Ajker Patrika

‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ বেরোবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের কমিটি, শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ

বেরোবি সংবাদদাতা
‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ বেরোবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের কমিটি, শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ১০৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ধরনের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও সক্রিয়ভাবেই চলছে রাজনৈতিক দলগুলো। সম্প্রতি (২৭ নভেম্বর) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বেরোবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইয়ামিনকে সভাপতি ও লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. জহির রায়হানকে সাধারণ সম্পাদক করে বেরোবি শাখার ৯ সদস্যের কমিটি অনুমোদন করেছে। এ ছাড়া আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এক জরুরি সদস্য সমাবেশে বেরোবি শাখা শিবিরের ২০২৫ সেশনের বাকি সময়ের জন্য ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সুমন সরকারকে সভাপতি এবং একই শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুর রাকিব মুরাদকে সেক্রেটারির দায়িত্ব প্রদান করে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি ছিল ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং ছাত্র সংসদ চালু করা। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরই ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী সাংবাদিকদের এ ব্যাপারে বিস্তারিত ব্রিফ করেন।

কাগজে-কলমে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও একের পর এক কমিটি গঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোটেও কাম্য নয়।

ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী হাসান শেখ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি অরাজনৈতিক, শিক্ষাবান্ধব ও গবেষণাকেন্দ্রিক পরিবেশ রক্ষার প্রত্যয়ে পরিচালিত হয়ে আসার কথা ছিল কিন্তু কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে দলীয় কমিটি ঘোষণার উদ্যোগ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলীয় কমিটি গঠন শিক্ষার পরিবেশকে বিভক্ত, অস্থির এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিগত বছরগুলোতে আমরা সেগুলো পরিলক্ষিত করছি। এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতারও প্রতিফলন। আমরা চাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি শিক্ষাঙ্গন হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং শিক্ষা, গবেষণা, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।’

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিশাদ নুর বলেন, ‘একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে অফিশিয়ালি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, সেখানে কীভাবে শিক্ষার্থীরা কোন সাহসে, কার প্ররোচনায় কমিটি দেয়—সেটা আমার বোধগম্য হয় না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘৃণাভরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রতি এই অবমাননাকে প্রত্যাখ্যান করে। এখন প্রশাসনের ওপরে পুরো বিষয়টা। তারা যদি আবু সাঈদের ত্যাগকে মনে রাখে, তাহলে এই অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করবে। লিস্ট আছে, নাম আছে, পরিচয় আছে। প্রশাসন যদি এবার শক্ত পদক্ষেপ না নিয়ে ছেড়ে দেয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি কখনোই শেষ করা সম্ভব হবে না।’

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী প্রান্ত সরকার পলক বলেন, ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কমিটি গঠন আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করি। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের স্থান, কোনো দলের আধিপত্যের নয়। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার শুধু বিভাজন ও অশান্তি বাড়ায়। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, ক্যাম্পাসকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গঠনে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ আর-রহমান স্বপ্নীল বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক কমিটি ঘোষণাগুলো আমাকে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে উদ্বিগ্ন করেছে। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি সাধারণত শিক্ষার পরিবেশকে অস্থির করে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করে। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে পড়াশোনা, নিরাপত্তা আর নিরপেক্ষ পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাই এই ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় হওয়া আমাদের জন্য ভালো কোনো সংকেত নয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেরোবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ‘ছাত্রশিবির যখন কমিটি প্রকাশ করেছিল, আমরা তাদের ডেকেছিলাম। তারা সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মর্মে অঙ্গীকার করে বলেছে ক্যাম্পাসে কোনো রাজনীতি করবে না, যা করবে ক্যাম্পাসের বাইরে।’

উপাচার্য আরও বলেন, ‘দেখলাম ছাত্রদল তাদের কমিটি করেছে, কমিটিগুলো তো এখান থেকে করা হয় না; ঢাকা থেকে করা হয়। যেহেতু কমিটি করা হয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তকে সম্মান রেখে সেভাবেই কার্যক্রম চালাবে বলে আশা করি। তারপরও কেউ যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়, তাহলে শৃঙ্খলা কমিটি এবং সিন্ডিকেট তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...