Ajker Patrika

বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিন থেরাপিতে সুস্থ বিরল রোগে আক্রান্ত অলিভার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অলিভার চু। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
অলিভার চু। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

মাত্র তিন বছরের শিশু অলিভার চু বিরল ও ভয়াবহ একটি জিনগত রোগে আক্রান্ত। কিন্তু সম্প্রতি জিন থেরাপি নেওয়ার পর তাঁর উন্নতি দেখে চিকিৎসকেরা বিস্মিত হয়েছেন। হান্টার সিনড্রোম বা এমপিএস-২ নামে পরিচিত এই রোগে আক্রান্ত অলিভার এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে।

বাবার সঙ্গে অলিভার চু। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
বাবার সঙ্গে অলিভার চু। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

হান্টার সিনড্রোম হলো একটি বিরল ও বংশগত রোগ, যা সাধারণত পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বিশ্বে প্রতি এক লাখ ছেলেশিশুর মধ্যে একটি এতে আক্রান্ত হয়। এই রোগ ধীরে ধীরে শরীর ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা সাধারণত ২০ বছরের আগে মারা যায়।

ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে ছোট অলিভারের শরীর জরুরি একটি এনজাইম উৎপাদন করতে পারত না। কিন্তু ম্যানচেস্টারের চিকিৎসকেরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিন থেরাপির মাধ্যমে অলিভারের কোষ পরিবর্তন করে তাকে সুস্থ করে তুলেছেন।

এই থেরাপির দায়িত্বে থাকা প্রফেসর সায়মন জোনস বিবিসিকে বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম এমন একটি ঘটনার জন্য। অলিভারের মাধ্যমে আমরা এই সফলতা অর্জন করতে পেরেছি।’ অলিভার বিশ্বজুড়ে এই থেরাপি পাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে প্রথম।

চিকিৎসা শুরুর এক বছর পর এখন অলিভার স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। তাঁর মা জিংরু আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরা সব সময় অলিভারকে নিয়ে কথা বলি। যখন তার ওই রোগের কথা মনে হয়, আমার কান্না চলে আসে। কিন্তু এখন অলিভার সুস্থ। এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

বিবিসি গত এক বছর ধরে অলিভারের চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ রেখেছে। যুক্তরাজ্যে কীভাবে এই জিন থেরাপি তৈরি হলো এবং অর্থাভাবের কারণে কীভাবে অলিভারের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, সবই ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ম্যানচেস্টারের হাসপাতালে অলিভার ও তার বাবা রিকির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। হান্টার সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার পর এপ্রিল থেকে অলিভারের জীবন কেটেছে হাসপাতালে।

অলিভারের বড় ভাই স্কাইলারও একই রোগে আক্রান্ত। তার কথাবার্তা ও চলাফেরায় কিছু সমস্যা দেখা দিলে শুরুতে তা কোভিড মহামারির সময় জন্মানোর পরিণতি হিসেবে ধরা হয়েছিল।

রিকি বলেন, ছেলেদের রোগ নির্ণয়ের খবর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো ছিল। চিকিৎসকেরা প্রথমেই বলেন—ইন্টারনেটে কিছু খুঁজবেন না। সেখানে ভয়াবহ কেস দেখে মন ভেঙে যাবে। কিন্তু রিকির কথায়, ‘চিকিৎসকেরা নিষেধ করলেও মানুষ এটা খুঁজবে। আমরাও খুঁজেছি আর মনে হয়েছে—ওহ ঈশ্বর! আমার দুই ছেলেরও কি এটাই হতে যাচ্ছে?’

এই অবস্থায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অলিভারের শরীর থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ শুরু হয়। রয়্যাল ম্যানচেস্টার চিলড্রেনস হাসপাতালের চিকিৎসক ক্লেয়ার হরগান বলেন, অলিভারের রক্ত একটি বিশেষ যন্ত্রে পাঠানো হচ্ছে, যা নির্দিষ্ট স্টেম সেল সংগ্রহ করবে। এগুলো ল্যাবে পাঠিয়ে পরিবর্তন করা হবে এবং পরে আবার তার শরীরে দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, স্টেম সেল হলো বিশেষ ধরনের কোষ। এগুলো শরীরের যেকোনো কোষে রূপান্তরিত হতে পারে এবং শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে মেরামত করতে সাহায্য করে। এগুলোকে সাধারণত শরীরের ‘মেরামতব্যবস্থা’ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। মানুষের শরীরে প্রধানত দুই ধরনের স্টেম সেল পাওয়া যায়—ভ্রূণীয় স্টেম সেল ও প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল।

