Ajker Patrika

জনসচেতনতা সৃষ্টিই ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায়

  • এক সপ্তাহে ৭ ভূমিকম্পে জনমনে উদ্বেগ
  • বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, সচেতন হওয়াতেই সমাধান
  • নির্মাণে নিরাপত্তা ও নজরদারির পরামর্শ
সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকা 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাসহ দেশজুড়ে অনুভূত ২১ নভেম্বরের প্রবল ভূমিকম্পের জের মানুষের মন থেকে কাটেনি। ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর এক সপ্তাহে আরও সাতবার কিছুটা কম মাত্রার ভূমিকম্প বা পরাঘাতে কেঁপেছে দেশ। এই অবস্থায় লাখ লাখ বহুতল ভবনসহ অসংখ্য পাকা বাড়িতে ঠাসা রাজধানীজুড়েই উদ্বেগ রয়ে গেছে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিবিধান মানা এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সক্রিয় নজরদারি কম থাকা উদ্বেগের বড় কারণ। বড় ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের প্রস্তুতি কতটা, সেই প্রশ্নও অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, রাজধানীতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে। শতাব্দীর বেশি সময় এই অঞ্চলে খুব বড় মাত্রার ভূমিকম্প না হওয়ায় ভূগর্ভে টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থলে প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়েছে। এ কারণে এখানে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু আগে-পরে তা ঘটবেই। তবে তা কবে হবে, আগেই বলা সম্ভব নয়। এ কারণে ভবন নির্মাণ ও সংস্কারে সতর্কতা এবং ভূমিকম্প ঘটলে করণীয় বিষয়ে সচেতনতার দিকে নজর দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি কাজ। এ ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

গত ১০ বছরে রাজউক, বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীর নদী-তীরবর্তী বা নিচু জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা এলাকাগুলো ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব স্থানে ভবন নির্মাণে বাড়তি সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। তবে রাজধানীর আরও অনেক এলাকার মতো নিচু জমি ভরাট করে নির্মিত ভবনগুলোরও বেশির ভাগ তৈরি হয়েছে যথাযথভাবে নিয়ম না মেনে। খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নিজেদের সমীক্ষার বরাত দিয়ে বলেছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে (চ্যুতি) ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে।

বুয়েটসহ বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, পুরান ঢাকার অর্ধেকের বেশি ভবনের বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছর। নিচু জমিতে বালু ফেলে অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে।

ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি

ভূমিকম্পের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে সবকিছু। আমাদের যথেষ্ট দক্ষ জনবল রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন যন্ত্রপাতির কথা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ৭ বা ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৪ থেকে ৬ লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে। এই অবস্থায় শুধু যন্ত্রপাতির সংখ্যার বিষয়টি আর বিবেচ্য হবে না; তখন এটি আর সক্ষমতার মধ্যে থাকবে না। ভয়াবহ ভূমিকম্পে আধুনিক প্রযুক্তিও কখনো কখনো অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে।’

আজাদ আনোয়ার আরও বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু জায়গায় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতেও পারবে না। আর ৪৮ বা ৭২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ কিছু হবে না। এই ধরনের দুর্যোগে পুরো জাতিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার ৫০ শতাংশ ভবন নির্মিত হয়েছে মাটির সঠিক গুণগত মান পরীক্ষা ছাড়াই। নকশা অনুযায়ী রড বা কংক্রিট ব্যবহার করা হয়নি ৪০ শতাংশ ভবনে। আর ২৫ শতাংশ বাণিজ্যিক ভবনে অনুমোদিত নকশা পরে পরিবর্তন করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রকৌশলী ও স্থপতিরা ঢাকায় ভবন নির্মাণের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ভূমিকম্প বিশারদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার মতো একটি জনবহুল শহর দিনের পর দিন অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এখন হঠাৎ রাতারাতি সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কিছু পরিবর্তন করা যাবে না। তবে জনগণকে সচেতন করা, এই বিষয়ে গণমাধ্যমে বেশি বেশি প্রচার করা, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। তাহলে ক্ষতি কমানো সম্ভব।’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভবনের কলামে ৩ মিলিমিটারের বেশি চওড়া ফাটল, বিমে তির্যক ফাটল এবং বেসমেন্ট, ছাদ বা লিফটের শ্যাফটে দীর্ঘ ফাটল থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

পুরান ঢাকার চকবাজারের এক ব্যবসায়ী বললেন, ‘শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর দরজা আটকে যায়। দেয়ালেও ফাটল। কিন্তু এখান থেকে বের হয়ে যাব কোথায়? নিরাপদ বাসা কোথায় পাব? নিশ্চয়তা কী?’

