Ajker Patrika

নাক ডাকা: কারণ, ঝুঁকি ও পরিত্রাণের উপায়

ফিচার ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঘুমিয়ে পড়া কি আপনাকে লোকের সামনে হাসির পাত্র বানিয়ে তুলছে? এ জন্য কি কারও সঙ্গে ঘুমাতে সংকোচ বোধ করছেন? সোজাভাবে জিজ্ঞাসা করি, ঘুমালে কি আপনার নাক ডাকে? নাক ডাকা একটি সাধারণ সমস্যা। কিন্তু এটি কেবল আপনার বা আপনার সঙ্গীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না, বরং অনেক সময় গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। যেমন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। পুরুষের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। পুরুষ ও নারী নাক ডাকার অনুপাত ২.৩: ১।

নাক ডাকার প্রধান কারণ স্থূলতা হলেও এক-তৃতীয়াংশ হালকা-পাতলা মানুষও নাক ডাকেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় বাতাসের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে গলার শিথিল টিস্যুগুলো কেঁপে ওঠে এবং জোরে শব্দ সৃষ্টি হয়। শিশুবিশেষজ্ঞ আমিনুল ইসলাম শেখ বলেন, শরীরের অতিরিক্ত ওজন নাক ডাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাড়তি ওজন নাকের ভেতরে বাতাস চলাচলের জায়গা সংকীর্ণ করে দেয়। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস চলাচলের সময় শব্দের সৃষ্টি হয়। তাই ওজন কমালে এই সমস্যা থেকে অনেকটা রেহাই পাওয়া সম্ভব।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ঘরোয়া প্রতিকার

নাক ডাকার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘুমের অভ্যাস এবং জীবনধারা।

১। এক পাশে কাত হয়ে ঘুমানো উচিত। চিত হয়ে ঘুমালে অনেক সময় জিহ্বা পেছনের দিকে চলে যায় এবং আংশিকভাবে শ্বাস পথ বন্ধ করে দেয়। এক পাশে কাত হয়ে ঘুমালে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে, যা নাক ডাকা কমাতে বা থামাতে সাহায্য করে।

২। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের ঘাটতি হলে গলার পেশি শিথিল হয়ে যায়, যা শ্বাস পথকে সংকুচিত করে এবং নাক ডাকার ঝুঁকি বাড়ায়। আমিনুল ইসলাম শেখ বলেন, দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে নাক ডাকা বেড়ে যেতে পারে। তা ছাড়া হঠাৎ যেকোনো সময় শুরুও হতে পারে।

৩। বিছানার মাথার দিকটি কয়েক ইঞ্চি উঁচু করে ঘুমালে শ্বাস পথ খোলা রাখতে সাহায্য করে। এর জন্য বিশেষভাবে তৈরি পিলো বা বেড রাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪। নাকের ওপর স্টিক-অন নেজাল স্ট্রিপ বা নাসারন্ধ্রের ওপর এক্সটারনাল নেজাল ডাইলেটর ব্যবহার করলে নাসারন্ধ্রের জায়গা বাড়ে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসকে আরও কার্যকর করে তোলে এবং নাক ডাকা কমায়। ইন্টারনাল নেজাল ডাইলেটরও ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫। ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে। ঘুমানোর অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে থেকে অ্যালকোহল পান থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল গলার পেশিগুলো শিথিল করে দেয়, যা নাক ডাকার সৃষ্টি করে।

৬। ঘুমের ওষুধ বা উপশমকারী এড়িয়ে চলতে হবে। যদি আপনি ঘুমের ওষুধ বা সেডেটিভ গ্রহণ করেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অ্যালকোহলের মতো এই ওষুধগুলোও গলার পেশিকে শিথিল করে নাক ডাকার সমস্যা বাড়াতে পারে।