অলিভারের কোষগুলোকে লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হান্টার সিনড্রোমে রোগীর জিনে কিছু ত্রুটি থাকে, যার ফলে কোষে আইডিএস নামে জরুরি একটি এনজাইম তৈরি হয় না। বিজ্ঞানীরা সেই অনুপস্থিত জিনটি একটি ভাইরাসে বসিয়ে দেন। তবে এর আগে ওই ভাইরাসের রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয়।

গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের চিকিৎসক ক্যারেন বাকল্যান্ড বলেন, ‘আমরা এই ভাইরাসকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে স্টেম সেলের ভেতর কার্যকর জিনটি ঢুকিয়ে দিই। পরে এগুলো অলিভারের শরীরে ফিরে গেলে নতুন সাদা রক্তকণিকা ও অনুপস্থিত এনজাইম তৈরি করে।’

মস্তিষ্কে এনজাইম পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন। তাই জিনটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে উৎপন্ন এনজাইম-রক্ত সহজে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অলিভার ম্যানচেস্টারে ফেরত আসে জিন-সম্পাদিত কোষ নিতে। গবেষণা দলের সদস্যরা ক্রায়ো ট্যাংক (বিশেষ ধরনের পাত্র) খুলে বরফ-ঠান্ডা অবস্থায় থাকা কোষগুলো বের করেন। গরম করে সেগুলো অলিভারের শরীরের তাপমাত্রায় আনা হয়।

এরপর একটি ছোট ইনফিউশন ব্যাগে থাকা প্রায় ১২৫ মিলিয়ন জিন-পরিবর্তিত কোষ সিরিঞ্জে তোলা হয়। নার্স ধীরে ধীরে ক্যাথেটারের মাধ্যমে কোষগুলো অলিভারের শরীরে প্রবেশ করান। অলিভারের মা জিংরু তাকে ধরে রাখেন। ১০ মিনিটে প্রথম ইনফিউশন শেষ হয়, তারপর এক ঘণ্টা পর দ্বিতীয় ইনফিউশন।

এতেই শেষ জিন থেরাপির পুরো প্রক্রিয়া। খুব দ্রুত শেষ হলেও এর লক্ষ্য বিশাল—জটিল এক রোগ থামানো। কয়েক দিন পর মা-ছেলে ক্যালিফোর্নিয়া ফিরে যান। এখন অপেক্ষা—থেরাপি কাজ করছে কি না।

চলতি বছরের মে মাসে পরীক্ষার জন্য অলিভার আবার ম্যানচেস্টারে আসে। এবার পরিবারের সবাই এসেছে। পার্কে দেখা হতেই বোঝা গেল অলিভারের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। সে আগের চেয়ে বেশি চলাফেরা করছে, সতেজ ও সক্রিয়।

অলিভারের বাবা রিকি বলেন, সে খুব ভালো করছে। কথা বলা ও চলাফেরায় উন্নতি হচ্ছে। মাত্র তিন মাসে সে অনেক পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় সুখবর—এখন প্রতি সপ্তাহে অলিভারের শরীরে আর এনজাইম প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ছে না। সে এখন নিজেই এনজাইম তৈরি করছে।

অলিভারের মা জিংরু বলেন, চিকিৎসার আগে ও পরে অলিভারের মধ্যে এখন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সে কথা বলছে, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলছে। বাবা রিকি বলেন, স্কাইলারেরও যদি এমন থেরাপি দেওয়া যেত! মনে হচ্ছে, অলিভার যেন নতুন জীবন পেয়েছে।

হাসপাতালের ছাদবাগানে খেলতে থাকা অলিভারকে দেখে রিকি বলেন, এ যেন সম্পূর্ণ নতুন এক বাচ্চা—দৌড়াচ্ছে, কথা বলছে, হাসছে।