আতঙ্কিত হওয়া যাবে না

আমাদের দেশে সাধারণত ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে। গত শুক্রবারের ভূমিকম্পটি বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেওয়ায় তা আতঙ্কিত করেছে সবাইকে। তবে এ বিষয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক আয়শা আক্তার বলেন, ‘ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না; বিশেষ করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ে। এতে ঝুঁকি আরও বাড়বে। ভূমিকম্পের সময় সবাইকে ভবনের নিরাপদ স্থানে থাকার চেষ্টা করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসসহ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মানতে হবে।’

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ভবনের তালিকা প্রকাশ, সরকারি-বেসরকারি জরুরি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট গঠন, ফল্টলাইনভিত্তিক রিস্ক জোন চিহ্নিত করা, পুরান ঢাকা ও মিরপুরে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সমীক্ষা, ভবন সংস্কারে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ বা তহবিল ও জনগণকে ফাটল-নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য নগর ও পরিবেশবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার ভবনগুলোর ৯৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে অবৈধ ও অনুমোদনহীন। একটি নীতিমালার মধ্য দিয়ে প্রতিটি ভবন পরীক্ষা করে সেগুলো নিরাপদ করার একটি সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় সেটি বাস্তবায়ন করছে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

সাতক্ষীরায় দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, কলেজশিক্ষক নিহত

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

সাতক্ষীরায় সীমান্ত আদর্শ কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও পাইকগাছা ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজের প্রভাষক গোলাম আজম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি বাজারে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গোলাম আজম সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের আব্দুল গফফারের ছেলে।

আশাশুনি থানার ওসি শামসুল আরেফিন জানান, প্রভাষক গোলাম আযম কলেজ হতে মোটরসাইকেলে করে সাতক্ষীরায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে কাদাকাটি বাজারে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে তাঁর মোটরসাইকেলটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে তিনি ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।

স্থানীয়রা তাঁকে সাতক্ষীরা ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

আরডিএ কমপ্লেক্সকে ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র করার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৬: ৫৩
রাজশাহীর আরডিএ কমপ্লেক্স ভবনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবিতে মানববন্ধন। ছবি: আজকের পত্রিকা
রাজশাহীর আরডিএ কমপ্লেক্স ভবনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবিতে মানববন্ধন। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজশাহী নগরের তালাইমারী মোড়ে অবস্থিত আরডিএ কমপ্লেক্স ভবনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। আজ রোববার বেলা ১১টায় নাগরিক সমাজ, রাজশাহীর ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে সংহতি জানিয়ে অংশ নেয় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, রাজশাহী।

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) প্রায় ৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ভবনটি নির্মাণ করে। আওয়ামী শাসনামলে শুরু হওয়া প্রকল্পের নাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স’। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এর নাম পরিবর্তন করে সম্প্রতি মাসিক ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় এটি ১০ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে একটি বেসরকারি স্কুল হয়েছে।

এর প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পিত এই ভবনটি হঠাৎ করে ১০ বছরের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যা ভবনটির মূল উদ্দেশ্য ও আদর্শের পরিপন্থী।’

তাঁরা বলেন, ‘আমরা বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নই, তবে যে উদ্দেশ্যে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি থেকে সরে আসা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ বক্তারা বলেন, ‘১৯৪৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হিসেবে ভবনটি গড়ে তোলা জরুরি।’

এ দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। কর্মসূচিতে লেখক মাহবুব সিদ্দিকী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ জামাল কাদেরী, সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু প্রমুখ বক্তব্য দেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ বেরোবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের কমিটি, শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ

বেরোবি সংবাদদাতা
‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ বেরোবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের কমিটি, শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ১০৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ধরনের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও সক্রিয়ভাবেই চলছে রাজনৈতিক দলগুলো। সম্প্রতি (২৭ নভেম্বর) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বেরোবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইয়ামিনকে সভাপতি ও লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. জহির রায়হানকে সাধারণ সম্পাদক করে বেরোবি শাখার ৯ সদস্যের কমিটি অনুমোদন করেছে। এ ছাড়া আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এক জরুরি সদস্য সমাবেশে বেরোবি শাখা শিবিরের ২০২৫ সেশনের বাকি সময়ের জন্য ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সুমন সরকারকে সভাপতি এবং একই শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুর রাকিব মুরাদকে সেক্রেটারির দায়িত্ব প্রদান করে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি ছিল ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং ছাত্র সংসদ চালু করা। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরই ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী সাংবাদিকদের এ ব্যাপারে বিস্তারিত ব্রিফ করেন।

কাগজে-কলমে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও একের পর এক কমিটি গঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোটেও কাম্য নয়।

ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী হাসান শেখ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি অরাজনৈতিক, শিক্ষাবান্ধব ও গবেষণাকেন্দ্রিক পরিবেশ রক্ষার প্রত্যয়ে পরিচালিত হয়ে আসার কথা ছিল কিন্তু কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে দলীয় কমিটি ঘোষণার উদ্যোগ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলীয় কমিটি গঠন শিক্ষার পরিবেশকে বিভক্ত, অস্থির এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিগত বছরগুলোতে আমরা সেগুলো পরিলক্ষিত করছি। এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতারও প্রতিফলন। আমরা চাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি শিক্ষাঙ্গন হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং শিক্ষা, গবেষণা, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।’

