Ajker Patrika

‘আগ্রাসী’ পাকিস্তানের সামনে ‘দুর্বল’ ভারত, কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ১৮: ০৯
ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত স্বায়ত্বশাসন বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মোদি। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত স্বায়ত্বশাসন বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মোদি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বকীয় পথের সন্ধান করছে, তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হলো, স্বল্প বিরতিতে চীন, রাশিয়া এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের দেশটিতে আতিথেয়তা দেওয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ডিসেম্বরেই ভারতে আসার কথা। ইউক্রেন আক্রমণের পর এটি হবে তাঁর প্রথম ভারত সফর। আগামী বছর ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করছে ভারত, সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের উপস্থিতিও প্রায় নিশ্চিত। এ বছরের কোয়াড সম্মেলন—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও সদস্য—এ মাসেই ভারতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেওয়ায় তা পিছিয়ে গেছে। নতুন তারিখ ঠিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারতে আসতে পারেন।

কিন্তু এই গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ভারতের সমদূরত্ব নীতি বা সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সময় ‘দূরবর্তী বা নিরাসক্ত’ আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল—ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সময়। তাঁর যুক্তি ছিল বাণিজ্যঘাটতি আর রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা দেশগুলো বা রাশিয়ান জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো একই মাত্রার শাস্তি পায়নি। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চীনকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, আর মার্কিন মিত্র হওয়ায় জাপান-তুরস্কও রেহাই পেয়েছে। এই বৈষম্য দেখায় যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতের নিজস্ব কৌশলগত অপরিহার্য অবস্থান এখনো দুর্বল। ভারতের জন্য প্রধান শিক্ষা হলো—আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতিকে আরও উদ্যোগী ও দৃঢ় রূপে গড়ে তোলা।

২০২৫ সালটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য ২০১৪ সালের ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক বছর হয়ে উঠেছে। এপ্রিলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর মে মাসে চার দিনের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত শুরু হয়। সময়ের দিক থেকে ছোট হলেও, গত কয়েক দশকের সবচেয়ে তীব্র মুখোমুখি অবস্থান ছিল এটি।

এই সংঘাত থেকেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতাতেই দুই দেশের সংঘাত থেমেছে। দিল্লি এই দাবি অস্বীকার করে, কিন্তু ইসলামাবাদ তা আগ্রহ নিয়ে প্রচার করতে থাকে। পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করে তোলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। সংঘাতের পরপরই পাকিস্তান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে দুই দফা হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হয়। জুনে মোদি ও ট্রাম্পের ফোনালাপে ট্রাম্প নাকি মোদি ও মুনিরকে একসঙ্গে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব দেন। কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বরাবরই না মানার নীতি অনুসরণ করে মোদি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে স্পষ্ট শীতলতা নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে গিয়ে দুজন আবার কথা বলার আগপর্যন্ত তাঁরা আর যোগাযোগ করেননি।

মাঝখানের সময়টায় দুই দেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি দেখা দেয়। আগস্টে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করতে না পারা, তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বোচ্চ শুল্কের ধাক্কা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তিক্ত হয়ে ওঠে। ট্রাম্প ভারতের অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে কটাক্ষ করেন, দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা সামান্যই। তার সঙ্গে যোগ হয় তাঁর বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারোর তীক্ষ্ণ মন্তব্য—ভারত নাকি ‘ক্রেমলিনের লন্ড্রি।’ এসব মন্তব্য দুই দেশের আস্থার ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়।

সাম্প্রতিক কালে দুই নেতার শান্ত সুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তেজনা হয়তো কমছে, আর শেষমেশ একটি বাণিজ্যচুক্তিও হতে পারে। তবু দিল্লির আগের অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে ভারতীয়দের যে প্রবল আশাবাদ ছিল, তা আজ আর নেই। একই সঙ্গে মিলিয়ে গেছে সেই দাবি যে নরেন্দ্র মোদি ও ট্রাম্প নাকি বিশেষ কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কে আবদ্ধ। মোদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির গর্ব করেছেন, যেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক নীতির সামনে তা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

আরও গভীরে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর সংকটগুলোই উন্মোচন করে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত বহুদিন ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের যে নীতি ধরে রেখেছে, তা যেমন আশীর্বাদ, তেমনি দায়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে, এর কারণে ভারতের হাতে রয়েছে নানা কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর যখন চীন-ভারত সম্পর্ক তলানিতে যায়, তখনই এই নমনীয়তার ফল দেখা যায়। দিল্লি তখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করে, বিশেষ করে কোয়াড কাঠামোয় ভারতের অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ানো হয়—তা তার স্পষ্ট উদাহরণ।

এমন বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জন্য একটি পরিষ্কার সুবিধা এনে দেয়—কোনো এক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। ২০২৪ সালের মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের উচিত প্রশংসিত হওয়া। কারণ, দেশটি পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বহু বিকল্প’ পথ ধরে রেখেছে।

কিন্তু গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ এই অবস্থানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে বেছে নিতে হয়, তখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক আরোপের সময়। ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর ওপর চাপ তৈরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নেয়। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফাটল ধরতেই দিল্লির মস্কো-সম্পর্ক ওয়াশিংটনের তীক্ষ্ণ নজরে পড়ে।

ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের শিকড় আছে স্নায়ু যুদ্ধকালের জোট নিরপেক্ষতার ধারণায়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ঔপনিবেশিকতার ক্ষত ভারতকে এমন কোনো জালে জড়াতে দেয়নি, যা দেশটির স্বাধীনতা বা নীতিগত স্বায়ত্তশাসনকে বিপন্ন করতে পারে। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারত তখন নিরপেক্ষ পথ বেছে নেয়। এর মূল চেতনা ছিল স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখা, কিন্তু কারও অধীন না হওয়া। আজকের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নমনীয়তা ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক বিকল্প ধরে রাখার বাসনা।

স্নায়ুযুদ্ধ যুগের নিরপেক্ষতার নীতি কাগজে যতই চকচকে দেখাক, বাস্তবে তা সব সময় টেকেনি। ভারতের ওপর যখনই অস্তিত্বগত সংকট নেমে এসেছে, কৌশলগত নমনীয়তা দ্রুত ক্ষয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি বাধ্য হয়েছে দুই পরাশক্তির একটির শরণাপন্ন হতে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের তীব্রতম মুহূর্তে নয়াদিল্লি যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সমন্বয়ের কথা ভাবছিল, তখনই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালেও একই দৃশ্য। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে ভারত। কারণ, তখন ইসলামাবাদ হাত মিলিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বাস্তবতা ভারতকে নিরপেক্ষতার নীতি ছাড়তে বাধ্য করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর নয়াদিল্লি বুঝতে পারে, হারিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ বাজার আর পণ্যবিনিময়ের বিশেষ সুবিধা। তাই বৈদেশিক সম্পর্ক নতুন করে সাজানো ছাড়া উপায় ছিল না। এই পরিস্থিতিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের নতুন ঘনিষ্ঠতার পথ খুলে দেয়। তবে একই সঙ্গে ভারত বহুমুখী বা সর্বমুখী কূটনীতির নীতি বজায় রাখে। বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এক মেরু বিশ্বব্যবস্থা ম্লান হয়ে বহু-মেরু প্রতিযোগিতা ফিরে আসায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে, তা ভারতের জন্য আরও সক্রিয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় প্রযুক্তি-উদ্ভাবন অংশীদারত্বের ঘোষণা দেখায় যে নয়াদিল্লির লক্ষ্য হলো—গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা, পশ্চিমের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়া এবং দুই পক্ষের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করা। মোদি সরকার ভারতকে ‘বিশ্বমিত্র’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। তবে বিশ্বমিত্র হওয়া আর বিশ্বকে একে অপরের বন্ধু বানাতে সাহায্য করা—দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে।