প্রতি তিন মাসে পরীক্ষা করতে অলিভার ম্যানচেস্টারে আসে। আগস্টে নিশ্চিত হয়—থেরাপি সফলভাবে কাজ করছে। এখন নয় মাস পেরিয়েছে। অলিভারের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা প্রফেসর সায়মন জোনস বলেন, আগে অলিভারের শরীরে এনজাইমই তৈরি হতো না, এখন স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বেশি তৈরি হচ্ছে। তবে তিনি সতর্কও করেন, ‘এখন পর্যন্ত সব ভালো, কিন্তু আমাদের আরও সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’

জানা গেছে, এই জিন থেরাপি ট্রায়ালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া থেকে পাঁচ শিশুকে নির্বাচন করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে কেউ নেই—কারণ, সেখানকার রোগীরা দেরিতে ধরা পড়েছিল।

দুই বছর পর্যবেক্ষণ শেষে ট্রায়াল সফল হলে জিন থেরাপিটি লাইসেন্সিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা হবে। একই পদ্ধতিতে আরও বিরল জিনগত রোগের চিকিৎসা তৈরি হচ্ছে।

রিকি ও জিংরু ম্যানচেস্টারের চিকিৎসক দলের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তাঁদের মতে, অলিভারের উন্নতি অবিশ্বাস্য। রিকি বলেন, অলিভারের জীবন আর সুচ ও হাসপাতাল দিয়ে ঘেরা নয়। তার কথা বলা, চলাফেরা, শেখার ক্ষমতা—সবকিছুই বেড়েছে।

ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ব্রায়ান বিগারের নেতৃত্বে হান্টার সিনড্রোমের জিন থেরাপি তৈরিতে লেগেছিল ১৫ বছরের বেশি সময়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ছোট বায়োটেক প্রতিষ্ঠান অ্যাভ্রোবায়োর সঙ্গে ট্রায়ালের চুক্তি হয়। কিন্তু তিন বছর পর প্রতিষ্ঠানটি অর্থাভাবে লাইসেন্স ফিরিয়ে দেয়। এতে প্রথম মানব ট্রায়াল পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়ে।

প্রফেসর জোনস বলেন, ‘আমাদের দ্রুত বিকল্প স্পন্সর ও তহবিল খুঁজতে হয়েছে। ঠিক তখনই ব্রিটেনের মেডিকেল রিসার্চ চ্যারিটি লাইফআর্ক ২৫ লাখ পাউন্ড তহবিল দিয়ে এগিয়ে আসে।’

ব্রিটিশ চ্যারিটি সংস্থা লাইফআর্কের সিইও স্যাম ব্যারেল বলেন, যুক্তরাজ্যে ৩৫ লাখ মানুষ বিরল রোগে আক্রান্ত। তাদের জন্য বড় সমস্যা হলো—চিকিৎসার অভাব। ৯৫ শতাংশ রোগেরই চিকিৎসা নেই। তবে জিন থেরাপির মাধ্যমে এসব রোগের চিকিৎসা করা গেলে অনেকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।

শিশুরা জন্মের পর সুস্থ দেখালেও সাধারণত দুই বছর বয়সে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়—শারীরিক পরিবর্তন, অঙ্গ-সন্ধির শক্ত হয়ে যাওয়া, খাটো গড়ন, হৃদ্‌যন্ত্র, যকৃৎ, হাড়ের জোড়ায় ক্ষতি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মানসিক প্রতিবন্ধকতা ও স্নায়বিক অবনমন দেখা দেয়। এত দিন হান্টার সিনড্রোমের একমাত্র ওষুধ ছিল এলাপ্রেস, যার বার্ষিক খরচ রোগীপ্রতি প্রায় তিন লাখ পাউন্ড বা পৌনে পাঁচ কোটি টাকা। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে জিন থেরাপি অনুমোদন পেলে এই রোগের চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সমস্যা: কেন হয় এবং প্রতিরোধে করণীয়

ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী 
গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সমস্যা: কেন হয় এবং প্রতিরোধে করণীয়

