Ajker Patrika

জোত পারমিটের আড়ালে কাঠ পাচার

  • হাজার হাজার ঘনফুট কাঠ স্তূপ করে রাখা হয়েছে সাঙ্গুতীরে
  • জোত পারমিট পুনর্মূল্যায়ন, কাঠ পাচার দমনে কঠোর পদক্ষেপ চায় স্থানীয়রা
  • দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ চললেও কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের
বাসু দাশ, বান্দরবান
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৫: ৩৩
পাহাড়ে অবৈধভাবে কাটা হয় গাছ। পরে সেগুলো নদে এনে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে গাছগুলো। সম্প্রতি বান্দরবানের সাঙ্গু নদের উজানে পান্তলাপাড়ার ঘাট এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
পাহাড়ে অবৈধভাবে কাটা হয় গাছ। পরে সেগুলো নদে এনে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে গাছগুলো। সম্প্রতি বান্দরবানের সাঙ্গু নদের উজানে পান্তলাপাড়ার ঘাট এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বান্দরবানের রুমায় জোত পারমিটের আড়ালে (ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমিতে লাগানো গাছ কাটার অনুমতিপত্র) হচ্ছে বন উজাড়; পাচার হচ্ছে কাঠ। উপজেলার গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের পান্তলা মৌজায় দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ চললেও তা বন্ধে উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাঙ্গু নদের দুই তীরে হাজার হাজার ঘনফুট কাঠ স্তূপ করে নৌপথে পাচার করছে চক্রটি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৈধ জোত পারমিটের সুযোগ নিয়ে কাঠ চোরাকারবারি চক্র নির্বিচার পাহাড়ের গাছ কেটে বন উজাড় করছে। ফলে শুকিয়ে গেছে ঝিরি-ঝরনার পানির উৎস, ন্যাড়া হয়ে পড়ছে পাহাড়ও।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, জোত পারমিটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চক্রটি গাছ কাটার অনুমোদিত পরিধির বাইরে গিয়ে বিশাল এলাকায় গাছ কাটছে। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া পুরোনো গাছ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে উজাড় হচ্ছে পাহাড়, কমছে পানিপ্রবাহ। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় জোত পারমিট পুনর্মূল্যায়ন, কাঠ পাচার দমনে কঠোর পদক্ষেপ চান তাঁরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাঙ্গুর উজানে পান্তলা পাড়ার ঘাট পেরিয়ে সেপ্রু মুখ এলাকায় নদীর ধারে গাছের বিশাল চালি প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে কাজ করছেন সাতকানিয়া-খাগরিয়া এলাকার নুরুল আলম (৬৫), মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (৪২), মোহাম্মদ নাছিরসহ (৫৬) আরও আটজন শ্রমিক।

শ্রমিকেরা জানান, তাঁরা মো. জাহেদ মাঝির অধীনে প্রায় দেড় মাস ধরে প্রতিজন ১৫-১৬ হাজার টাকা মাসিক বেতনে কাজ করছেন।

কাঠ পাচারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক দেলোয়ার বলেন, ‘আমরা জাহেদ মাঝির লোক। তিনি আমাদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করেন।’

জাহেদ মাঝি জানান, বান্দরবানের ব্যবসায়ী কাউছার সওদাগরের কাঠ নদীতে নামানোর জন্য প্রস্তুত করছেন। শ্রমিক নিয়োগ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ পুরো কাজ তিনি কাউছারের সঙ্গে কথা বলেই করছেন।

সাঙ্গু নদের উজানে পান্তলাপাড়ার ঘাট পেরিয়ে সেপ্রু মুখ এলাকায় জড়ো করা গাছের স্তূপ। ছবি: আজকের পত্রিকা
সাঙ্গু নদের উজানে পান্তলাপাড়ার ঘাট পেরিয়ে সেপ্রু মুখ এলাকায় জড়ো করা গাছের স্তূপ। ছবি: আজকের পত্রিকা

গালেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গাছ ব্যবসায়ীরা জোত পারমিট করেন নির্ধারিত একটি স্থানের বন্দোবস্তির জমির কাগজ দিয়ে। কিন্তু গাছ কেটে নিয়ে যান আরেকটি জায়গা থেকে। এটা কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

নুমলাই হেডম্যান পাড়ার বাসিন্দা লংরুম ম্রো বলেন, ‘পান্তলা মৌজায় আমার নামে কোনো জমির বন্দোবস্ত নেই। কামাল তাদের কিছু গাছ কিনে নিয়ে গেছে। কাউছার নামের ওই ব্যবসায়ীর পক্ষে কাঠ কেনাকাটা ও পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছেন কামাল।’

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়জুড়ে গাছের বিশাল স্তূপ। উভয় তীরে সারিবদ্ধভাবে রাখা কাঠের চালিগুলো যেকোনো সময় নৌপথে পাচার করতে গাছের টুকরোগুলো বাঁশের সঙ্গে বেঁধে চালি করে রাখা।

এই বিষয়ে রুমা রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াজ রহমান বলেন, ‘গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের কয়েকটি অনুমোদিত জোত পারমিট চলমান। তবে এগুলো অনুমোদিত হয়েছে আগের রেঞ্জারের আমলে। কোন মৌজায় কার নামে অনুমোদন হয়েছে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। সাবেক রেঞ্জার এ তথ্য জানেন।’

সাবেক রেঞ্জার মো. মুনতাসীর বলেন, ‘পান্তলা পাড়া থেকে তিনজন ব্যক্তির নামে অনুমোদিত জোত পারমিট ছিল। কাউছার ঠিক কার নামে জোত করেছে, কাগজপত্র না দেখে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...