Ajker Patrika

রংপুরের গঙ্গাচড়া: দেড় কোটি টাকায় বালুর বাঁধ

আব্দুর রহিম পায়েল, গঙ্গাচড়া (রংপুর) 
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৫: ৩৫
শুধু বালু দিয়ে বাঁধ সংস্কার, তারপর সেই বালু বাইরে বিক্রি করায় বাঁধে গর্ত। সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচড়ায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
শুধু বালু দিয়ে বাঁধ সংস্কার, তারপর সেই বালু বাইরে বিক্রি করায় বাঁধে গর্ত। সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচড়ায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

তিস্তা নদীর তীর রক্ষায় চলছে প্রায় দেড় কোটি টাকার বাঁধ সংস্কার প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে বালু লুট, রাজনৈতিক প্রভাব, পাউবো ও ঠিকাদারদের পকেট ভর্তির প্রকল্পে। ইস্টিমেটের নিয়ম লঙ্ঘন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা এবং নানা অনিয়মের জীবন্ত নমুনা এই প্রকল্প। প্রশাসনের নীরবতায় সবকিছুই ঘটছে স্থানীয়দের চোখের সামনে। ফলে নদীর তীর রক্ষার এই প্রকল্প স্থানীয়দের জন্য নতুন বিপদ নিয়ে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রংপুর পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ইউএনডিপির অর্থায়নে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নে তিস্তা নদীর ডান তীর (১২০৬ মিটার) রক্ষা বাঁধ সংস্কারের জন্য ১ কোটি ৩৮ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজের দায়িত্ব পেয়েছেন রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসিবুল হাসান। কিন্তু বাস্তবে কাজ করছেন রংপুরের ভরত প্রসাদ নামের এক সাব ঠিকাদার। কিন্তু বাঁধ সংস্কারে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সরেজমিনে অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে নির্দিষ্ট স্থানে কাজের ধরন ও ইস্টিমেটের বিবরণ দিয়ে নোটিশ বোর্ড টাঙানোর কথা থাকলেও তা না করে চুপিসারে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামকে ম্যানেজ করে কাজ করা হচ্ছে। ইস্টিমেটে বলা হয়েছে, বাঁধে মাটি ফেলার আগে পাড়ে কমপক্ষে ৬০ মিলিমিটার বাঁশের খুঁটি, পেগ ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি দড়ি ব্যবহার করে প্রোফাইল স্থাপন করতে হবে।

এ ছাড়া দূরের এলাকা থেকে ট্রাক, নৌকা বা অন্য মাধ্যমে মাটি, কাদা, সিল্ট ও প্রয়োজনীয় মিশ্রণ আনার কথা। ভরাট শেষে বাঁধে ঘাস ও গাছের চারা রোপণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ইস্টিমেটে। কিন্তু সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নোহালী ইউনিয়নের মাঝাপাড়া থেকে বৈরাতী এলাকা পর্যন্ত ৩০০ মিটার বাঁধের কাজ শুধু বালু ফেলেই শেষ করা হয়েছে। আর বাকি কাজের জন্য সেখান থেকে আধা কিলোমিটার দূরে সাপমারি এলাকায় নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বাঁধে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বালু উত্তোলনের বিষয়ে কথা হয় শ্রমিক সেরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরাই চারজন এখানে বালু উত্তোলনের কাজ করি। আমাদের চারজনকে দৈনিক ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর মেশিনের তেল ঠিকাদার দেয়। নদীর বালু তোলার পাউবোর এক্সইএন (পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী) স্যার জানেন।’

কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম, মাহফুজা বেগম, হামিদসহ বৈরাতী এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ‘এখানকার আশরাফ চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যানের মামা সাবেক মেম্বার ওয়াহেদ, বকুল মেম্বার (ইউপি সদস্য ও নোহালী ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব), আজহারুল মেম্বার এই কাজের সদস্য। এরাই নদীতে মেশিন বসিয়ে বাঁধে বালু তুলছেন। এর আগে বাইরে থেকে মাটি আনার কথা ছিল। টাকা নাকি বেশি লাগে, এ জন্য তাঁরা নদীতে মেশিন বসিয়ে বালু তুলছেন। কিছু বালু এখানে ফেলছেন, আর বেশির ভাগ বালু ট্রলি দিয়ে বিক্রি করছেন। কিছু বলতে গেলে বলেন, আমরা সরকারের কাজ করছি। মহিলা মানুষ বেশি কথা না বলে এখান থেকে যান। এ জন্য আমরা কিছু বলি নাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি ৩৭ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডে কাজ করেছি। এখন আমার বয়স ৭০, মাথার সব চুল পেকে গেছে। এরা যে কাজগুলো করছে এভাবে কাজ করলে চিন্তা করেন, সামনের বন্যায় আমাদের বাড়িঘর ভেঙে যাবে, এখান থেকে পালাতে হবে। এই যে নদীর বালুগুলো তুলছে আবার বিক্রি করছে, এগুলো তো পাউবোর এক্সইএনের সামনেই তুলছে। প্রথমে এলাকার লোকজন বাধা দিছিল, তাতে এক্সইএনের যে ব্যবহার! বলেন, আপনারা এখানে কী বুঝবেন? বেশি কথা না বলে এখান থেকে যান।’

জানতে চাইলে সাব ঠিকাদার ভরত প্রসাদ মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান, বিএনপির তিন সদস্য আর এনসিপির নেতাদের ম্যানেজ করেই কাজ করি। তাঁদের বাদ দিয়ে কি সেখানে কাজ করা যাবে?’ বাঁধ সংস্কার কাজে বাঁশ সরবরাহ করা নিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঝখানে শুনলাম ওদের মধ্যেই হিসিং (মারামারি) চলছে। এ বাঁশ কাটে, ও বাঁশ কাটে, এনসিপি কাটে, জামায়াত কাটে, বিএনপি কাটে-ওরা মারামারি লাগাইছে। এজন্যই আমি এখন সাইটে যাওয়া বন্ধ করেছি। বলেছি-আগে ওদের মীমাংসা হোক।’ কোন কোন দলের নেতা প্রভাব খাটায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো বলে কী হবে? কাজটা তো আমাকে দীর্ঘ মেয়াদে করতে হবে। পুলিশ না হয় এক দিন-দুদিন যাবে, এরপর কী হবে?’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য ও ৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলো সবাই মিলে আমরাই করতেছি। সমস্যা নাই, আপনাদের (সাংবাদিক) বিষয়টা দেখা যাবে।’ জাতীয় পার্টির নোহালী ইউনিয়ন সভাপতি ও বর্তমান নোহালী ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, ‘ওনাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। সে আমার সঙ্গে কথা বলে না, আর আপনাকে বলছে আমাকে নাকি ম্যানেজ করছে।’

উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকার বলেন, ‘সত্যিই বিষয়টা নিয়ে আমার জানা নেই। তবে যদি কোনো ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা এর সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের অপকর্ম করার সুযোগ নেই।’ এনসিপির উপজেলা প্রধান সমন্বয়কারী রিফাত চৌধুরী বলেন, ‘আমি এসব সম্পর্কে কিছুই জানি না।’

গঙ্গাচড়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির নায়েবুজ্জামান বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে বিষয়টি শোনার পর আমরা ওই ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাদের বিষয়ে কিছু বলেননি। আমরা বলতে পারি, আমরা বা আমাদের নেতা-কর্মী কেউ এই বিষয়ে কিছু জানেন না।’

রংপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের কাছে তিস্তা থেকে বালু তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘তিস্তা থেকে বালু না তুললে কাজ করবে কোন বালু দিয়ে?’ পরে তাঁর সামনে ইস্টিমেট বের করে কথা বললে তাৎক্ষণিক বক্তব্য পরিবর্তন হয়ে যায়। তখন তিনি বলেন, ‘আমি তো অনিয়ম দেখে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। আর সেখান থেকে ওই বালু সরাতে বলেছি। সব সরিয়ে নতুন করে কাজ করতে বলেছি।’

এ বিষয়ে ইউএনও মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘নোহালী ইউনিয়নের বাঁধের কাজ ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে তদন্ত করে আমরা দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ এনামুল আহসান বলেন, ‘নোহালী ইউনিয়নের পাউবোর কাজ এবং বালু উত্তোলন বিষয়ে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...