Ajker Patrika

যমুনা অয়েল: তেলের ট্যাংক ভরে রেখে হিসাবের খাতায় কম

  • রি-ক্যালিব্রেশনে ধরা পড়ল ভেতরের এই কাহিনি
  • বছরের পর বছর এভাবেই ডিজেল চুরি করত চক্রটি
সবুর শুভ, চট্টগ্রাম 
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫, ০৮: ১৮
যমুনা অয়েল: তেলের ট্যাংক ভরে রেখে হিসাবের খাতায় কম

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সরকারি ডিপো (যমুনা অয়েল) থেকে পৌনে চার লাখ লিটার ডিজেল গায়েবের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ওই ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংক রি-ক্যালিব্রেশন (পুনঃপরিমাপ) প্রতিবেদনে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, বছরের পর বছর ধরে ডিজেল চুরির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ভুল, অসম্পূর্ণ ও ইচ্ছাকৃতভাবে কমানো ক্যালিব্রেশন শিট। ট্যাংকে যত পরিমাণ তেল ঢালা হতো, হিসাবের খাতায় তার চেয়ে কম দেখানোই ছিল চক্রের নিয়মিত কৌশল।

এ বিষয়ে রি-ক্যালিব্রেশন কমিটির সদস্য যমুনা অয়েলের এজিএম মো. আলমগীর আলম বলেন, ‘রি-ক্যালিব্রেশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।’

যমুনা অয়েল থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংক থেকে তেল গায়েবের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে গত ২৮ সেপ্টেম্বর যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এজিএম ও ম্যানেজার পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও সিপিডিএলের (পাইপলাইন প্রকল্প) প্রকল্প প্রকৌশলী ও পিটিসিএলের (পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি) অপারেশন বিভাগের প্রতিনিধি কমিটিতে রাখা হয়। ক্যালিব্রেশনকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এম নুরুল হকের প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে কমিটির সদস্যরা ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর ফতুল্লা ডিপোতে যান। এরপর দীর্ঘ পর্যালোচনা ও রি-ক্যালিব্রেশন শেষে গত ১৬ অক্টোবর যমুনা অয়েলের জিএমের (অপারেশন) কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। অতি সম্প্রতি প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানাজানি হলে উঠে আসে একের পর এক তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এসব তথ্যে ডিজেল চুরির পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

যা আছে রি-ক্যালিব্রেশন প্রতিবেদনে

পুরোনো ক্যালিব্রেশন শিটে ট্যাংকের সঠিক উচ্চতা ও ভলিউমের হিসাবে স্পষ্ট অসংগতি থাকার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বহু জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুপস্থিত, কোথাও কোথাও স্বাক্ষর নেই, আবার কোথাও ভলিউম ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখানো হয়েছে। নতুন ক্যালিব্রেশনে ট্যাংক ২২-এর প্রকৃত ধারণক্ষমতা ৭০ লাখ ৩৮ হাজার ৪০৪ লিটার। কিন্তু পুরোনো ক্যালিব্রেশনে ধারণক্ষমতা দেখানো হয়েছিল ৬৯ লাখ ৭২ হাজার ২১৭ লিটার। এ ক্ষেত্রে পুরোনো হিসাবের তুলনায় ৬৬ হাজার ১৮৭ লিটার তেল বেশি পাওয়া যায়। কাগজে-কলমে ট্যাংকের ধারণক্ষমতা কম দেখিয়ে এসব তেল গায়েব করা হয়। একইভাবে ট্যাংক ২৩-এর পুরোনো ও নতুন ক্যালিব্রেশনে তেলের অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা ধরা পড়ে ১১ হাজার লিটারের মতো। অর্থাৎ ট্যাংকে প্রকৃতপক্ষে যত ডিজেল ভর্তি করা হতো, পুরোনো ক্যালিব্রেশন শিট ব্যবহার করে তা হিসাবপত্রে অনেক কম দেখানো হতো। এই অদৃশ্য ভলিউমের অংশটাই বছরের পর বছর ধরে গায়েব হয়ে যেত।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ট্যাংকের ভলিউম কম দেখানোর এই পদ্ধতি ছিল বহু বছর ধরে চলা জ্বালানি চুরির মূল ফাঁকফোকর। ক্যালিব্রেশনকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়ায় এবং পুরোনো ক্যালিব্রেশন শিটে একের পর এক ত্রুটি থাকায় চক্রটি নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজেল সরাতে পেরেছে।

যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ফতুল্লা ডিপো থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি সামনে আসে। জ্বালানি তেলের চুরি ও অপচয় রোধে সরকারের নির্মাণ করা ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনে তেল সরবরাহ চালু হয়েছে চলতি বছরের জুন মাসে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় মূল টার্মিনাল থেকে সরাসরি তেল আসে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকে পাইপলাইন থেকে তেল আসে। এর মধ্যে ২২ নম্বর ট্যাংকটি পুরোনো। নতুন করে তৈরি সক্ষমতা সনদে জালিয়াতি করে মজুত ক্ষমতা কমিয়ে দেখানো হয়েছে। আর ২৩ নম্বর ট্যাংকটি নতুন, শুরুতেই এটির সক্ষমতা কমিয়ে দেখানো হয়। বিষয়গুলো উল্লিখিত রি-ক্যালিব্রেশন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি কাটানোর তাগিদ

এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘দুর্নীতি ও অনিয়ম এবং জ্বালানি সেক্টর যেন একাকার। বনখেকো, সরকারি ভূমিখেকোর মতো এখন জ্বালানি তেলখেকোর কথাও শুনছি। এ সেক্টরে কর্মকর্তাদের স্বভাব ও রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি না পাল্টালে এ ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম হতেই থাকবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...