Ajker Patrika

মেয়াদোত্তীর্ণ অনাদায়ি ঋণ ১৩ লাখ কোটি

  • গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট বিতরণকৃত ঋণ ১৮ লাখ কোটি টাকা
  • সেপ্টেম্বরে ঘোষিত খেলাপি ঋণ সাড়ে ৬ লাখ কোটি
  • পুনঃতফসিলকৃত ঋণ সাড়ে ৩ লাখ কোটি
জয়নাল আবেদীন খান, ঢাকা 
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

চলতি বছরের গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে সোয়া ১৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও আদায় হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ এসব অনাদায়ি ঋণের প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপির খাতায় চলে গেছে গত সেপ্টেম্বরে। এ ছাড়া পুনঃ তফসিলকৃত অনাদায়ি ঋণ রয়েছে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ আছে ৭৫ হাজার কোটি এবং অর্থঋণ ও উচ্চ আদালতে চলমান মামলায় আটকে আছে আড়াই লাখ কোটি টাকা।

অনাদায়ি এসব ঋণের সিংহভাগ বিতরণ করা হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে। এ সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে সীমাহীন লুটপাট হয়। নামে-বেনামে বিপুল ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেয়নি প্রভাবশালী একটি চক্র। শুধু তা-ই নয়, এ চক্রটি ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করেও প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নিয়মিত দেখিয়েছে বছরের পর বছর। এতে বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ গোপন থেকে যায়।

কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ হতে শুরু করে। এতে হু হু করে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। সেই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংকগুলো গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৬ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করেছে। আর ১১ লাখ ৮৫ হাজার গ্রাহকের কাছে খেলাপি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। যদিও ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটের বাইরে অদৃশ্য মন্দ ঋণ আছে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর নামমাত্র এককালীন পরিশোধে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে দেখানো রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। ফলে দৃশ্যমান খেলাপি ও পুনঃতফসিলকৃত ঋণসহ মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো ও নাসা গ্রুপসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে ইচ্ছেমতো নীতিমালা তৈরি করাত। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, নীতি উপদেষ্টা, তাদের ছা-পোষা কর্মকর্তা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বোর্ড চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে শাখা প্রধান পর্যন্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিশেষ যোগসাজশ করে ঋণ নিত। এসব ঋণ পরিশোধ না করে তা নিয়মিত দেখাত তারা। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান গভর্নরের নির্দেশে খেলাপি ঋণের সঠিক হিসাব প্রকাশ পাচ্ছে। আর ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচারের তথ্যও পেয়েছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, ব্যাংকের টাকা অর্থনীতিতে ‘জ্বালানির মতো’ কাজ করে। এই খাতের বড় অঙ্কের টাকা ব্যবস্থাপনার বাইরে চলে গেলে গোটা অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০০৯ সালের হাসিনার সরকার গঠনের সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তার পলায়নের আগে ২০২৪ সালের জুনে ঘোষিত খেলাপি ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তা হয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি। সেই হিসাবে মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘ঋণখেলাপি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে জটিল সমস্যা। এত দিন এটা লুকানো হতো, এখন প্রকাশ পাচ্ছে। আগের সরকারের অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়েছেন। তাঁদের অনাদায়ি ঋণ ও লুকিয়ে রাখা খেলাপি প্রকাশ পাওয়া বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, আগে বিভিন্ন সময় ছলচাতুরী করে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো। আবার সহজে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের কারণেও খেলাপি ঋণ কম ছিল। এখন ঋণমানে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করায় খেলাপি বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত ডাউনপেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ চারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা যায়। গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২২ সালে নীতিমালায় বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়। আগে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিতে হলেও গভর্নর আব্দুর রউফ তা কমিয়ে মাত্র ১ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আগের সরকারের সময় কিছু গ্রাহক আদালতের বিশেষ আদেশে খেলাপি ঋণকেও নিয়মিত দেখাত। এখন সেই সুযোগ নেই। আর ৫ আগস্টের পর কিছু কারখানা বন্ধ। কিছু গ্রাহক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সেই ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাপক হারে বাড়ছে খেলাপি। খেলাপি আদায়ে আইনিসহ সব পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে ৯০ দিনের মেয়াদ পার হলে অনাদায়ি ঋণ খেলাপি করা হচ্ছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিশেষ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন করতে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলো মাত্র ২ শতাংশ ডাউন-পেমেন্টে খেলাপি ঋণ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বের করা অর্থ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। কিন্তু যেসব ঋণ নবায়ন করা হয়, তার অধিকাংশ আদায় হচ্ছে না। এতে ঋণের সিংহভাগ মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনাদায়ি থেকে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...