গলা বা বুক জ্বালাপোড়া, টক কিংবা তিতা ঢেকুর, খাবার ওপরে উঠে আসা, গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, খাবার গিলতে কষ্ট, এমনকি স্বর ভাঙা—এসব উপসর্গে হরহামেশা মানুষ ভোগে। এগুলো একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং কাজের সক্ষমতা ব্যাহত করে। ইএনটি চিকিৎসায় আমরা অনেক সময় গলা পরীক্ষা করে কোনো ক্ষত, প্রদাহ বা সিরিয়াস প্যাথলজি না পেলে এসব সমস্যার মূল কারণ হিসেবে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিআরইডি) শনাক্ত করি।

১৯৯৯ সাল থেকে প্রতি নভেম্বর মাসে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ সচেতনতা সপ্তাহ। এ বছরও ২৩-২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে জিআরইডি সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৫।

এই বছরের মূল বিষয় হলো, ‘চলুন, জিআরইডি নিয়ে কথা বলি’; যা রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসা ও ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করার গুরুত্বকে আরও জোরদার করে।

বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ১৫ জন জিআরইডিতে ভুগছেন। ইউরোপ ও আমেরিকায় এর প্রকোপ বেশি হলেও এশিয়ায়, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিরোধ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক রোগী জটিলতায় পড়েন এবং দীর্ঘদিন ওষুধনির্ভর থাকতে হয়।

গলা ও বুক জ্বালাপোড়া কেন হয়

‘গ্যাস্ট্রো’ বলতে পাকস্থলী আর ‘ইসোফেগাস’ বলতে খাদ্যনালিকে বোঝায়। সাধারণত খাবার খাদ্যনালি দিয়ে নিচের দিকে পাকস্থলীতে নামে। কিন্তু কোনো কারণে এই স্বাভাবিক পথ ব্যাহত হলে পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালির ওপরের দিকে উঠে আসে। এই অ্যাসিডই গলা ও বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুরসহ নানা উপসর্গ তৈরি করে।

  • যাঁদের জিআরইডি হওয়ার ঝুঁকি বেশি
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভোগেন
  • ধূমপানের অভ্যাস যাঁদের আছে
  • একবারে বেশি খাবার খান
  • খাবারের পরপরই শুয়ে পড়েন
  • বেশি তেলেভাজা ও মসলাযুক্ত খাবার খান
  • কোমল পানীয় ও অনিয়মিত কফি সেবন
  • গর্ভবতী নারীদের পেটে চাপ বাড়ায় ঝুঁকি বেশি

বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্কতা

বুক জ্বালাপোড়া সব সময় জিআরইডি না-ও হতে পারে। তবে হৃদ্‌রোগের কারণেও একই উপসর্গ হতে পারে। পার্থক্য বোঝার জন্য কিছু লক্ষণ জানা খুব জরুরি।

  • জিআরইডি: বুক ও গলায় জ্বালা, টক ঢেকুর
  • হৃদ্‌রোগ
  • বাঁ হাত/ঘাড়/চোয়ালে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি বমি ভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অস্থিরতা—এসব উপসর্গ থাকলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

প্রতিরোধে যা করবেন

  • একবারে বেশি খাবেন না, দিনে অল্প অল্প করে ভাগ করে খাবেন।
  • খাবার ভালো করে চিবিয়ে খান।
  • রাতের খাবার শোয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে খাবেন।
  • মানসিক চাপ কমান, স্ট্রেস বাড়লে অ্যাসিড নিঃসরণও বাড়ে।
  • ঢিলেঢালা পোশাক পরুন, বিশেষ করে রাতে।
  • ভরা পেটে ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।
  • ব্যথানাশকসহ কিছু ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করুন।
  • খাওয়ার পর শোয়ার সময় মাথার দিক সামান্য উঁচুতে রাখুন।
  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন।

লেখক: আবাসিক সার্জন (ইএনটি), সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

শীতে ত্বকের যত্ন ও চর্মরোগ থেকে পরিত্রাণের উপায়

ডা. মো. মোশাররফ হোসেন
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২: ০৪
শীতে ত্বকের যত্ন ও চর্মরোগ থেকে পরিত্রাণের উপায়

শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা। এই মৌসুমে মানবদেহের ত্বকের যত্ন নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে ডায়াবেটিস, কিডনি ও থাইরয়েডের রোগীদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