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিশাদ নুর বলেন, ‘একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে অফিশিয়ালি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, সেখানে কীভাবে শিক্ষার্থীরা কোন সাহসে, কার প্ররোচনায় কমিটি দেয়—সেটা আমার বোধগম্য হয় না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘৃণাভরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রতি এই অবমাননাকে প্রত্যাখ্যান করে। এখন প্রশাসনের ওপরে পুরো বিষয়টা। তারা যদি আবু সাঈদের ত্যাগকে মনে রাখে, তাহলে এই অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করবে। লিস্ট আছে, নাম আছে, পরিচয় আছে। প্রশাসন যদি এবার শক্ত পদক্ষেপ না নিয়ে ছেড়ে দেয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি কখনোই শেষ করা সম্ভব হবে না।’

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী প্রান্ত সরকার পলক বলেন, ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কমিটি গঠন আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করি। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের স্থান, কোনো দলের আধিপত্যের নয়। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার শুধু বিভাজন ও অশান্তি বাড়ায়। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, ক্যাম্পাসকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গঠনে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ আর-রহমান স্বপ্নীল বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক কমিটি ঘোষণাগুলো আমাকে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে উদ্বিগ্ন করেছে। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি সাধারণত শিক্ষার পরিবেশকে অস্থির করে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করে। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে পড়াশোনা, নিরাপত্তা আর নিরপেক্ষ পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাই এই ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় হওয়া আমাদের জন্য ভালো কোনো সংকেত নয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেরোবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ‘ছাত্রশিবির যখন কমিটি প্রকাশ করেছিল, আমরা তাদের ডেকেছিলাম। তারা সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মর্মে অঙ্গীকার করে বলেছে ক্যাম্পাসে কোনো রাজনীতি করবে না, যা করবে ক্যাম্পাসের বাইরে।’

উপাচার্য আরও বলেন, ‘দেখলাম ছাত্রদল তাদের কমিটি করেছে, কমিটিগুলো তো এখান থেকে করা হয় না; ঢাকা থেকে করা হয়। যেহেতু কমিটি করা হয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তকে সম্মান রেখে সেভাবেই কার্যক্রম চালাবে বলে আশা করি। তারপরও কেউ যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়, তাহলে শৃঙ্খলা কমিটি এবং সিন্ডিকেট তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

টনসিল-পলিপস অস্ত্রোপচারের পর রোগীর মৃত্যু

নোয়াখালী প্রতিনিধি
হাসপাতালে স্বজনদের ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা
হাসপাতালে স্বজনদের ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা

নোয়াখালী জেলা শহরের মাইজদী হাউজিং এলাকার ইএনটি হাসপাতাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত ওই রোগীর নাম রিংকি আক্তার (২০)। হাসপাতালটিতে পলিপস ও টনসিলের অস্ত্রোপচারে (অপারেশন) রিংকির মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। এ ঘটনার পর হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়েছেন চিকিৎসকসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

রিংকি জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের আব্দুল আজিজ বাবুলের মেয়ে। আজ শনিবার তাঁর মৃত্যু হয়।

রিংকির বড় ভাই মো. শাকিল অভিযোগ করে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে রিংকির গলায় সমস্যা দেখা দিলে আমরা ঢাকায় ডাক্তার দেখাই। সেখান থেকে জানানো হয়, তার টনসিল ও পলিপসের সমস্যা আছে। তবে এটি বড় ধরনের কোনো সমস্যা নয়, প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। পরবর্তী সময়ে মাইজদীতে নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইএনটি হাসপাতালে চেম্বার করা ডা. মো. মজিবুল হকের কাছে নিয়ে আসি। তাঁকে দেখানোর পর তিনি জানান দুটি সমস্যার জন্য ছোট অপারেশন করতে হবে। মজিবুল হকের কথামতো ২৫ নভেম্বর দুপুরে রিংকিকে হাসপাতালে আনা হলে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টনসিল ও পলিপসের অপারেশন করা হয়। এর পরদিন তাড়াহুড়ো করে তাঁকে রিলিজ করে দেন ডাক্তার। বাড়ি নেওয়ার পর থেকে রিংকির শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিলে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আজ শনিবার সকালে রিংকির গলা দিয়ে রক্ত বের হতে থাকলে আমরা দ্রুত তাকে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে আসি। এখানে আনার পর তাঁরা জানান, সে মারা গেছে। এরপর দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান ডা. মজিবুল হক ও অন্যরা।’

তবে এ বিষয়ে জানতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত চিকিৎসক মজিবুল হকের ব্যবহৃত মোবাইলে কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সুধারাম মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লন্ডন চৌধুরী বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি। প্রাথমিক তথ্যাদি নেওয়া হয়েছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত