Ajker Patrika

মাহিনের ক্যামেরার লেন্সে প্রাণ ও প্রকৃতি

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 
মাহিনের ক্যামেরার লেন্সে প্রাণ ও প্রকৃতি

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার দবিরগঞ্জ গ্রামের সাধারণ পরিবারের তরুণ মুতাসিম বিল্লাহ মাহিন। বাবা-মা ও ছোট বোনের সঙ্গে তাঁর ছোট্ট সংসার। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিবস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিষয়ে। কিন্তু মাহিনের বড় পরিচয় তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ ফটোগ্রাফার। পরিবারের কেউ ছবি তোলে না; ক্যামেরার প্রতি ভালোবাসা নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন তিনি।

মাহিনের ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে। এক বন্ধুর ফেসবুক অ্যালবাম দেখে মোবাইল ফটোগ্রাফির প্রতি আকৃষ্ট হন। পড়াশোনার ফাঁকে ফটোওয়াকে বেরিয়ে যান। নতুন কিছু চোখে পড়লেই ছবি তোলেন। সেই চেষ্টাই তাঁকে ধীরে ধীরে একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার বানিয়েছে।

২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর। মা-বাবার সহায়তায় কেনেন প্রথম ক্যামেরা ‘নিকন ডি-৭২০০’। প্রথমে মোবাইল ফোনসেট দিয়ে ছবি তোলেন। পরে সিনিয়র ফটোগ্রাফারদের পরামর্শ নেন, বই পড়েন এবং বড়দের ছবি দেখে অনুকরণ করতেন। ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়তে থাকে। মাহিনের মতে, ‘ফটোগ্রাফিতে শেখার কোনো শেষ নেই।’

ছবি তোলাকে মাহিন শুধু শখ হিসেবে বেছে নেননি। তাঁর ধারণা, কোনো দৃশ্য যদি শুধু চোখে দেখা হয় এবং ক্যামেরায় বন্দী না করা হয়, তাহলে মুহূর্তটি অসম্পূর্ণ থাকে। তাই তাঁর লক্ষ্য, যা ভালো লাগে, তা ধরে রাখা এবং মানুষের সঙ্গে শেয়ার করা।

এ পর্যন্ত মাহিন প্রায় ১০টি ফটো এক্সিবিশনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো জয়পুরহাট ফটোগ্রাফি ক্লাব এক্সিবিশন, স্বপ্নচূড়া ফটোগ্রাফি ইভেন্ট, এইচজিসি ফটোগ্রাফি কনটেস্ট, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি এক্সিবিশন, ফটো অ্যাফেয়ার্স এক্সিবিশন, রুচি বিউটিগ্রাম ৭, ওয়াইপিপিবি ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন, ইনকিলাব বইমেলা ২০২৪ এবং ফটোগ্রাফি সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার প্রদর্শনী।

2

মাহিনের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে, ২০২২ সালে ‘আমার পিক্স’ কনটেস্টে প্রথম স্থান, একই বছরে ওয়াইপিপিবি এক্সিবিশনে গোল্ড মেডেল, ২০২৩ সালে উল্লাপাড়া উপজেলার ফটো কনটেস্টে প্রথম স্থান এবং আভিগো ফটোগ্রাফি ইভেন্টে ‘বেস্ট অব বেস্ট’ পুরস্কার।

_DSC4182-01-min

দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র ও অনলাইন নিউজপোর্টালে তাঁর ছবি ও কাজ প্রকাশিত হয়েছে। মাহিনের প্রিয় বিষয় হলো ন্যাচার ও লাইফস্টাইল ফটোগ্রাফি, বিশেষ করে গ্রামবাংলার চিরাচরিত দৃশ্য। এ পর্যন্ত ৩১টি জেলা ঘুরেছেন ছবি তোলার জন্য। ভবিষ্যতে দেশের ৬৪টি জেলা ঘুরে ছবি তোলার এবং ভারত ও নেপাল ভ্রমণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের ইচ্ছে আছে তাঁর।

4

মাহিনের প্রিয় ছবিগুলোর একটি হলো, সিরাজগঞ্জের কাওকোলার চরে বৃষ্টির দিনে ছাতা হাতে হাঁটা এক মানুষের দৃশ্য, যা তাঁকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তবে অভিজ্ঞতার পথে ভয়ও ছিল; সেই কাওকোলা থেকে ফেরার সময় বজ্রপাত ও অন্ধকারে নৌকায় দিশেহারা হয়ে পড়া ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত। অন্যদিকে আনন্দের স্মৃতিও কম নয়। পাবনার ভাঙ্গুড়ার রাহুল বিলে হাজারো মানুষের পলো উৎসবের ছবি তুলতে পারা ছিল তাঁর ফটোগ্রাফি জীবনের অন্যতম আনন্দময় অর্জন।

শুরুতে অনেকে তাঁকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করত, যেমন ‘পাগল’, ‘খেয়েদেয়ে কাজ নেই’। এখন আর এমন মন্তব্য শোনা যায় না, বরং প্রশংসাই বেশি। মাহিন ভবিষ্যতে চাকরির পাশাপাশি ফটোগ্রাফি চালিয়ে যেতে চান। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি প্রথমে কল্পনায় ভাবি, তারপর সেই ছবির খোঁজে বের হই। সব সময় কল্পনার মতো ছবি না পেলেও সেই খোঁজটাই আমাকে পথ দেখায়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...