শীতকালে সাধারণত ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং কারণ ছাড়াই চুলকানি শুরু হতে পারে। ঠোঁট ও পায়ের চামড়া ফেটে গিয়ে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ সময় খুশকির সমস্যা বাড়ে। স্ক্যাবিস এবং অ্যালার্জিজনিত রোগের প্রকোপও বেড়ে যায়।

পুরোনো উলের পোশাক, বিভিন্ন ক্রিম, লোশন ব্যবহারে ত্বকে প্রদাহ দেখা দিতে পারে। বিশেষত ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি রোগ ও থাইরয়েডের রোগীদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যায় এবং চুলকানির তীব্রতা বেশি থাকে।

শীতে ত্বকে যে ধরনের সমস্যা হয়

  • ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • কোনো কারণ ছাড়াই চুলকানো
  • ঠোঁট-পা শুষ্ক হয়ে ফেটে যাওয়া এবং ইনফেকশন হওয়া
  • খুশকি বেশি হওয়া
  • কিছু চর্মরোগ বেশি মাত্রায় দেখা দেওয়া; যেমন স্ক্যাবিস, অ্যালার্জি ইত্যাদি
  • পুরোনো জামাকাপড়, উলের পোশাক, বিভিন্ন ক্রিম, লোশন, পমেড ইত্যাদি ব্যবহারে চুলকানি ও ত্বকের প্রদাহ হওয়া।

এ ছাড়া বিভিন্ন ক্রনিক ডিজিজ; যেমন ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি রোগ, থাইরয়েডের রোগে বেশি মাত্রায় ত্বক শুষ্ক হওয়া এবং চুলকানি হওয়া।

শীতে ত্বকের সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়

সাধারণ কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে শীতে ত্বকের সুরক্ষা সম্ভব। বিশেষ করে যাঁরা বিভিন্ন অ্যালার্জি এবং ক্রনিক ডিজিজ; যেমন ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি রোগ, থাইরয়েডের রোগে ভুগছে; তাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকাসহ ত্বকের যত্ন নিতে হবে।

  • অতিরিক্ত শীতে প্রয়োজন ছাড়া বের না হওয়া
  • বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়া
  • ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা
  • অলিভ অয়েল, নারকেল তেল, ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন ইত্যাদি ব্যবহার করা।
  • পুরোনো ও উলের কাপড় ব্যবহারের আগে ধুয়ে নেওয়া এবং যাদের উলের কাপড়ে অ্যালার্জি আছে, তাদের ভেতরে সুতির কাপড় পরিধান করা।
  • স্ক্যাবিস হলে পুরোনো ও উলের কাপড়চোপড়, চাদর, গামছা, তোয়ালে, লেপ, কম্বল ইত্যাদি ব্যবহার না করা। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা নেওয়া।
  • ঠোঁট ও পায়ের চামড়া শুষ্ক হয়ে ফেটে গেলে, ব্যথা ও ইনফেকশন হলে; বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগীরা দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
  • যাঁদের সাধারণ নিয়মকানুন মানার পরও ত্বকের সমস্যা যাচ্ছে না, তাঁদের দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
  • শীতকাল আনন্দের হলেও ত্বকের জন্য এটি চ্যালেঞ্জের মৌসুম। সামান্য সচেতনতা এবং সঠিক যত্নের মাধ্যমে এ সময় ত্বককে সুস্থ, মসৃণ ও আরামদায়ক রাখা সম্ভব।

লেখক: চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

শীতকালীন বিষণ্নতা কাটাতে যা করবেন

ফিচার ডেস্ক
শীতকালীন বিষণ্নতা কাটাতে যা করবেন

কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল, ঘুম থেকে উঠেই একরাশ মন খারাপ জেঁকে বসল। কিংবা প্রতিদিনের মতো এক বিকেল বেলা। হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল। হয় না? এমন তো প্রায়ই হয়। শীতকাল মানেই বড় রাত আর দিন ছোট। দীর্ঘ শীতের রাত যখন আপনার মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন একে বলে সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিজঅর্ডার বা স্যাড। এটি বিষণ্নতার একটি রূপ, যা মূলত শীতকালে আলোর অভাবের কারণে হয়। এ রহস্যময় ব্যাধিটি প্রায় ২৫ মিলিয়ন আমেরিকানকে প্রভাবিত করে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও এ ধরনের বিষণ্ণতা দেখা যায়।

