Ajker Patrika

পলিনেট হাউসে কৃষিতে নতুন দিগন্ত, বছরে সোহেলের লাভ ১০ লাখ টাকা

মাসুদ পারভেজ রুবেল ডিমলা, নীলফামারী 
ডিমলা উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামে নিয়ন্ত্রিত কৃষিঘর নির্মাণ করেছেন সোহেল। ছবি: আজকের পত্রিকা
ডিমলা উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামে নিয়ন্ত্রিত কৃষিঘর নির্মাণ করেছেন সোহেল। ছবি: আজকের পত্রিকা

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য—একখণ্ড জমি, সারা বছর থাকে সবুজে মোড়া। শীতের সবজি ফলছে গ্রীষ্মে, আবার গরমের সবজি দেখা যাচ্ছে শীতকালে। মৌসুমের নিয়ম ভেঙে এই পরিবর্তন এনেছেন গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল রানা। আধুনিক পদ্ধতির আপডেট স্মার্ট অ্যাগ্রো নামে ‘পলিনেট হাউস’ তৈরি করে তিনি কৃষিকে নিয়ে গেছেন এক নতুন ধারায়।

দুই বছর আগে ২০ শতক জমিতে পলিথিন ও সূক্ষ্ম নেট দিয়ে তৈরি নিয়ন্ত্রিত কৃষিঘর নির্মাণ করেন সোহেল। ভেতরে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা আর আলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে চারার বৃদ্ধিও থাকে সমানুপাতিক। মাটির পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেন নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিট। এতে থাকে না মাটিবাহিত রোগ, ভাইরাসের আক্রমণও কম। সোহেলের ভাষায়, কোকোপিটে চারার অঙ্কুরোদগমের হার ৯০ শতাংশের বেশি। সার বা কীটনাশক লাগে না বললে চলে।

কৃষি দপ্তরের প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন তাঁর প্রধান আয়ের উৎস। বছরে ২০ লাখের বেশি চারা উৎপাদন করেন তিনি। বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা নিট লাভ আসছে হাতে। শুধু তা-ই নয়, আগের মতো জমি আর খালি পড়ে থাকে না। নীলফামারীসহ আশপাশের জেলাগুলোয় নিয়মিত যাচ্ছে এসব চারা।

সোহেল বলেন, ‘শুরুতে জানতাম না পলিনেট হাউস কতটা ফল দেবে। কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করি। এখন কোকোপিটে চারার অঙ্কুরোদগম ৯০ শতাংশের মতো। সার-কীটনাশক লাগে না বললে চলে। লক্ষ্য হচ্ছে, গ্রামে আধুনিক কৃষি পৌঁছে দেওয়া, যাতে সবাই সারা বছর আয়ের সুযোগ পায়।’

ডিমলা উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামে নিয়ন্ত্রিত কৃষিঘর নির্মাণ করেছেন সোহেল। ছবি: আজকের পত্রিকা
ডিমলা উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামে নিয়ন্ত্রিত কৃষিঘর নির্মাণ করেছেন সোহেল। ছবি: আজকের পত্রিকা

সোহেলের বাবা রেজাউল ইসলাম বলেন, আগে ভাবিনি এভাবে কৃষিকে বদলে ফেলা যায়। এখন ছেলেকে দেখে গ্রামের ছেলেরা উৎসাহ পাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানালেন, পলিনেট হাউসের চারা একসঙ্গে বেড়ে ওঠে, মৃত্যুহার কম, তাই ফলনও ভালো হয়। আগাম উৎপাদনের সুযোগ থাকায় মুনাফা বাড়ছে। ফলে সারা বছর এখন সবজি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

এই উদ্যোগ বদলে দিয়েছে গ্রামের কর্মসংস্থানের চিত্র। সোহেলের পলিনেট হাউসে প্রতিদিন কাজ করেন ১৫ জন নারী-পুরুষ। তাঁদের কেউ কেউ বলেন, ‘আগে মৌসুম ছাড়া কাজ পাওয়া যেত না। এখন নিয়মিত আয় হচ্ছে, সংসারের খরচ মেটাতে পারছি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চারা উৎপাদন কৃষকদের জন্য বড় সুবিধা। রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ চারা উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি কার্যকর।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না জানান, সোহেলের উদ্যোগ দেখে অন্য কৃষকেরাও পলিনেট হাউস করতে আগ্রহী হচ্ছেন। এটি এলাকায় একটি নতুন ধারা তৈরি করবে।

অসময়ের ফসল ফলিয়ে শুধু নিজের আয় বাড়াচ্ছেন না সোহেল, পরিবর্তন আনছেন গ্রামের অর্থনীতি ও মানুষের ভাবনায়। প্রযুক্তি, পরিশ্রম আর সাহস মিলিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে কৃষিতে উদ্ভাবনই ভবিষ্যতের নতুন পথ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...