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখলেও সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনে নয়াদিল্লির সক্রিয় ভূমিকা ছিল সীমিত। অথচ কাতার, তুরস্ক, ব্রাজিল, এমনকি চীনও যে ভূমিকা নিয়েছে, ভারত সেই জায়গা থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ভূমিকা নিলে তা ভারতের ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গেই মানানসই হতো। কারণ, তখন ভারত আজকের তুলনায় অনেক দুর্বল দেশ হয়েও মধ্যস্থতায় ছিল বেশ সক্রিয়। পঞ্চাশের দশকে কোরীয় যুদ্ধ থেকে তাইওয়ান প্রণালির সংকট—বহু আন্তর্জাতিক বিরোধে ভারতের কণ্ঠ ছিল বিশেষভাবে প্রভাবশালী।

ভারত বরং দূরেই থাকতে চেয়েছে। এর প্রমাণ মিলেছে নীরব এক অক্টোবরে। এই সময়ে মোদি দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যাননি—শারম আল শেখে গাজা শান্তি সম্মেলন এবং কুয়ালালামপুরে পূর্ব এশিয়া সম্মেলন। দুটিতেই আমন্ত্রণ ছিল, তবু তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) যেগুলোকে ভারত তার ‘বর্ধিত প্রতিবেশ’ বলে মনে করে, সেখানে এমন দুটি বৈঠকের আয়োজন ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির দূরত্ব ও দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানই এখানে দেখাচ্ছে একপ্রকার সক্রিয় কূটনীতির পাঠ। ইসলামাবাদও নিজস্ব ধরনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চর্চা করছে; চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান আর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক জোরদার করছে। নয়াদিল্লি যেখানে ভূরাজনীতির জ্বলন্ত ইস্যুগুলো থেকে দূরে থাকতে চায়, সেখানে ইসলামাবাদ বরাবরই সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ষাটের দশকের শেষভাগে চীন-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতার মধ্যস্থতা থেকে শুরু করে আশির দশকে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া, দুই হাজারের দশকে সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ, আর সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় অবদান—সবকিছুই সেই প্রবণতার অংশ।

পাকিস্তান কতটা টেকসইভাবে এই পথ ধরে এগোতে পারবে, সেটি অবশ্যই আলাদা প্রশ্ন। কারণ, দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ভেতরেই রয়েছে বহু বৈপরীত্য। যেমন চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকেও একসঙ্গে বন্দর প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আর সীমান্তের টানাপোড়েনে জর্জরিত অবস্থায় ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে কীভাবে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে, সেটাও অজানা। তবুও, সক্রিয় ও উদ্যোগী কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলতে কী বোঝায়, তার একটি উদাহরণ ইসলামাবাদ দিয়েছে—যা নয়াদিল্লিতে সচরাচর দেখা যায় না।

বাড়তে থাকা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে ভারতকে নতুনভাবে ভাবতে হবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে। এ বছর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের শীতলতা দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে ভারতের মর্যাদা কোনোভাবেই নিশ্চিত নয়। দীর্ঘদিন যেসব সিদ্ধান্ত নিতে ভারত অনীহা দেখিয়েছে, এখন ক্রমাগত চাপ বাড়ছে সেসব বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেকে আরও অপরিহার্য করে তুলতে পারলেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রোষ অথবা অন্য যেকোনো দেশের খামখেয়ালি আচরণ থেকে বেশি সুরক্ষিত থাকবে। কপ-৩০ এবং সাম্প্রতিক জি-২০ সম্মেলনসহ বৈশ্বিক পরিসরে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুপস্থিত কিংবা কখনো-সখনো অস্থিতিশীল ভূমিকা নেতৃত্বহীনতার এক শূন্যতা তৈরি করেছে। ভারত চাইলে ঠিক এই মুহূর্তটিই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হয়ে উঠতে পারে।

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...