৭। ধূমপান অভ্যাস নাক ডাকার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান ত্যাগের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৮। অতিরিক্ত ওজন থাকলে গলার চারপাশে চর্বি জমতে পারে, যা শ্বাস পথকে সংকুচিত করে। সুষম খাদ্য গ্রহণ, ক্যালরি বা কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে এবং প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে তা নাক ডাকা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

এগুলো ছাড়াও ডা. আমিনুল ইসলাম শেখ মেডিটেশনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, মেডিটেশন বা ধ্যান শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন সমস্যার অনেক বড় সমাধান। মেডিটেশনের মাধ্যমে আপনার অজানা অনেক সমস্যার সমাধানও হতে পারে। এর মাধ্যমে আপনি নাক ডাকা থেকেও মুক্তি পেতে পারেন।

চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান

যদি জীবনযাত্রার পরিবর্তনে কাজ না হয়, তবে নাক ডাকার অন্তর্নিহিত চিকিৎসা অবস্থার সমাধানের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।

১। দীর্ঘস্থায়ী অ্যালার্জির অ্যালার্জি নাকে বাতাসের প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে; যা মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করে এবং নাক ডাকা বাড়িয়ে তোলে। অ্যান্টিহিস্টামিন, নেজাল স্প্রে বা কর্টিকোস্টেরয়েডের মতো অ্যালার্জির ওষুধ ব্যবহারের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

২। নাকের কাঠামোগত ত্রুটি সংশোধন: জন্মগত বা আঘাতের কারণে সৃষ্ট ডেভিয়েটেড সেপ্টাম (নাকের ভেতরের পার্টিশনের মিসঅ্যালাইনমেন্ট) বাতাসের প্রবাহকে বাধা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেপ্টোপ্লাস্টি নামক অস্ত্রোপচার প্রয়োজনীয় হতে পারে।

৩। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য সিপিএপি মেশিন: অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য সিপিএপি মেশিন আদর্শ চিকিৎসা। এটি ঘুমের সময় নাক বা মুখের ওপর চাপযুক্ত বাতাসের মাস্ক ব্যবহার করে শ্বাস পথ খোলা রাখে।

৪। ওরাল অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহার: দন্ত চিকিৎসক কর্তৃক বিশেষভাবে তৈরি ওরাল অ্যাপ্লায়েন্স ঘুমের সময় ওপরের শ্বাস পথের আকার বাড়িয়ে নাক ডাকা কমাতে সাহায্য করে। যাঁরা কনজারভেটিভ পদ্ধতিতে উপশম পাননি, তাঁদের জন্য এটি সুপারিশ করা হয়।

৫। প্যালাটাল ইমপ্ল্যান্ট: এই অস্ত্রোপচারে নরম তালুতে ছোট ইমপ্লান্ট প্রবেশ করানো হয়, যা টিস্যুর কম্পন কমিয়ে নাক ডাকা হ্রাস করে। এটি হালকা থেকে মাঝারি স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত।

৬। ইউভুলোপ্যালাটোফ্যারিঙ্গোপ্লাস্টি: এটি একটি অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া, যেখানে গলা থেকে অতিরিক্ত টিস্যু অপসারণ করে শ্বাস পথ প্রশস্ত করা হয়, যাতে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে।

৭। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন: এই ন্যূনতম আক্রমণাত্মক চিকিৎসায় কম তীব্রতার রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে নরম তালুর টিস্যুকে সংকুচিত করা হয়। একে সোমনোপ্লাস্টিও বলা হয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ কখন জরুরি

নাক ডাকা সাধারণ হলেও এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে; যা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। যদি আপনার নাক ডাকা খুব জোরালো হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসে সাময়িক বিরতি আসে, অথবা আপনি দিনের বেলায় প্রচণ্ড ক্লান্তি বা ঘুম অনুভব করেন, তবে দ্রুত একজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সঠিক রোগনির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা আপনার ঘুম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে পারে।

সূত্র: হেলথ লাইন, ডেইলি মেইল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...