শীতকালে মন খারাপ কেন হয়

শীতকালীন মন খারাপের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে কী করতে হবে, জানেন? তার আগে বলুন, সুখের হরমোন সম্পর্কে জানেন তো? ‘সুখের হরমোন’ বা ‘ফিল গুড কেমিক্যাল’-এর নাম হলো সেরোটোনিন। এটি মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাসায়নিক বা নিউরো ট্রান্সমিটার। এটি মূলত মস্তিষ্কে এবং পরিপাকতন্ত্রে তৈরি হয় এবং শরীরের বহুবিধ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শীতকালীন মন খারাপের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাজহারুল হক তানিম বলেন, ‘শীতকালে আলোর অভাবে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের উৎপাদন অনেকটা কমে যায়, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভালো থাকার অনুভূতি তৈরি করে। ফলে বিষণ্নতা, অতিরিক্ত ঘুম, উদ্বেগ, বিরক্তি এবং সামান্য বিষয়ে আচ্ছন্নতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।’ তবে সুখবর হলো, এপ্রিল কিংবা মে মাস নাগাদ দিন দীর্ঘ হলে সাধারণত এ সমস্যা পুরোপুরি সেরে যায়। চিকিৎসা হিসেবে যদিও লাইটথেরাপি ও ওষুধ রয়েছে, তবে জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন এনেও আপনি সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে নিতে পারেন।

সেরোটোনিন বুস্ট করার ৩ উপায়

সানফ্রান্সিসকোর রিকভারি সিস্টেমস ক্লিনিকের পরিচালক এবং দ্য মুড কিউর ও দ্য ডায়েট কিউরের লেখক জুলিয়া রস সেরোটোনিন বাড়ানোর তিনটি সহজ উপায় উল্লেখ করেছেন।

উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোর ব্যবহার

নিজেকে উজ্জ্বল ইনডোর আলোর সংস্পর্শে আনুন। এটি স্যাড চিকিৎসার একটি মূল অংশ। এই আলো ৩ ফুট দূর থেকে দিনে তিনবার ২০ মিনিটের জন্য ব্যবহারে সাময়িকভাবে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

নিয়মিত ব্যায়াম

স্যাডের চক্রে আটকে থাকলে ব্যায়াম করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু নিজেকে জোর করে শুরু করতে পারলে এটি খুবই কার্যকর। মাত্র ১৫-২০ মিনিটের দ্রুত হাঁটা বা রেডিওতে নেচে নেওয়া মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা কমাতে এবং মেজাজ উন্নত করতে পারে।

বিচক্ষণ খাদ্য গ্রহণ

মিষ্টি এবং সাদা চাল বা সাদা রুটির মতো সাধারণ শর্করা এড়িয়ে চলুন। কারণ, এগুলো রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ায়, ইনসুলিনের বন্যা ঘটায় এবং পরক্ষণে মেজাজ খারাপ করে। সেরোটোনিনকে দমন করে এমন ক্যাফিনের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। রস পরামর্শ দেন, ‘যদি কফি খেতেই হয়, তাহলে তা খাওয়ার পরে পান করুন।’

মেজাজ ভালো রাখতে কী খাবেন

এনওয়াইইউ মেডিকেল সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট সামান্থা হেলার এবং জুলিয়া রস আরও কিছু পুষ্টিগত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রোটিন এবং সবজি

রস দিনে তিনবার প্রোটিন খাওয়ার এবং প্রতিদিন চার কাপ উজ্জ্বল রঙের সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন। সবজি হলো এমন শর্করা, যা আপনার সিস্টেমে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে।

স্বাস্থ্যকর শর্করা বেছে নিন

হেলার কুকিজ বা চকলেট আইসক্রিমের পরিবর্তে ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন। সাধারণ শর্করা বাদ দিয়ে সবজি, ফল এবং বিনস জাতীয় স্বাস্থ্যকর শর্করা গ্রহণ করলে শক্তির মাত্রা বজায় থাকে।

