Ajker Patrika

নাইজেরিয়ায় ক্যাথলিক স্কুলের ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীকে অপহরণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবগাত রাত ২টার দিকে সশস্ত্র হামলাকারীরা স্কুলে ঢুকে পড়ে। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবগাত রাত ২টার দিকে সশস্ত্র হামলাকারীরা স্কুলে ঢুকে পড়ে। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলে একটি ক্যাথলিক স্কুল থেকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ অন্তত ৩১৫ জনকে অপহরণ করেছে সশস্ত্র হামলাকারীরা। এটি দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় গণ-অপহরণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নাইজেরিয়ার খ্রিষ্টান সংগঠন ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব নাইজেরিয়া (সিএন) জানিয়েছে, নাইজার রাজ্যের পাপিরি এলাকার সেন্ট মেরিজ স্কুল থেকে ৩০৩ শিক্ষার্থী ও ১২ জন শিক্ষককে তুলে নেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী অপহৃত ব্যক্তির সংখ্যা ২০১৪ সালের কুখ্যাত চিবুক অপহরণের (২৭৬ শিক্ষার্থী) সংখ্যাকেও পেরিয়ে গেছে।

পুলিশ জানায়, স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ২টার দিকে সশস্ত্র হামলাকারীরা স্কুলে ঢুকে পড়ে এবং সেখানেই থাকা ছাত্রছাত্রীদের অপহরণ করে নিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ডমিনিক আদামু বিবিসিকে বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে ওই স্কুলে পড়ে। তারা অপহৃত হয়নি। কিন্তু যাদের বাচ্চা অপহরণের শিকার, তাঁরা সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন...ঘটনাটি সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে।’

অন্যদিকে এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর দুই ভাগনি (বয়স ৬ ও ১৩) অপহৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু চাই তারা যেন বাড়ি ফিরে আসে।’

পুলিশ জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী অপহৃতদের সন্ধানে বনাঞ্চলে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে ২১৫ জনকে অপহরণ করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেলেও পরে জানা যায়, ৩১৫ জনকে অপহরণ করা হয়েছে।

নাইজার রাজ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা সতর্কবার্তা পাওয়ার পর সব আবাসিক স্কুল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেন্ট মেরিজ স্কুল সে নির্দেশ অমান্য করেছে, যা শিক্ষার্থী ও কর্মীদের ‘অবাঞ্ছিত ঝুঁকির’ মুখে ফেলেছে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

নাইজেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র অপরাধী চক্র (স্থানীয়ভাবে যাদের ‘ব্যান্ডিট’ বা ডাকাত বলা হয়) অপহরণকে বড় ব্যবসা বানিয়েছে। মুক্তিপণ আদায় ঠেকাতে আইন করে অপহরণে মুক্তিপণ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে তাতে তেমন ফল আসেনি।

শুক্রবারের ঘটনাটি ছিল চলতি সপ্তাহে তৃতীয় গণ-অপহরণ। এর আগে গত সোমবার প্রতিবেশী কেব্বি রাজ্যের একটি আবাসিক স্কুল থেকে ২৫ জনের বেশি মুসলিম ছাত্রী অপহৃত হয়। একই সপ্তাহে দক্ষিণাঞ্চলীয় কওয়ারা রাজ্যের একটি গির্জায় হামলায় ২ জন নিহত ও ৩৮ জন অপহৃত হয়।

এদিকে, দেশে বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু তাঁর বিদেশ সফর (এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ) সবই বাতিল করেছেন। কেন্দ্র সরকার ৪০টির বেশি ফেডারেল কলেজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। কিছু রাজ্যে সব পাবলিক স্কুলও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান অপহরণ ও হামলার ঘটনায় নাইজেরিয়ায় জনরোষ বাড়ছে। মানুষ দাবি করছে, শিশু ও গ্রামাঞ্চলের নিরাপত্তায় সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই অপহরণের ঘটনা এমন সময় ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ ডানপন্থী অনেকেই দাবি করছেন—নাইজেরিয়ায় খ্রিষ্টানদের ওপর পরিকল্পিত হামলা করা হচ্ছে। তবে নাইজেরিয়ার সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বাস্তবে দেশটিতে হামলার শিকার হয় মুসলিম ও খ্রিষ্টান উভয়েই।

এক সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের আদর্শে আপত্তি জানানো যেকোনো ব্যক্তিকেই আক্রমণ করে—মুসলিম, খ্রিষ্টান বা ধর্মনিরপেক্ষ সবাইকে।’

আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ায় স্কুলছাত্রী অপহরণ এখন নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে স্কুল হলো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু—যেখানে হামলা করলে বেশি মনোযোগ পাওয়া যায়।

ইউনিসেফ গত বছর বলেছিল, সংঘাতপ্রবণ ১০টি অঙ্গরাজ্যের মাত্র ৩৭ শতাংশ স্কুলে হুমকি শনাক্তের প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা রয়েছে।

১০ বছর আগে বোকো হারাম নাইজেরিয়ার চিবুক শহরের একটি স্কুল থেকে ২৭৬ ছাত্রীকে অপহরণ করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরাঞ্চলে ডজন ডজন ‘ব্যান্ডিট’ বা ডাকাত গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সাধারণত নিরাপত্তাহীন, দূরবর্তী গ্রামগুলোতে হামলা চালায়।

চিবুক শহরে বোকো হারামের ওই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে (বেশির ভাগই ছাত্রী) অপহরণ করা হয়। তাদের অনেককে মুক্তি দেওয়া হয় মুক্তিপণের বিনিময়ে।

বোকো হারাম অপহরণ করে মূলত তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য, যার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা এবং নাইজেরিয়ায় শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। অপহৃতদের মধ্যে অনেককেই তারা নিজেদের সংগঠনে যোগ দিতে বাধ্য করে অথবা মুক্তিপণ আদায়ে ব্যবহার করে।

তবে বোকো হারামের প্রধান লক্ষ্য হলো, পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা করা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তারা বিশ্বাস করে যে এই ধরনের শিক্ষা তাদের ‘ইসলামিক’ আদর্শের পরিপন্থী।

তাদের আরেকটি লক্ষ্য হলো, নাইজেরিয়ায় ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা সহিংসতা ও অপহরণের মতো কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করে।

এর বাইরে অপহৃতদের (মেয়ে) মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করে তারা তাদের সামরিক ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। অনেক ক্ষেত্রে, অপহৃতদের (ছেলে) তাদের নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।

উত্তরের অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীও মূলত মুক্তিপণের জন্যই অপহরণ করে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এদের অনেকেই আগে গবাদিপশু পালন বা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর তারা অস্ত্র হাতে নিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...