তে সরকারি বাহিনীর নির্মমতা, গুলিতে শতাধিক মানুষ মৃত্যু এবং সম্ভাব্য গণকবরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটিতে বিরোধীদের অনেককেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই বাদ দিয়ে গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান ৯৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার দাবি করেছিলেন।

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ এবং রাস্তায় সশস্ত্র টহলের মধ্যেও তরুণেরা নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এলে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে নিরাপত্তাবাহিনী ও সশস্ত্র লোকজন। বিভিন্ন ভিডিও, স্যাটেলাইট ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান বলছে—গুলিবিদ্ধ বিক্ষুব্ধ তরুণদের অনেকেই নিরস্ত্র ছিলেন বা শুধু পাথর-লাঠি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন।

হাসপাতালে লাশের স্তূপ

প্রাপ্ত ভিডিও ও স্থিরচিত্র যাচাই করে সিএনএন জানিয়েছে, দেশটির ডার এস সালাম শহরের মওয়ান্যান্যামালা হাসপাতাল এবং মওয়ানজা শহরের সেকু-তুরে রিজিওনাল হাসপাতালের মর্গ উপচে পড়েছিল মৃতদেহে। মওয়ানজায় লাশ রাখার জায়গা না থাকায় হাসপাতালের বাইরে স্ট্রেচারে লাশ স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, চার দিনের মধ্যে যত লাশ আনা হয়েছে তার বেশির ভাগেরই মাথা, বুকে বা পেটে গুলির চিহ্ন ছিল; আর মৃতদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ।

ডার এস সালামের একটি মর্গের ভিডিওতে দেখা গেছে—ডজন ডজন লাশ মেঝেজুড়ে পড়ে আছে। তবে তানজানিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ভিডিওটিকে ভুয়া দাবি করেছে এবং তারা এ নিয়ে কোনো জবাব দিতে রাজি হয়নি।

গোলাগুলিতে নারী ও তরুণ নিহত

অরুশা শহরের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে—পুলিশ সদস্যদের দিকে পাথর ছোড়ার পরপরই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। পালাতে থাকা এক গর্ভবতী নারীকে এ সময় পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১২ মিটার দূর থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। একই ঘটনার আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, লাল জামা পরা এক তরুণ মাথায় গুলি লেগে লুটিয়ে পড়ছেন। সম্ভবত পুলিশের কাছ থেকে ৯৫ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, ‘সব শান্ত ছিল। হঠাৎই পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে। চোখের সামনে ওই নারী মারা গেলেন। অন্যজনকে মাথায় গুলি করল। এটা অমানবিক ছিল।’

সাদা পিকআপে ‘ছদ্মবেশী পুলিশ’

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আরও ভিডিওতে দেখা গেছে—সাদা পিকআপে আসা সশস্ত্র পুরুষেরা সাধারণ পোশাকে এসে বিভিন্ন অলি-গলিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্যবস্তু করে গুলি ছুড়েছে। তবে এস ব্যক্তিকে ছদ্মবেশী পুলিশ হিসেবে সন্দেহ করছে স্থানীয়রা। ভিডিওগুলোর জিওলোকেট করে সিএনএন নিশ্চিত হয়েছে, ওই ব্যক্তিরা ইউনিফর্মধারী পুলিশের সঙ্গে অভিযানে অংশ নিয়েছিল।

একটি স্থানীয় স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট ফার্ম জানিয়েছে—তাদের অধীনে থাকা সাত তরুণ ফুটবলারকেও বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে ছয়জনের লাশই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গণকবরের অভিযোগ

বিরোধী দল চাদেমা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে—সংঘটিত গণহত্যার পর অজ্ঞাত স্থানে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ডার এস সালামের উত্তরে অবস্থিত কন্ডো কবরস্থানে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে—২ থেকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে নতুন করে বড় পরিসরে মাটি খোঁড়া হয়েছে।

নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে তরুণেরা রাস্তায় নেমে আসে। ছবি: সিএনএন
নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে তরুণেরা রাস্তায় নেমে আসে। ছবি: সিএনএন

সরকারের অস্বীকার, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

সরকার প্রথমে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে দাবি করলেও পরে প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেন যে ‘কিছু হতাহত’ হয়েছে। তবে তিনি হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেননি। জাতিসংঘ জানিয়েছে—বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শতাধিক মানুষ নিহত এবং অসংখ্য আহত বা আটক হয়েছেন।

তানজানিয়ার বহুদিনের স্থিতিশীল গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি এই দমন–পীড়নে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মহল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...