সাদা, শ্বেতসারযুক্ত খাবার বাদ দিন

হেলার মানুষকে দুই সপ্তাহের জন্য সব ধরনের সাদা, শ্বেতসারযুক্ত খাবার; যেমন রুটি, ভাত, আলু খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রতি জোর দেন। তিনি বলেন, এর ফলে আপনি নিজের শরীরে আশ্চর্যজনক পার্থক্য অনুভব করবেন।

সময় মেনে খাদ্য গ্রহণ

ফ্যাশনেবল হলেও দিনে কয়েকবার অল্প খাবার খাওয়া ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। তবে দুপুরের এবং রাতের খাবারের মধ্যে যদি দীর্ঘ বিরতি থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস নিন। জাঙ্ক ফুড খেলে দুপুরের পরই মিষ্টির জন্য অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।

সূত্র: ওয়েব মেড

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

নাক ডাকা: কারণ, ঝুঁকি ও পরিত্রাণের উপায়

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১০: ০২
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঘুমিয়ে পড়া কি আপনাকে লোকের সামনে হাসির পাত্র বানিয়ে তুলছে? এ জন্য কি কারও সঙ্গে ঘুমাতে সংকোচ বোধ করছেন? সোজাভাবে জিজ্ঞাসা করি, ঘুমালে কি আপনার নাক ডাকে? নাক ডাকা একটি সাধারণ সমস্যা। কিন্তু এটি কেবল আপনার বা আপনার সঙ্গীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না, বরং অনেক সময় গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। যেমন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। পুরুষের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। পুরুষ ও নারী নাক ডাকার অনুপাত ২.৩: ১।

নাক ডাকার প্রধান কারণ স্থূলতা হলেও এক-তৃতীয়াংশ হালকা-পাতলা মানুষও নাক ডাকেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় বাতাসের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে গলার শিথিল টিস্যুগুলো কেঁপে ওঠে এবং জোরে শব্দ সৃষ্টি হয়। শিশুবিশেষজ্ঞ আমিনুল ইসলাম শেখ বলেন, শরীরের অতিরিক্ত ওজন নাক ডাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাড়তি ওজন নাকের ভেতরে বাতাস চলাচলের জায়গা সংকীর্ণ করে দেয়। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস চলাচলের সময় শব্দের সৃষ্টি হয়। তাই ওজন কমালে এই সমস্যা থেকে অনেকটা রেহাই পাওয়া সম্ভব।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ঘরোয়া প্রতিকার

নাক ডাকার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘুমের অভ্যাস এবং জীবনধারা।

১। এক পাশে কাত হয়ে ঘুমানো উচিত। চিত হয়ে ঘুমালে অনেক সময় জিহ্বা পেছনের দিকে চলে যায় এবং আংশিকভাবে শ্বাস পথ বন্ধ করে দেয়। এক পাশে কাত হয়ে ঘুমালে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে, যা নাক ডাকা কমাতে বা থামাতে সাহায্য করে।

২। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের ঘাটতি হলে গলার পেশি শিথিল হয়ে যায়, যা শ্বাস পথকে সংকুচিত করে এবং নাক ডাকার ঝুঁকি বাড়ায়। আমিনুল ইসলাম শেখ বলেন, দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে নাক ডাকা বেড়ে যেতে পারে। তা ছাড়া হঠাৎ যেকোনো সময় শুরুও হতে পারে।

৩। বিছানার মাথার দিকটি কয়েক ইঞ্চি উঁচু করে ঘুমালে শ্বাস পথ খোলা রাখতে সাহায্য করে। এর জন্য বিশেষভাবে তৈরি পিলো বা বেড রাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪। নাকের ওপর স্টিক-অন নেজাল স্ট্রিপ বা নাসারন্ধ্রের ওপর এক্সটারনাল নেজাল ডাইলেটর ব্যবহার করলে নাসারন্ধ্রের জায়গা বাড়ে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসকে আরও কার্যকর করে তোলে এবং নাক ডাকা কমায়। ইন্টারনাল নেজাল ডাইলেটরও ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫। ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে। ঘুমানোর অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে থেকে অ্যালকোহল পান থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল গলার পেশিগুলো শিথিল করে দেয়, যা নাক ডাকার সৃষ্টি করে।

৬। ঘুমের ওষুধ বা উপশমকারী এড়িয়ে চলতে হবে। যদি আপনি ঘুমের ওষুধ বা সেডেটিভ গ্রহণ করেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অ্যালকোহলের মতো এই ওষুধগুলোও গলার পেশিকে শিথিল করে নাক ডাকার সমস্যা বাড়াতে পারে।

৭। ধূমপান অভ্যাস নাক ডাকার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান ত্যাগের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৮। অতিরিক্ত ওজন থাকলে গলার চারপাশে চর্বি জমতে পারে, যা শ্বাস পথকে সংকুচিত করে। সুষম খাদ্য গ্রহণ, ক্যালরি বা কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে এবং প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে তা নাক ডাকা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

এগুলো ছাড়াও ডা. আমিনুল ইসলাম শেখ মেডিটেশনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, মেডিটেশন বা ধ্যান শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন সমস্যার অনেক বড় সমাধান। মেডিটেশনের মাধ্যমে আপনার অজানা অনেক সমস্যার সমাধানও হতে পারে। এর মাধ্যমে আপনি নাক ডাকা থেকেও মুক্তি পেতে পারেন।

চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান

যদি জীবনযাত্রার পরিবর্তনে কাজ না হয়, তবে নাক ডাকার অন্তর্নিহিত চিকিৎসা অবস্থার সমাধানের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।

১। দীর্ঘস্থায়ী অ্যালার্জির অ্যালার্জি নাকে বাতাসের প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে; যা মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করে এবং নাক ডাকা বাড়িয়ে তোলে। অ্যান্টিহিস্টামিন, নেজাল স্প্রে বা কর্টিকোস্টেরয়েডের মতো অ্যালার্জির ওষুধ ব্যবহারের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

২। নাকের কাঠামোগত ত্রুটি সংশোধন: জন্মগত বা আঘাতের কারণে সৃষ্ট ডেভিয়েটেড সেপ্টাম (নাকের ভেতরের পার্টিশনের মিসঅ্যালাইনমেন্ট) বাতাসের প্রবাহকে বাধা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেপ্টোপ্লাস্টি নামক অস্ত্রোপচার প্রয়োজনীয় হতে পারে।

৩। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য সিপিএপি মেশিন: অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য সিপিএপি মেশিন আদর্শ চিকিৎসা। এটি ঘুমের সময় নাক বা মুখের ওপর চাপযুক্ত বাতাসের মাস্ক ব্যবহার করে শ্বাস পথ খোলা রাখে।

৪। ওরাল অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহার: দন্ত চিকিৎসক কর্তৃক বিশেষভাবে তৈরি ওরাল অ্যাপ্লায়েন্স ঘুমের সময় ওপরের শ্বাস পথের আকার বাড়িয়ে নাক ডাকা কমাতে সাহায্য করে। যাঁরা কনজারভেটিভ পদ্ধতিতে উপশম পাননি, তাঁদের জন্য এটি সুপারিশ করা হয়।

৫। প্যালাটাল ইমপ্ল্যান্ট: এই অস্ত্রোপচারে নরম তালুতে ছোট ইমপ্লান্ট প্রবেশ করানো হয়, যা টিস্যুর কম্পন কমিয়ে নাক ডাকা হ্রাস করে। এটি হালকা থেকে মাঝারি স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত।

৬। ইউভুলোপ্যালাটোফ্যারিঙ্গোপ্লাস্টি: এটি একটি অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া, যেখানে গলা থেকে অতিরিক্ত টিস্যু অপসারণ করে শ্বাস পথ প্রশস্ত করা হয়, যাতে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে।

৭। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন: এই ন্যূনতম আক্রমণাত্মক চিকিৎসায় কম তীব্রতার রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে নরম তালুর টিস্যুকে সংকুচিত করা হয়। একে সোমনোপ্লাস্টিও বলা হয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ কখন জরুরি

নাক ডাকা সাধারণ হলেও এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে; যা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। যদি আপনার নাক ডাকা খুব জোরালো হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসে সাময়িক বিরতি আসে, অথবা আপনি দিনের বেলায় প্রচণ্ড ক্লান্তি বা ঘুম অনুভব করেন, তবে দ্রুত একজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সঠিক রোগনির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা আপনার ঘুম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে পারে।

সূত্র: হেলথ লাইন, ডেইলি মেইল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত